বিশেষ লেখা
মানের বিষয়ে গুরুত্ব দিন
রাশেদা কে চৌধুরী
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৩৮
দেশের শিক্ষা খাতের শুভ উদ্যোগ ও অর্জনগুলো ২০১৯ সালেও অব্যাহত ছিল। নতুন
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে আমরা দেখেছি, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার
ক্রমাগত কমছে। অনেক বেশি ছেলেমেয়ে বিদ্যালয়ে আসছে। প্রতিবন্ধী শিশুরাও
আসছে। যদিও তাদের অংশগ্রহণের হার এখনও তেমন নয়। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক
শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ১৮ শতাংশের ওপরে শিক্ষার্থী এখন এ
ধারায় শিক্ষা নিচ্ছে।
বছরের শেষ দিকে শিক্ষা খাতে খুব ভালো একটি জিনিস আমরা পেয়েছি। সেটি হলো-
সরকারের 'মিড ডে মিল' পলিসি। নভেম্বরে মন্ত্রিসভা এ নীতিমালা গ্রহণ করেছে।
এর ফলে শিশুরা বিদ্যালয়ে গিয়ে রান্না করা খাবার পাবে। আর বিস্কুট খেয়ে
থাকতে হবে না। পলিসি গ্রহণ হয়েছে, এর বাস্তবায়নও আমরা এখন দেখতে চাই। খুবই
প্রশংসনীয় উদ্যোগ এটি।
শিক্ষা খাতের সব কিছু ছাপিয়ে দু-তিনটি বিষয় দেশের শিক্ষা সচেতন মানুষকে
উদ্বিগ্ন, চিন্তিত করেছে। তা হলো- শিক্ষার মান বাড়ছে না, নানাভাবে সেটি
প্রতিভাত হচ্ছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক একটি জরিপ ও গবেষণা
প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১১ বছরের স্কুলজীবনের
সাড়ে চার বছরই বৃথা যায়। ১১ বছর স্কুলিং করে যতটুকু শেখার কথা, দেখা গেছে
তার চেয়ে অন্তত চার বছর পিছিয়ে থাকছে একজন শিক্ষার্থী। এটি আমাদের উদ্বিগ্ন
না করে পারে না। কেবল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায়ই নয়, উচ্চতর শিক্ষায়ও
মান বাড়ছে না। এ বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষা সংশ্নিষ্টদের
পাশাপাশি সরকারের নীতি-নির্ধারকরাও উদ্বেগে আছেন। বিশ্বের সেরা
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে র্যাংকিংয়ে আমাদের দেশের কোনো উচ্চশিক্ষা
প্রতিষ্ঠান তলানিতেও থাকছে না। এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হবে। সবাই মিলে
কৌশল বের করে সে জন্য কাজ করতে হবে। এ ছাড়া দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা
বাড়ছে। এটি ভয়াবহ।
গত এক বছরে সবকিছু ছাপিয়ে বার বার যে বিষয়টি আমাদের উদ্বিগ্ন, ব্যথিত ও আহত
করেছে তা হলো- উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্থিরতা। শিক্ষার্থীরা মাঠে
নেমেছে। এর ফলে আন্দোলন, ক্লাস বন্ধ, পরীক্ষা বাতিল হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
উত্থাপিত হয়েছে নানা স্বজনপ্রীতির অভিযোগও। দলীয়করণ বেড়েছে, আগেও ছিল। এ
ধরনের অস্থিরতা আর আশঙ্কা শিক্ষার জন্য আদৌ অনুকূল নয়।
বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এ
হত্যাকাণ্ডের পরই আমরা জানতে পারলাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে র্যাগিংয়ের
ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটছে। শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
দেশবাসীকে কাপিয়ে দিয়েছে ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে
নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মারার ঘটনা। এ বীভৎস, নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর সরকারের
শীর্ষ মহল সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে ঘটনাটি নিয়েছে। এ মামলার দ্রুত বিচার
সম্পন্ন হয়েছে, দোষীরা সর্বোচ্চ সাজা পেয়েছে। এতে অন্তত একটি বার্তা
সারাদেশে ছড়িয়ে গেছে- এ ধরনের অপরাধ করে আর কেউ পার পাবে না।
শিক্ষা খাতের আরেকটি ভালো দিক হলো- সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমরা একটি
চমৎকার দিকনির্দেশনা পেয়েছি। তা হলো, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা
থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীকে আমি ধন্যবাদ জানাই আরও একটি কারণে, তিনি
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়ার নির্দেশ
দিয়েছেন। আমরা এটির জন্য অপেক্ষা করছি।
শিক্ষা খাতে আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিশ্ব
তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও এ খাতের বিনিয়োগে আমরা পিছিয়ে। চতুর্থ
শিল্প বিপ্লবের সফলতা ভোগ করতে হলে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কোনো বিকল্প
নেই।
আসছে নতুন বছরে আমাদের আশাবাদ, ২০২০ সালে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করব। বঙ্গবন্ধু যে অসাম্প্রদায়িক
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন, যে মুক্তচিন্তা আর গণতন্ত্রের
জন্য সংগ্রাম করেছেন, সেই বাংলাদেশের দিকেই আমরা এগিয়ে যাব। প্রত্যাশা
থাকবে- নতুন বছরে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা ও আশঙ্কা সব দূর হবে,
শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়বে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
- বিষয় :
- বিশেষ লেখা
