নারীর প্রতি বৈষম্য বাড়ছে
সমতার চ্যালেঞ্জ সবখানে
সাজিদা ইসলাম পারুল
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:৫৮
সাবেক স্বামীর কাছে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন আফরোজা (ছদ্ম নাম)। ওই ঘটনায় পরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন তিনি। তবে, চলতি বছরের আগস্ট মাসে প্রতিপক্ষের আইনজীবী তাকে আদালত প্রাঙ্গণেই সবার সামনে 'ব্যভিচারিণী' বলে মন্তব্য করেন।
আফরোজা এই প্রতিবেদককে জানান, বিয়ের কয়েক বছর না যেতেই অন্য নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তার স্বামী। ২০১৮ সালে তাকে তালাকও দেন। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই বিভিন্ন অজুহাতে আফরোজার বাসায় আসা-যাওয়া শুরু করেন প্রাক্তন স্বামী। আবার বিয়ে করবেন- এমন আশ্বাসে পুনরায় তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। কিন্তু বিয়ের কথা বললেই তাকে মারধর করেন। পরে তিনি বাধ্য হন ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলা করতে।
আফরোজা বলেন, 'ন্যায়বিচার পেতে আদালতে এসেছি। অথচ এখানে এসেও আইনজীবীর দ্বারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছি। আমাকে সবার সামনেই 'ব্যভিচারিণী' বলা হচ্ছে।'
এদিকে, দিনের পর দিন পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর বিচার চাইতে গেলে নারী কনস্টেবলকেই 'যৌনকর্মী' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ঊর্ধ্বতন অন্য এক কর্মকর্তা। ওই নারী পুলিশ প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর পুলিশ কনস্টেবল পদে নীলফামারী পুলিশ লাইনে যোগ দেন। এরপর থেকে নীলফামারী রিজার্ভ অফিস ইন্সপেক্টর (বর্তমানে বরিশাল ডিআইজি অফিসে ওসি তদন্ত হিসেবে কর্মরত) আবু নাসের রায়হান প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন। ভিকটিম অধস্তন কর্মচারী হওয়ায় মুখ বুজে তা সহ্য করছিলেন।
এক পর্যায়ে ২০১৬ সাল থেকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে নারী পুলিশটির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন ওই কর্মকর্তা। পরে কৌশল করে ভিকটিমকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম পুলিশ লাইনে এবং নিজে বরিশাল ডিআইজি অফিসে বদলি হয়ে যান। এখন তিনি তাদের সম্পর্ক পুরোপুরি অস্বীকার করছেন। এতে ভিকটিম উপায়ান্তর না পেয়ে প্রথমে বরিশাল ডিআইজি বরাবরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন এবং নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ধর্ষণের মামলা করেন।
ওই নারী কনস্টেবল জানান, নিজের পেশার মানুষের কাছেই তিনি নিরাপত্তা পাননি- অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন বলে এখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মুখে গালি শুনতে হচ্ছে। এমনকি একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি যেন চাকরি ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে যৌনকর্মীর কাজ করেন। অভিযুক্ত ছেলের মামাও নাকি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাই তার নামে বলা হচ্ছে, তিনি নাকি সাব-ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে ওপরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নোংরা কাজে লিপ্ত। দুটি ফেসবুক আইডি থেকে তাকে অশোভন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা, জীবিকা, সম্পদ, রাজনৈতিক ক্ষমতাসহ সব ক্ষেত্রেই দেশের নারীরা এখনও পুরুষের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছেন। নারী-পুরুষের সমান সুযোগ, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এখনও গোড়ার সমস্যা বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, নারীর প্রতি বৈষম্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। নারীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। সুযোগ ও অধিকারের বৈষম্যগুলোও বড়। নারীর আয় এখনও পুরুষের তুলনায় কম এবং নারীর সমতার চ্যালেঞ্জ সবখানেই রয়েছে। পাশাপাশি কিন্তু বড় সমস্যা হয়ে আছে নারীর প্রতি সহিংসতা, যা কিনা অর্জনগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে গত বছর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে নারীবৈষম্যের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর এসেছে ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ- যা খুবই নিচের দিকে। এতে আটটি সূচকে দেখানো হয়েছে দেশের মেয়েদের পরিস্থিতি। সেখানে যেমন রয়েছে সম্পত্তির অধিকার, বিয়ে করা বা সন্তান নেওয়ার মতো বিষয়, তেমনি রয়েছে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার সুযোগের মতো দিকগুলোও।
নারী আইনজীবীরা জানান, পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাবে এ দেশে নারীর প্রতি 'অসম্মানজনক' উক্তি করা খুব সহজ। নারী আইনজীবীরা কোনো মামলায় জয়ী হলে পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে মন্তব্য আসে 'জজ সাহেব মুগ্ধ হয়ে গেছেন। জয় তো হবেই।' কোনো আসামির জামিন হলেও একই মন্তব্য শুনতে হয় নারী আইনজীবীদের।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী দিলরুবা সরমিন বলেন, আসলে গোটা সমাজের মানসিকতারই প্রতিফলন এটি। মেয়েদের প্রতি জেন্ডার বৈষম্য এখনও বিরাজমান। ঘরে-বাইরে সর্বস্তরে নারী বৈষম্যের শিকার। নারীকে সামনে এগিয়ে চলা দেখলেই পুরুষের কাছ থেকে নেতিবাচক মন্তব্য আসতে থাকে। তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করতেই এমনটা করে থাকেন পুরুষ সহকর্মীরা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি আইনের শাসন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ, গণতান্ত্রিক চর্চা, বিচার বিভাগকে সঠিকভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং পুলিশকে জনবান্ধব হবার আহ্বান জানান। বিশ্বে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। বৈষম্যগুলো কমানোর ক্ষেত্রে ২০১৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছিল শীর্ষে। সে বছর বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ৪৮তম। প্রতিবেদনটি বলছে, এমনটা সম্ভব হয়েছে অর্থনৈতিক সুবিধা এবং অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কারণে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং জঁ দ্রজ তাদের ভারত :উন্নয়ন ও বঞ্চনা (২০১৫ সালে প্রকাশিত) বইয়ে লিখেছেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি অনেক বেশি। বাংলাদেশে ৫৭ শতাংশ নারী কর্মজীবী। ভারতে এ হার ২৯ শতাংশ। তারা দেখিয়েছেন, নারীর সাক্ষরতা এবং শিক্ষাতেও বাংলাদেশ এগিয়ে।
তবে এসব অর্জনেও সীমাবদ্ধতা আছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে মেয়েরা সামান্য এগিয়ে আছে। মাধ্যমিক স্তরে মেয়ে আরেকটু বেড়েছে। উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে মেয়েদের পেছানো শুরু হচ্ছে। তবে তখনও ছেলে-মেয়ে প্রায় সমান। তারপরই উচ্চশিক্ষা আর পেশাগত শিক্ষার স্তরে নারীর সংখ্যা ধপ করে পড়ে যাচ্ছে। ব্যানবেইসের সর্বশেষ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী মাত্র এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি।
শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কিশোরীদের ঝরে পড়া প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মীরা জানান, শুধু মাসিক বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ কিশোরী শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়ছে। এ প্রসঙ্গে কথা হয় রংপুরের মিঠাপুকুরের স্কুলপড়ূয়া কিশোরী আরিফা জাহানের সঙ্গে। সে জানায়, একদিন হঠাৎ করেই তার পেটে ব্যথা ওঠে। তারপর যোনিপথে রক্তের উপস্থিতি টের পায় সে। আকস্মিক এ পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ১২ বছরের এই কিশোরী। লজ্জায়-ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় সে। অন্যদিকে, মায়ের কাছে থেকে মাসিকসহ মেয়েদের প্রকৃতিগত সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারলেও প্রতি মাসে পিরিয়ড (মাসিক) চলার সময় স্কুলে যেতে পারে না মুনিরা। এর ফলে অন্যদের থেকে লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ে সে।
মুনিরা এই প্রতিবেদককে জানায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্যানিটারি ন্যাপকিন পরিবর্তনের উপযোগী পরিচ্ছন্ন শৌচাগার নেই। দুটি শৌচাগার আছে-সেগুলো ছেলেমেয়ে সবাই ব্যবহার করে। এ কারণে পিরিয়ড চলার সময় সে স্কুলে যায় না। তার মতো অসংখ্য মেয়ে মাসিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ও কুসংস্কারের কারণে শিক্ষাজীবন হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, মানবাধিকার এমন এক অধিকার, প্রত্যেক মানুষ জন্মগতভাবেই এর আওতায় আসে এবং সব অবস্থায়ই এ অধিকার বহাল থাকে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নারীদের পুরুষতান্ত্রিক এমন এক বৈরী সমাজ পরিবেশে জন্মাতে হয়, যেখানে তারা নির্বিঘ্নে ও পরিপূর্ণভাবে তাদের মানবাধিকার ভোগ করতে পারে না। জেন্ডার সমতা নেই বলে কিশোরী ও নারীরা নির্বিঘ্নে নূ্যনতম মর্যাদাকর ও মানসম্পন্ন উপায়ে তাদের মাসিক স্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনা করতে পারে না। আবার এই অব্যবস্থাপনার কারণে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নির্বিঘ্নে হয় না। ফলে তার যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও সমান মর্যাদার বোধ ব্যাহত হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন করতে হলে মাসিক ব্যবস্থাপনার চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। কারণ এর সঙ্গে এসডিজির বেশ কয়েকটি লক্ষ্য,- যেমন, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, মানসম্মত শিক্ষা, জেন্ডার সমতা, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিস্কাশন, শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিমিত ভোগ ও উৎপাদন সম্পৃক্ত।
- বিষয় :
- নারী
- সমতার চ্যালেঞ্জ
- সমতা
- বৈষম্য বাড়ছে
- বৈষম্য
