ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

রিমান্ডে মুখ খুলতে শুরু করেছেন মামুনুল

রিমান্ডে মুখ খুলতে শুরু করেছেন মামুনুল
×

গ্রেপ্তার হেফাজত নেতা মামুনুল হককে সোমবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ-সমকাল

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ১৭:৩০

হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক রিমান্ডের প্রথম দিনেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সংগঠনটির সহিংস কর্মকাণ্ড, একাধিক বিয়ে নিয়ে গতকাল সোমবার গোয়েন্দাদের নানা তথ্য দিয়েছেন। তার ভাষ্য- যে দুটি বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ওই দুই নারীর সঙ্গে অনেক দিন ধরে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করে আসছেন তিনি। তবে বিয়ে-সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র তার কাছে নেই। কাবিনও নেই। ওই দুই নারীর ডিভোর্স হওয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই তাদের দিকে এগিয়ে যান তিনি। একজনকে মোহাম্মদপুরের একটি মাদ্রাসায় চাকরিও দিয়েছেন।

কাগজপত্র ও কাবিন না থাকা সত্ত্বেও বিয়ে কীভাবে বৈধ হলো- এমন প্রশ্নের উত্তরে অসংলগ্ন কথা বলেছেন মামুনুল হক। এ দিকে গতকাল পর্যন্ত তার কোনো স্বজন, সহকর্মী বা অনুরাগী তার খোঁজও নেননি। তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে এসব তথ্য জানান।

মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে গত রোববার দুপুরে মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ। মারধর, হুমকি, ধর্মীয় কাজে ইচ্ছাকৃত গোলযোগ সৃষ্টি, চুরির অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় গত বছর দায়ের করা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাজেদুল হক গতকাল মামুনুল হককে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) দেবদাস চন্দ্র অধিকারী রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ সমকালকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতেই মামুনুল হকের কাছে তার কথিত বিয়ে এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে ব্যঙ্গ করার বিষয় জানতে চাওয়া হয়। বিয়ের ব্যাপারে তিনি নিজের মতো ব্যাখ্যা দেন। তবে এটা স্বীকার করেছেন, এসব বিয়ের কোনো আইনগত প্রমাণ তার কাছে নেই। অন্য প্রশ্নে চুপ থাকেন তিনি।

মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অপর একজন কর্মকর্তা জানান, তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, হেফাজতের অধিকাংশ কর্মসূচি ঘিরে কেন তাণ্ডব ও নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। ইসলাম তো এসব সমর্থন করে না। সংগঠনটির নাম যখন হেফাজতে ইসলাম তখন কেন এর নেতাকর্মীরা এসব বর্বরতা এড়াতে আরও সতর্ক থাকেন না। এ প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, 'আমি যেহেতু নেতা, এর দায় আমারও রয়েছে। আমাকে এর দায় নিতে হবে। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনও তো সংঘাতে জড়ায়।' তবে অন্যান্য দলের খারাপ দৃষ্টান্ত হেফাজত কেন অনুকরণ করবে- এমন প্রশ্নে চুপ ছিলেন তিনি।

২০১৩ সালে হেফাজতের কর্মসূচিতে জ্বালাও-পোড়াও, পবিত্র কোরআন শরিফে আগুন দেওয়া, বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল পর্যন্ত এর উত্তরে স্পষ্ট কোনো জবাব দেননি মামুনুল হক। সংশ্নিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, এরই মধ্যে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ভেতরে-বাইরে তিনি দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী- এটি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কথিত বিয়ের কাহিনি ফাঁস হওয়ার পর থেকে ঘরে-বাইরে চাপে আছেন তিনি। হেফাজতের ভেতরেও একটি অংশ তার কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ। নারায়ণগঞ্জকাণ্ডের পর প্রথম স্ত্রীসহ নিজের পরিবারের সদস্যদের কারও কারও কাছে বিরাগভাজন হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরে বাসায়ও যাননি তিনি।

পুলিশের অপর একটি সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুরের যে মামলায় মামুনুলকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, সে-সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ গতকাল জব্দ করেছেন তারা। মূলত তাবলিগ জামাতকে কেন্দ্র করে জুবায়ের ও মোহাম্মদ সাদ কান্ধালভি গ্রুপের মধ্যে ওই মারামারি এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। মামুনুল ছিলেন জুবায়েরপন্থি।

সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা আরও জানান, মামুনুলের কথিত ছোট স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস লিপি। তবে জান্নাত আরা ঝর্ণাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করছেন তিনি। তার প্রথম স্ত্রীর নাম আমেনা তৈয়বা। কথিত মেজ ও ছোট স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ের কোনো কাবিন হয়নি বলে পুলিশকে জানান মামুনুল। কাবিন হলো বিয়ের আইনি দলিল। মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের নিবন্ধন একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে। নিবন্ধন ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রমাণ করা কঠিন। বিয়ের নিবন্ধন না থাকা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধে দু'বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও তিন হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

আদালতের দৃশ্য:মামুনুল হককে গতকাল হাতকড়া পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে আদালতে তোলা হলে রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে তার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জয়নাল আবেদীন মেসবাহসহ কয়েকজন। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু, আজাদ রহমানসহ কয়েকজন জামিনের বিরোধিতা করে রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন।

জয়নুল আবেদীন মেসবাহ শুনানিতে বলেন, 'মামুনুল হকের নির্দেশে নাকি কোনো এক ব্যক্তিকে মারধর করা হয়েছে এবং মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তবে কী নির্দেশ দিয়েছেন, কখন দিয়েছেন- এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য মামলার এজাহারে নেই। তাকে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা যুক্তিযুক্ত নয়।'

অন্যদিকে মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু তার বিরোধিতা করে বলেন, 'এই আসামি তার কর্মী বাহিনী দিয়ে দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে, তাই তার জামিন আবেদন বাতিল করে রিমান্ডের আদেশ দেওয়া হোক। মামলার বাদী মসজিদে গিয়েছিলেন। সেখানে মামুনুল হকের অনুসারীরা তার নির্দেশে বাদীর ওপর হামলা করে এবং তাকে মেরে মসজিদ থেকে বের করে দেয়। তার কাছ থেকে সাত হাজার টাকা এবং ২০০ ডলার ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় আরও কারা জড়িত ও কারা পলাতক, তা জানতে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।'

শুনানি চলাকালে মামুনুল হককে আদালতের কাঠগড়ায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পরে বিচারক রিমান্ড মঞ্জুর করলে কড়া পাহারায় তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়।

সংঘাতে না জড়াতে হেফাজত নেতাকর্মীদের নির্দেশ বাবুনগরীর: হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধারণ করার নির্দেশনা দিয়েছেন দলটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। তিনি বলেছেন, 'আপনারা ধৈর্য ধারণ করুন; কোনো সংঘাতে যাবেন না। কোনো জ্বালাও-পোড়াও করবেন না। হেফাজতে ইসলাম ভাঙচুর আর জ্বালাও-পোড়াওতে বিশ্বাস করে না। বরং হারাম মনে করে। আপনারাও ধৈর্য ধারণ করুন।' গতকাল নিজের ফেসবুক পেজে (জুনায়েদ বাবুনগরী) এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ নির্দেশনা দেন।

হেফাজত আমির বলেন, 'শুধু দুনিয়ার হায়াত নয়, আসল হায়াত শুরু হবে মৃত্যুর পর থেকে। কবরের হায়াত, হাশরের হায়াত, আখেরাতের হায়াত, বেহেশতের হায়াত। নিরাশ হবেন না। হতাশ হবেন না। হিম্মত, সাহস রাখুন; বালা-মুসিবত-বিপদে ধৈর্য ধারণ করুন। খবরদার! কোনো ভাঙচুর করবেন না। জ্বালাও-পোড়াও করবেন না। সংঘাতে যাবেন না।'

একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, 'এটা তো হযরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকে চলে আসতেছে। যাদের ইমান-আকিদা বেশি মজবুত তাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাও শক্ত হয়। বিপদও শক্ত আছে। নবীগণের দ্বীন ও ইমান সবচেয়ে বেশি শক্ত ছিল। তাই নবীরা বেশি বিপদের শিকার হয়েছেন। এর পর সাহাবায়ে কেরাম, তাদের দ্বীন ও ইমান শক্ত ছিল বিধায় তারাও নবীদের পরে বেশি বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন। এভাবে সিলসিলা চলতে থাকবে।'

তিনি বলেন, 'কাউকে ক্ষমতায় বসানো, কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানো হেফাজতে ইসলামের উদ্দেশ্য নয়- এটা পরিস্কার ভাষায় বলে আসতেছি। কোনো পার্টি বা দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হেফাজতে ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। হেফাজতে ইসলামের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর জমিনে মুহাম্মদ রাসুল (সা.)-এর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। কিন্তু কিছু কুচক্রীমহল নানাভাবে এসব গুজব ছড়াচ্ছে। সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ- আপনারা এ গুজবে কান দেবেন না।'

বাবুনগরী বলেন, "অনেকের সন্দেহ- 'হেফাজতে ইসলামের উদ্দেশ্য হলো অমুক অমুক দলকে ক্ষমতায় বসানো।...' নাউজুবিল্লাহ, এটি ডাহা মিথ্যা কথা। নির্জলা মিথ্যাচার।' তিনি আরও বলেন, হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে ২০১০ সালে। এখন ২০২১ সাল। এই ১১ বছরে কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না যে অমুক পার্টির সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের সম্পর্ক ছিল।"

আরও পড়ুন

×