ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

গুরুত্বহীন হলফনামা

গুরুত্বহীন হলফনামা
×

মসিউর রহমান খান

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৪১

প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ভোটারদের মধ্যে প্রচারে এবারও নির্বিকার থাকছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বরাবরই বিষয়টি থাকছে উপেক্ষিত। এমনকি প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য কতটা সঠিক তা যাচাইয়ের উদ্যোগ কমিশন কখনোই নেয়নি। অথচ মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিলে প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের সুযোগও রয়েছে। এমনকি নির্বাচিত হওয়ার পরও প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ কমিশনের হাতে রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলের চাপে পড়ে কমিশন বিষয়টি একাধিকবার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। আদালতের নির্দেশনার কারণে তারা বিধানটি বাতিলের উদ্যোগ নিতে না পারলেও কখনোই কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।

নির্বাচন-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের প্রধান স্টেকহোল্ডার (অংশীজন) আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি ও অনাগ্রহের কারণেই ইসি বিষয়টি এড়িয়ে চলছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যসংবলিত হলফনামার বিধান চালু হয়েছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কমিশন এই বিধান চালু রেখেছে। এর আগে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের আমলে হলফনামার তথ্য লুকানোর প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা মনে করছেন, হলফনামার তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। অন্যদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হলফনামার তথ্য আরও স্পষ্ট, কার্যকর ও ভোটারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারের কোনো বিকল্প নেই। এ কাজটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখা এবং রাজনীতি কলুষমুক্ত করা কখনোই সম্ভব হবে না।

সিটি করপোরেশনের নির্বাচন পরিচালনার জন্য ইসি কার্যালয়ের প্রকাশিত ম্যানুয়ালে বলা আছে- 'প্রার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভোটারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। লিফলেট আকারে ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। লিফলেটের ব্যয় মেটাতে প্রয়োজনীয় অর্থ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বহন করবে। এই লিফলেট সিটি করপোরেশনের হাটবাজার বা অন্যান্য জনাকীর্ণ স্থানে প্রচারের ব্যবস্থা করবে।' এ ক্ষেত্রে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের সহযোগিতা নেওয়ার কথাও বলা রয়েছে।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা-২০১০ অনুসারে হলফনামার মাধ্যমে কোনো প্রার্থী তথ্য না দিলে, অসত্য তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিজ উদ্যোগে অথবা কারও আপত্তি আমলে নিয়ে তদন্ত করতে পারবেন এবং মনোনয়ন বাতিল করতে পারবেন। এ ছাড়া মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।

এবার ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে হলফনামা নিয়ে ইসির পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনে যে বিষয়গুলো রয়েছে, তা অবশ্যই মানতে হবে। এ ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা দায়বদ্ধ। তাদের এগুলো করতেই হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হলফনামা প্রচারের জন্য কমিশন সভায় পৃথক কোনো বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা হয়নি বা এভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়ও না। তবে নির্বাচনী সার্বিক খরচের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন কমিশন দেয়। এই খাতেও বরাদ্দ রয়েছে।

ইসি কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, প্রার্থীরা হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে তার দায়-দায়িত্ব তার নিজের ওপরেই বর্তায়। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কিছু করণীয় নেই। হলফনামার মাধ্যমে প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য ইসির পক্ষ থেকে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। যাতে ভোটাররা প্রার্থীদের মূল্যায়ন করে ভোট দিতে পারেন। তিনি আরও বলেন, কমিশনকে এত দায়িত্ব নিতে হলে কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হবে; সব ক্ষমতা একটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত হবার আশঙ্কাও রয়েছে।

শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি :বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়েও হলফানামা প্রচারের এই বিধান ঠেকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তখন 'ভুয়া ব্যক্তির' মাধ্যমে আবেদন করে আদালতেই আটকানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। আদালতের রায়ের পরে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকতেই অষ্টম সংসদে পাঁচটি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তখন বিচারপতি এম এ আজিজ ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ২০০৫ সালের ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত সুনামগঞ্জ-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থীরা হলফনামা জমা দিলেও রিটার্নিং কর্মকর্তা পুরো তথ্য প্রকাশ না করে সারাংশ প্রকাশ করেন। এর পক্ষে তখন নির্বাচন কমিশন ব্যাখ্যায় শাস্তির বিধান না থাকায় তথ্য প্রকাশ করা ঐচ্ছিক এবং বাধ্যতামূলক নয় বলে দাবি করা হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ায়ি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা তাদের সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন। নিয়মানুযায়ী নির্বাচন কমিশন তার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ওই নির্বাচন বয়কট করে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাদের প্রতিনিধি দল তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের কাছে এই তথ্য প্রকাশ বন্ধের দাবি জানায়। এরপর বর্তমান কমিশনের অধীনে নির্বাচনী সংলাপে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের একাধিক শরিক দল হলফনামার মাধ্যমে তথ্য দেওয়ার বিধান বন্ধের দাবি জানায়। অন্যদিকে, সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বিষয়টির বিরোধিতা করে এই বিধান চালু রাখার পাশাপাশি আরও কার্যকরের পরামর্শ দেওয়া হয়।

হলফনামার বিধান যেভাবে এলো :প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়ের উৎস ও ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে সংশ্নিষ্টতাসহ আট ধরনের তথ্য জানানোর নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের তিন আইনজীবী আবদুল মোমেন চৌধুরী, কে এম জাবের ও জহুরুল ইসলাম ২০০৫ সালে জনস্বার্থে রিট করেন। ওই বছরের ২৩ এপ্রিল সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি রুল জারি করেন আদালত। ২৪ মে হাইকোর্ট প্রার্থীদের আট ধরনের তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দিয়ে রায় দেন।

এরপর সন্দ্বীপের জনৈক আবু সাফার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের অবকাশকালীন চেম্বার বিচারপতি জয়নুল আবেদীন ২০০৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২২ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের (যা পরে হয়নি) মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পাঁচ দিন আগে এই স্থগিতাদেশ আসে। তাই তখন অভিযোগ ওঠে, বিএনপি পেছনে থেকে জনৈক আবু সাফাকে দিয়ে এই আবেদন করায়।

এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। ২০ নভেম্বর আদালত আবু সাফাকে হাজির করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তাকে হাজির করা হয়নি। ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ওই আপিল খারিজ করে দেন। ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে।

ওই রায়ে বলা হয়েছিল, প্রার্থীদের আট ধরনের তথ্য সর্বসাধারণের জানার জন্য প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হাইকোর্ট ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের উদাহরণ দেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়, ভোটাররা প্রার্থীদের অতীত ইতিহাস না জানলে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হবে, ভোটারদের ভোট দেওয়া অর্থহীন হবে। বাংলাদেশে আদালতের রায়ের পর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করা হয়। এতে কোনো প্রার্থী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে তার প্রার্থিতা বাতিল হবে বলে বলা হয়। হলফনামায় অসত্য তথ্য দেওয়ার কারণে আদালতের নির্দেশে নবম সংসদের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি জসিম উদ্দিন (ভোলা-৩) ও জাতীয় পার্টির এমপি আবুল কাশেমের (টাঙ্গাইল-৫) সদস্যপদ বাতিল হয়। কিন্তু ড. শামসুল হুদা কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরের দুই কমিশনের পক্ষ থেকে হলফনামা নিয়ে আর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।

ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সঙ্গে আট ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য উলেল্গখ করা বাধ্যতামূলক। এই তথ্য মিথ্যা বা ভুল প্রমাণিত হলে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিজ উদ্যোগে বা কারও অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিল করতে পারেন। পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট প্রার্থী দণ্ডবিধির ১৮১ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধী হিসেবেও চিহ্নিত হবেন।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ ব্যবস্থা প্রচলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করা। কিন্তু ইসি অতীতে এসব বিষয়ে যেভাবে নির্লিপ্ত থেকেছে, তাতে উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। তিনি আরও জানান, হলফনামায় তথ্য গোপনের দায়ে ২০০৫ সালে সর্বপ্রথম প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল ফরিদপুর-৪ আসনের উপনির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী কাজী সিরাজুল ইসলামের। পরে শাহ মো. আবু জাফরকে বিএনপি মনোনয়ন দেয়। তিনি মনে করেন, রাজনীতি সুস্থধারায় ফিরিয়ে আনতে এসব হলফনামা খতিয়ে দেখে ইসির পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, হলফনামার ছকটিতে যে অসম্পূর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা দূর করতে হবে। যেমন বর্তমানে অনেকে আয়ের উৎসের বিস্তারিত বিবরণ দেন না। কারা প্রার্থীদের ওপর নির্ভরশীল, সে তথ্যও হলফনামা থেকে পাওয়া যায় না। এ ছাড়া প্রার্থীর বয়স এবং তার বিদেশি নাগরিকত্ব-সম্পর্কিত তথ্যও হলফনামায় অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় রয়েছে। সম্পদ বিবরণের মাধ্যমে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হচ্ছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা ইসির কাজ। তারা এটা করলে নির্বাচনী রাজনীতিতে অনেক স্বচ্ছতা আসবে। এসব তথ্য যাচাই না করে ইসি তার দায় এড়িয়ে যাচ্ছে এবং তথ্য যাচাইয়ের পরেই একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন

×