ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

বিমানে শুদ্ধি অভিযান

আতঙ্কে দুর্নীতিবাজরা

আতঙ্কে দুর্নীতিবাজরা
×

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও শহিদুল আলম

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:০৯ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:৩১

অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বরখাস্ত ও ওএসডি হওয়া সিভিল এভিয়েশন ও বিমানের কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে কোনো সময় তারা গ্রেপ্তার হতে পারেন।

দুর্নীতির অভিযোগে বিমানের সাবেক এমডিসহ চার কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার ও সিভিল এভিয়েশনের আট কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘুষ গ্রহণের সময় সিভিল এভিয়েশনের জুনিয়র লাইসেন্স ও কনসালট্যান্ট এইচ এম রাশেদ সরকারকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বিমান ও সিভিল এভিয়েশনে চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পায় বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় ও দুদক। তখন থেকেই তাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়। এর পর একে একে দুর্নীতিবাজরা ধরা পড়তে থাকেন।

সম্প্রতি কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ায় প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আমিনুল হাসিবকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এর আগেও কক্সবাজার বিমানবন্দরের জেনারেটর কেনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সিভিল এভিয়েশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শহীদুল আফরোজ, নির্বাহী প্রকৌশলী মিহির চাঁদ দে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের ম্যানেজার হাসান জহির, সহকারী প্রকৌশলী ভবেশচন্দ্র, শহীদুল ইসলাম মণ্ডল ও ঠিকাদার শাহাবুদ্দিনসহ আরও কয়েকজনকে কারাগারে যেতে হয়েছে। তারা সবাই জামিনে থাকলেও রয়েছেন গোয়েন্দা নজরদারিতে।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শহীদুল আফরোজ সমকালকে বলেন, দুদকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় এক বছর ধরে তিনি ওএসডি হয়ে আছেন। চাকরিতে যোগদান কবে হবে কিংবা আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত রয়েছেন। একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অন্যরাও।

জানা গেছে, সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিমানকে লাভজনক করার উদ্যোগ নেওয়ার পরই দীর্ঘদিন থেকে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শক্তিশালী সিন্ডিকেট দ্বারা টিকিট বিক্রি, পাইলট নিয়োগ, বিমানের মালামাল কেনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি ছিল ওপেন সিক্রেট। এর লাগাম টেনে ধরতে দেড় বছর আগে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে লাভজনক করাসহ অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

২০১৮ সালে মহিবুল হক এই মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে যোগদানের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিমানে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়। গঠন করা হয় শক্তিশালী তদন্ত কমিটি। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়। টিকিট কেনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি বিমানের টিকিট কেলেঙ্কারি, পাইলট নিয়োগে অনিয়ম, কার্গো শাখায় শত শত কোটি টাকা লোপাটসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সন্ধান পায়।

প্রথমেই টিকিটিং ব্যবস্থায় অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়ে। এর মধ্যে শুধু গত অর্থবছরেই টিকিট বাবদ বিমান ২০১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এসব ফাঁকফোকর বন্ধ করতে অনলাইনে টিকিট বিক্রির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বিমানের টিকিট নিয়ে দুর্নীতি বন্ধ হয়ে গেছে। এর পর থেকেই বিমান লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে।

এ কমিটি বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন শাখায় কর্মরত পদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সন্ধান পায়। কার্গো শাখায় ৪১২ কোটি টাকা লোপাট ও বিমানে পাইলট নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতিরও প্রমাণ পেয়েছে কমিটি। তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তার ভাতিজাসহ অন্তত ৩০-৩২ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে তাদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বলে প্রমাণ পায় কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতি ও অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তারা হলেন- বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) আতিক রহমান চিশতি ও হিসাব তত্ত্বাবধায়ক সাজেদুল হক। অনেকের চুক্তি বাতিল, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অন্যত্র বদলি ও ওএসডি করা হয়। এ ছাড়াও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিমানের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মন্ত্রণালয়। শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কারও অনৈতিক কার্যক্রমে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমানের ক্ষতি মেনে নেওয়া হবে না। এজন্য সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কাজ করছে। বিমানের নতুন এমডি দীর্ঘদিনের অচলায়তন এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন। বিমানের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে যা যা করণীয় সরকার সবই করবে।

সিভিল এভিয়েশনের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা, মেম্বার অপস) এয়ার কমডোর এম খালিদ হোসেন সমকালকে বলেন, দুর্নীতি করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। সিভিল এভিয়েশনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

আরও পড়ুন

×