ডেমোক্রেসি ওয়াচ-সমকাল জাতীয় সংলাপ
নারীর সঠিক ক্ষমতায়নে চাই স্বাধীন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৭:২০
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয় না। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীরা কতটা স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারছে, তার ওপর নারীর ক্ষমতায়ন নির্ভর করে। তাই সঠিক ক্ষমতায়নের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর স্বাধীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। গতকাল রোববার 'নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়ক জাতীয় সংলাপে' তৃণমূল ও জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা এসব কথা বলেন।
তারা বলেন, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এমনকি জনপ্রতিনিধি- সবখানেই নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য অনেক। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, ভোটারদেরও অর্ধেকই নারী। এ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদে, এমনকি জাতীয় সংসদে নারী জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি একেবারে অন্যরকম। যেসব নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে উঠে এসেছেন, তাদেরও সঠিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তাদের যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। পুরুষ জনপ্রতিনিধিরা তাদের দেখেন অলংকার হিসেবে। যদিও নারীরা এ পর্যন্ত এসেছেন নিজেদের যোগ্যতায়। দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে নারীদের সঠিক ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে, সরকার ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানে নারীদের সঠিক ও পুরুষের সমপরিমাণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সরাসরি নারীদের বেশি করে মনোনয়ন দিতে হবে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে তৃণমূল পর্যায়ের নারী জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নারী সংসদ সদস্যরা মতবিনিময় করেন। ডেমোক্রেসি ওয়াচ ও সমকাল যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল খান ফাউন্ডেশন, প্রিপ ট্রাস্ট ও রূপান্তর। সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশনের অর্থায়নে এবং হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশনের কারিগরি ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অপরাজিতা কর্মসূচির আওতায় এই অনলাইন সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদ সদস্য আরোমা দত্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে বক্তব্য দেন নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ এমপি, সংসদ সদস্য শিরীন আখতার, খান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট রোখসানা খন্দকার, রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম, ডেমোক্রেসি ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক ওয়াজেদ ফিরোজ প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সমকালের সহকারী সম্পাদক শেখ রোকন ও অপরাজিতা প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ফওজিয়া খোন্দকার।
তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উত্থাপন করে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়ন পরিষদের একটি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফাহমিদা বেগম মুন্নী। তিনি বলেন, আমিসহ আমার মতো যারা আছেন, আমাদের সবাই 'মহিলা মেম্বার' হিসেবেই বেশি চেনেন। এটা শুধু আমার কথা নয়, সারাদেশে সাড়ে পাঁচ হাজারের ওপর ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। সেগুলোতে যে ১৬ হাজারের ওপর মহিলা মেম্বার রয়েছেন, তাদের সবার কথা। আমাদের যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, ঠিকমতো মূল্যায়ন করা হয় না। আমাদের কেউ বা দেখেন 'অলংকার' হিসেবে, কেউ বা হয়তো দেখেন 'আপদ' হিসেবে, এমনকি অনেকে হয়তো প্রতিপক্ষও মনে করতে পারেন। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই সাধারণ আসনের নির্বাচিত মেম্বার বা চেয়ারম্যানরা আমাদের সম্মানের চোখে দেখেন। তারা বলেন, আমাদের নাকি তেমন দক্ষতা নেই, আমরা নাকি নিজেদের যোগ্যতা সেভাবে প্রমাণ করতে পারি না বা নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য ভালো করে বুঝি না। কিন্তু আমরা যারা মহিলা মেম্বার আছি, নিজেদের বাড়ি থেকে শুরু করে পদে পদে আমরা কতটা বাধার মুখোমুখি হই, কীভাবে নানা বাধার মোকাবিলা করেও সমাজের জন্য, এলাকার জন্য কাজ করে যাচ্ছি, এসব খবর কয়জন ঠিকমতো রাখেন?
ধারণাপত্রে ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটি ও অন্যান্য কমিটিতে মহিলা মেম্বারদের রাখার দাবি জানানো হয়। এতে বলা হয়, তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে নারী নেত্রীদের জনগণের জন্য কাজ করার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ পদে নারীদের রাখার বিধানটি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ বলেন, তৃণমূলের প্রতিনিধিরা শুধু ঘরের কাজ করছে না। নারীরা ঘর থেকে বের হয়েছে; রাজনীতি করছে। জনগণের জন্য কাজ করছে। প্রতিটি কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। তবে পুরুষরা কমিটিগুলোতে এমন নারীকে রাখতে পছন্দ করেন, যারা কথা বলবেন না, কোনো প্রতিবাদ করবেন না। এ জন্য নারীদের প্রস্তুত হতে হবে। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে বলতে হবে। নারীদের নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। পুরুষ সহকর্মীদের বাধার মুখেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহস করে নারীদের তৃণমূলে ক্ষমতায়ন করেছেন। এর ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। নারীরা সরাসরি চেয়ারম্যান হচ্ছেন, ভাইস চেয়ারম্যান হচ্ছেন।
সংসদ সদস্য শিরীন আখতার বলেন, তিন দশক ধরে দেশ নারীদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। নারী নেতৃত্ব বিকাশের জন্য সংগঠন জরুরি। নারীরা যত বেশি সংগঠনে জড়িত হবে, ততই তাদের মনোবল বাড়বে। তত শক্তিশালী হবে। সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গেলে পুরুষেরা বাধা দেয়। তাদের বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সংগঠনে অংশগ্রহণের গুরুত্ব অনেক। তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে উঠে এলে কেউ বাধা দিতে পারবে না। তবে নারী নেত্রীদের অবশ্যই তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছ থাকতে হবে, লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার লক্ষ্যে অটুট ছিলেন বলেই নানা বাধা ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে আজ পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পেরেছেন।
সংসদ সদস্য আরোমা দত্ত বলেন, এখন মেয়েরা যেভাবে কথা বলছেন, সেভাবে ১০-১৫ বছর আগেও বলা যেত না। আসলে স্বপ্ন না থাকলে কখনও কিছু অর্জন করা যায় না। আমরা নারীরা ঘরেও আছি, মাঠেও আছি। রাজনীতিতেও আছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি ১৯৯৬ সালে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ পদ সংরক্ষণের কথা চিন্তা না করতেন, তাহলে এখন এ পরিবর্তন আসত না। মাঠ পর্যায় থেকে যতক্ষণ নারীর ক্ষমতায়ন হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সমতা আসবে না। তৃণমূলের মতো তাদেরও লড়াই করতে হয় বলে মন্তব্য করেন আরোমা দত্ত।
শেখ রোকন বলেন, বিজয়ের মাসে আমরা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলছি। মহান মুক্তিযুদ্ধকালে লাখো নারী নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছেন।আবার তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, হাসপাতালে যুদ্ধাহতদের সেবা দিয়েছেন, শরণার্থী শিবিরে কাজ করেছেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নারীরা কম অগ্রসর হননি। গত তিন দশক আমরা একটানা নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পেয়েছি। বর্তমান সংসদে স্পিকার হিসেবেও পেয়েছি একজন নারী। এমন উদাহরণ বিশ্বের আর কোথাও সম্ভবত নেই। কিন্তু তারপরও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কতটা জটিল ও কঠিন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নারী জনপ্রতিনিধি ও নেত্রীদের বক্তব্য শুনে তা বুঝতে পারা যায়। তিনি বলেন, সমকাল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর স্বাধীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকাশনার শুরু থেকে একক ও যৌথভাবে তাদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
অ্যাডভোকেট রোখসানা খন্দকার বলেন, তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে হবে। খান ফাউন্ডেশন নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে। নারী জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে নানা কর্মসূচি পালন করছে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে এ পর্যন্ত যত নীতিমালা হয়েছে, সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখনও নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপরের দিক থেকে শুরু করে তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়েও আরও বেশি করে নারীদের পদায়ন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১২ নারী জনপ্রতিনিধি বক্তব্য দেন। তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের মনোনয়ন বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
