ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি

কারখানার নিরাপত্তার দায়িত্ব কার

কারখানার নিরাপত্তার দায়িত্ব কার
×

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৪০

গত সপ্তাহে দু'দিনের ব্যবধানে কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানা এবং গাজীপুরে বৈদ্যুতিক পাখা উৎপাদনের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ২৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন আরও কয়েকজন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) জরিপ বলছে, গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ৪৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৭৪১ শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, নওগাঁ শহরের 'সুমী চানাচুর ফ্যাক্টরি' নামে একটি কারখানা রাষ্ট্রীয় আইন-বিধির কোনো তোয়াক্কা না করেই মানহীন খাদ্য উৎপাদন করে আসছিল। অনিয়মিত মজুরি পরিশোধ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশসহ বেশকিছু অনিয়মের সন্ধান পেয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। এর মধ্যে সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স না থাকায় কারখানাটির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সংস্থার কর্মকর্তারা। এত বড় অনিয়মের অপরাধে রাজশাহী শ্রম আদালত ওই মামলায় কারখানার মালিককে জরিমানা করেছেন মাত্র ২০ টাকা। ঘটনাটি ২০১৭ সালের। ২০১৭ সালের বাজারমূল্য অনুযায়ী ২০ টাকায় এক কেজি চালও পাওয়া যেত না। রাজশাহীর শ্রম আদালতের বিচারক মাহফুজুর রহমান ওই রায় দেন। ওই রায়ে নির্বাক হয়ে যান শ্রমিকরা। তবে খুব বেশি অবাক হননি ডিআইএফইর রাজশাহী অঞ্চলের একজন উপপ্রধান পরিদর্শক। সমকালকে তিনি জানান, একই আদালতে ১০ টাকা জরিমানা করার নজিরও আছে। কারণ শ্রম আইনে বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত আইন

অমান্য করলে তারা আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। সর্বনিম্ন কত জরিমানা করতে পারবেন সে বিষয়ে আইনে কিছু বলা নেই। কলকারখানার নিরাপত্তা প্রশ্নে এ রকম আরও বড় ধরনের আইনি দুর্বলতা আছে। এর ফলে কারখানায় নানাবিধ ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও মালিকরা তা গ্রাহ্য করেন না। অনিরাপদ কর্মপরিবেশেই কাজ করতে হয় কর্মীদের।

কলকারখানার নিরাপত্তা দেওয়ার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ডিআইএফইর। তবে সংস্থার পরিদর্শনের যত বড় অনিয়মই পাওয়া যাক না কেন, তাদের ক্ষমতা আছে 'সতর্ক' করার নোটিশ দেওয়া আর দ্বিতীয় পথ শ্রম আদালতে মামলা করা। কাঠামোগত এই দুর্বলতার কারণে সারাদেশের কলকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। যত্রতত্র যেনতেনভাবে গড়ে উঠছে কারখানা। জীবন ও সম্পদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এসব কারখানায় প্রায়ই ট্র্যাজেডি ঘটছে। আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণম্ন হচ্ছে। দর কমানোসহ ক্রেতাদের নানা চাপে পড়ছে রপ্তানি খাত। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ।

নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়হীনতা :নিরাপত্তার সঙ্গে দায়িত্বশীল সংশ্নিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা একটি বড় সমস্যা। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করতে গত বছর বৈঠক করে শ্রম মন্ত্রণালয়। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, পূর্ত বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ডিআইএফইসহ আরও কয়েকটি সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সমন্বয়ের বিষয়টিকে সব পক্ষ গুরুত্ব দিয়েছে। ওই বৈঠকের পরপরই এ নিয়ে আবারও বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তীতে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়। তবে গত এক বছরেও দ্বিতীয়বার বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যেক কারখানায় শ্রম পরিবেশ নিশ্চিত করা। সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় ডিআইএফই ছাড়াও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্তব্য রয়েছে। এর মধ্যে আছে স্থানীয় সরকারে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর বাইরে গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রেও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকে।

যোগাযোগ করা হলে ডিআইএফইর মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় সমকালকে বলেন, শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রধান দায়িত্ব তার সংস্থার। তবে সংশ্নিষ্ট বাকি প্রতিষ্ঠান এবং বিভাগ যেমন, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, এনবিআর, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগও একই সঙ্গে দায়িত্বশীল। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো কারখানাকে লাইসেন্স কিংবা অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে ডিআইএফইর লাইসেন্স আছে কি-না, সেটা দেখে না। এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়ে কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে, উৎপাদন চালানো হচ্ছে। আইনি সীমাবদ্ধতা এবং লোকবলের সংকট নিয়ে ডিআইএফইর পক্ষে সারাদেশের প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা মনিটর করা সম্ভব হয় না। সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে আরও দায়িত্বশীল করার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন সমকালকে বলেন, তিনি কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে চান না। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের নিরাপত্তার দায়িত্ব ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের না। তাদের কাজ হচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুমোদন করা। এক্ষেত্রে ন্যাশানাল বিল্ডিং কোড এবং অগ্নি আইনের ভিত্তিতে অনুমোদন দিয়ে থাকেন তারা। বাকি নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ডিআইএফইর মহাপরিদর্শক আরও বলেন, কোনো কারখানায় নিরাপত্তা ত্রুটি পাওয়া গেলে মামলা করা ছাড়া কোনো প্রতিকার তারা নিতে পারেন না। বড় ধরনের নিরাপত্তা ত্রুটি পেলে নিরাপত্তার স্বার্থেই কারখানা সিল করে দেওয়ার ক্ষমতা থাকা দরকার। তাহলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। তিনি বলেন, আইন সংশোধন, ডিআইএফইর জনবল বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুসমন্বয় গড়ে তোলা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা উন্নয়নে অন্যান্য বিষয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান এবং সচিব একেএম আলী আজমের নেতৃত্বে বৈঠক করেছেন তারা।

সাধারণ শিল্প উৎপানের প্রথমে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স দেয় স্থানীয় সরকার। একই কর্তৃপক্ষ থেকে ভবন নির্মাণের অনুমতি নিতে হয়। দ্বিতীয় ধাপে কারখানা ভবনের অবস্থানগত সনদ দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এ পর্যায়ে কারখানা নির্মাণ হলে আশপাশে পরিবেশের ওপর প্রভাব তদারক করে অনুমতি দেয় এই দপ্তর। ভবন নির্মাণ হলে সেটা কতটা পরিবেশসম্মত উপায়ে নির্মাণ করা হলো দ্বিতীয় পর্যায়ে আবারও সনদ নিতে হয় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে। নির্মিত ভবনটি অগ্নিনিরাপত্তা প্রশ্নে কতটা নিরাপদ, সেই সনদ দেয় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। কারখানা হলে মেশিন স্থাপনের নকশা অনুমোদন নিতে হয় ডিআইএফইএ থেকে। উৎপাদনে যাওয়ার ১৫ দিন আগে সনদ নিতে হয় ডিআইএফইএ থেকে। সর্বশেষ উৎপাদনে যাওয়ার আগে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হয় এনবিআরের সংশ্নিষ্ট শাখা থেকে। নিরাপত্তা মান যাচাই করেই এসব প্রতিষ্ঠান সনদ দেওয়ার কথা। ফলে কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দায় রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানেরই। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নূ্যনতম কোনো সমন্বয়ও নেই বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন।

৭৯ লাখ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় ৩২১ কর্মকর্তা : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, ৭৯ লাখ স্থাপনা বা ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত বা অর্থনৈতিক স্থাপনার সংখ্যা ৩৫ লাখ। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সাংগঠনিক কাঠামো, লোকবল এবং আইনি শক্তি নেই ডিআইএফইএর। মাত্র ৩২১ কর্মকর্তা নিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সম্প্রতি কর্মকর্তার সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারে উন্নীত করার একটি প্রক্রিয়া আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, নানা কারণে তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপত্তাই তাদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে।

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে কারখানা :গত বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এলাকাধীন শিল্প-কারখানার পরিস্থিতির ওপর জরিপ চালিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজের (সিএনআরএস) জরিপে দেখা যায়, পাঁচ হাজার ৫৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৫০টি কারখানার লাইসেন্স আছে। বাকি কারখানার লাইসেন্স নেই।

আরও পড়ুন

×