বিশেষ লেখা
বাংলাদেশকে আরও নিরাপদ করবে এই রায়
মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ, নিরাপত্তা বিশ্নেষক
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৮
হলি আর্টিসান হামলা মামলার রায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শূন্য
সহিষুষ্ণতা নীতির একটি বড় মাইলফলক। এখানে আমরা দেখতে পেয়েছি, বাংলাদেশ
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে উগ্রবাদীদের কফিনে আরেকটি
পেরেক ফুটাল। বিভিন্ন সময় আমাদের দেশে জঙ্গিবাদকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিকভাবে
ব্যবহারের উদ্দেশ্যে উস্কে দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখেছি, অনেক দেশ জঙ্গিবাদকে
বিভিন্নভাবে ভাগ করেছে। এক দলকে তারা চিহ্নিত করেছে ভালো জঙ্গি হিসেবে,
যারা ওই রাষ্ট্রপক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে। জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বেড়ে
ওঠায় তারা। এ ক্ষেত্রে জঙ্গি হামলায় জড়িতদের বিচার খুব কমই দেখেছি। ভারতে
যেসব পাকিস্তানি জঙ্গি হামলা করেছে, পাকিস্তান তাদের বিচার করতে পারেনি;
বরং তাদের সুরক্ষা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোকে
বাছ-বিচার করা হয়নি। জঙ্গি মানেই তারা উগ্রবাদী এবং নিরীহ মানুষ হত্যাকারী।
এ দেশে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট যেসব জঙ্গিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী ধরতে পেরেছে, সুস্পষ্টভাবে আইনের আওতায় এনেছে তাদের। হলি আর্টিসানে
নৃশংস হামলায় যারা জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে বিচারের রায় সেটাই প্রমাণ করে।
বাংলাদেশে যত জঙ্গি হামলা হয়েছে এবং নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের
আইনের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। রাষ্ট্রের আইন দিয়ে জঙ্গিবাদ
নিয়ন্ত্রণ করার এটি একটি বড় উদাহরণ। হলি আর্টিসানে হামলার সময় পাঁচ জঙ্গি
ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। পরে এদের আটজন পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছে। জড়িত ২১
জনের বাকি আটজনকে বিচারের মুখোমুখি করা হলো।
আমরা জানি, জঙ্গি সংগঠনগুলো খুব গোপনীয় সংগঠন। যার ফলে তাদের বিরুদ্ধে
সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে পেশ করা খুব সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে সিটিটিসি বছরকাল ধরে
তদন্ত করে সঠিকভাবে চার্জশিট পেশ করতে পেরেছে। তাই বিচারটি স্বচ্ছভাবে করা
সম্ভব হয়েছে। বিচার চলাকালীন আমরা দেখেছি, অভিযুক্তদের যে সুযোগ-সুবিধা
পাওয়া দরকার, তারা সেটি ভোগ করেছে। যে জঙ্গির পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়ায়নি,
তার পক্ষে রাষ্ট্রই আইনজীবী নিয়োগ করেছে। সেক্ষেত্রে বিচারের স্বচ্ছতা
নিয়েও মানুষ সন্তুষ্ট। বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে জঙ্গিদের বিচার করার
ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের দিকে যখন আমরা তাকাই, তখন দেখা যায়, সুস্পষ্টভাবেই
এই জঙ্গিবাদ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
ধর্মকে ভিত্তি করেই জঙ্গিবাদ প্রসারিত হয়, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা দলগুলো
তাদের রাজনীতিকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। যার ফলে জঙ্গিবাদের পক্ষে দেশি-বিদেশি
পৃষ্ঠপোষকতা দেখতে পাওয়া যায়। যারা অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করে,
তারা সাধারণত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তবে হলি আর্টিসান হামলা মামলার
ক্ষেত্রে একজন অর্থ সরবরাহকারী ও একজন অস্ত্র সরবরাহকারীকে চিহ্নিত এবং
অভিযুক্ত করা হয়েছে চার্জশিটে। কিন্তু তাদের পেছনে আরও বড় কুশীলব যারা,
তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। সে ক্ষেত্রে আগামীতে পর্দার পেছনের কুশীলব ও যারা
কলকাঠি নাড়ে, যদি তাদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা যায়, তাহলে
জঙ্গিবাদ নির্মূলে সহায়ক অবস্থান সৃষ্টি করা যাবে।
এককথায় বলা যায়, হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশে জঙ্গিবিরোধী
অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং
গোয়েন্দা সংস্থা নিজের সক্ষমতাকে অনেক বৃদ্ধি করতে পেরেছে। হামলার পর এদেশে
যে নিরাপত্তার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, সেটি অতি সহজেই দেশকে আস্থার জায়গায়
ফেরত এনেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
হলি আর্টিসানে হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অকার্যকর করা এবং জঙ্গি
রাষ্ট্রে পরিণত করা। রাষ্ট্রযন্ত্র এবং দেশের জনগণ ওই অপউদ্দেশ্য নস্যাৎ
করে দিয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গি সংগঠনগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। বড় জঙ্গি
হামলার আশঙ্কা এখন শূন্যের কাছাকাছি।
রাজনৈতিকভাবে যদি জঙ্গিবাদ উস্কানি কিংবা পৃষ্ঠপোষকতা না পায়, তাহলে আগামী
দিনে জঙ্গি উত্থানের আশঙ্কা অনেক কম। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিরোধী যে কৌশল
প্রয়োগ করা হয়েছে, তা বিশ্বে অনুকরণীয় কৌশল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখানে
আমরা যেমন দেখেছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত হাতে জঙ্গি সন্ত্রাস
মোকাবিলা করেছে, অন্যদিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জঙ্গিদের বিচার
করেছে এবং জনগণের সচেতনতা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটি বড় উপাদান হিসেবে কাজ
করেছে। ফলে বাংলাদেশ এখন নিরাপদ বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে।
হলি আর্টিসান হামলায় জঙ্গিদের বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ায় আগামীতে জঙ্গিদের
পৃষ্ঠপোষকরা দূরে থাকবে। সেইসঙ্গে আমরা যদি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা দলকে
জঙ্গিদের থেকে দূরে রাখতে পারি, তাহলে জঙ্গিবাদ আরও পরাস্ত হয়ে যাবে। এই
রায় আরও নিরাপদ করবে বাংলাদেশকে।
- বিষয় :
- বিশেষ লেখা