অভিমত
বাস্তবায়নের সঠিক রূপরেখা নিয়ে প্রশ্ন
শামস মাহমুদ
শামস মাহমুদ
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৯:১৪ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে একে ব্যবসা ও জনবান্ধব বলা যায়। বাজেটে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অটোমেশনের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ, লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। কিন্তু কাগজে-কলমে যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে, তা বাস্তবায়নের সঠিক রূপরেখা কি আছে? এখানে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বাজেটে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, দেশের সব অর্থনৈতিক সমস্যা মিটে গেছে। বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত, যা থেকে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে। কিন্তু গত ১০ মাস ধরে এই খাতে রপ্তানি আয়ের একটি নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এর ওপর বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো বাহ্যিক বিষয়গুলো প্রভাব ফেলছে। এতে পেট্রোলিয়াম-নির্ভর পলিয়েস্টার বা তৈরি পোশাক পণ্যের উৎপাদন খরচ ও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। অন্যদিকে বিদেশের বাজারেও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় প্রবাসীরা আগের মতো রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন না, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় চাপ তৈরি করবে।
সাধারণত বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে নতুন বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির নতুন নীতির কথা বলছে। এর সুফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এটি এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা বা ‘এক্সেস টু ফাইন্যান্স’ নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসবে না। আর্থিক খাতের যে সমস্যাগুলো বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, সেগুলো এখনও আছে এবং তা নিরসন করা জরুরি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যপণ্যের ওপর থেকে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কমানোর পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। তবে এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো নিয়ে সংশয় আছে। বাজারে যারা পণ্য বিক্রি করেন, তারা যদি দাম না কমান তাহলে এই করছাড়ের কোনো মানে নেই। এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আইটি ফ্রিল্যান্সিংয়ে কর প্রত্যাহার এবং স্টার্টআপের জন্য ফান্ডের উদ্যোগগুলো ভালো। কিন্তু স্টার্টআপ ফান্ডের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা আশার আলো দেখাচ্ছে না। এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সবশেষে বলতে হয়, বাজেট পেশ করা এবং বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। এই বাজেট বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব আমলাতন্ত্র ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের। কিন্তু অতীতে যারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হতে পারেননি, সেই একই লোকবল দিয়ে এই উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। এ ছাড়া সরকার যদি বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে, বেসরকারি খাত ঋণ সংকটে পড়তে পারে।
বাজেটে সবার কথা বলা হয়েছে। উদ্যোগগুলোও চমৎকার। এর অর্থায়ন এবং সঠিক বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
লেখক: সাবেক সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
- বিষয় :
- অভিমত
- বাজেট ২০২৬-২৭