চর্চা: রুয়েট থেকে শুরু ‘লার্নিং রিভল্যুশন’
মো. আশিকুর রহমান
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:৫৫
ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় পাহাড়সম গাইডবুক আর প্রশ্নব্যাংকের চাপে যখন নাভিশ্বাস ওঠার দশা, তখনই মাথায় আসে ভাবনাটি– পড়াশোনা কেন আনন্দদায়ক হবে না? কেন পরীক্ষা মানেই হবে একরাশ ভয়? এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘চর্চা’ (Charcha)। রুয়েট ক্যাম্পাস থেকে শুরু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি আজ বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রস্তুতির নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।
শুরুর গল্প: ক্লাসরুম থেকে উদ্যোক্তা চর্চার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ২০২১ সালে। এর পেছনে ছিলেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান উল ইসলাম। ভর্তি প্রস্তুতির সময় তিনি লক্ষ্য করেন, ক্লাস ও লেকচারের চাপে নিজের অনুশীলনের জন্য সময় পাওয়া ভার। গৎবাঁধা নিয়মের বাইরে গিয়ে প্র্যাকটিসকে কীভাবে আরও সহজ, ‘ফান’ এবং কার্যকর করা যায়– এই তাড়না থেকেই চর্চার যাত্রা।
রুয়েটে ভর্তির পর রায়হানের এই স্বপ্নে যুক্ত হন তাঁর সহপাঠী ও বন্ধু নাফিস (কো-ফাউন্ডার ও সিএমও) এবং পরবর্তীতে গালিব (কো-ফাউন্ডার ও সিওও)। ক্লাসরুমের আড্ডা থেকেই ডানা মেলে এই স্টার্টআপ। তারা নিজের হাতে মার্কেটিং ও অপারেশনের হাল ধরেন এবং আজ চর্চা মানেই হলো ক্লাস ৮ থেকে শুরু করে বিসিএস বা ব্যাংক জব প্রস্তুতির এক ডিজিটাল সমাধান।
চর্চা কেবল একটি অ্যাপ নয়, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পার্সোনালাইজড লার্নিং ইকোসিস্টেম। এর সবচেয়ে চমকপ্রদ ফিচার হলো ‘চর্চা এআই’। এটি ১০ লক্ষাধিক প্রশ্নের ডেটাবেজ এবং এনসিটিবি পাঠ্যবইয়ের ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি এআই এজেন্ট। কোনো অঙ্ক বা তথ্য বুঝতে সমস্যা হলে শিক্ষার্থীরা এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সমাধান পান।
পড়াশোনাকে একঘেয়েমিমুক্ত করতে এতে যুক্ত হয়েছে ‘গেমিফাইড’ সব ফিচার। যেমন– স্ট্রিক বজায় রাখা, লিডারবোর্ড এবং বিস্তারিত মাসিক প্রোগ্রেস রিপোর্ট। এক বছর ধরে টানা প্রতিদিন প্র্যাকটিস করে ‘স্ট্রিক’ বজায় রাখা শিক্ষার্থীও রয়েছে এই অ্যাপে। লিডারবোর্ডের টপ ‘ইনফিনিটি লিগে’ যাওয়ার প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি
করে সুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা।
সবকিছু যখন ঠিকঠাক চলছিল, তখনই আসে এক বড় বিপর্যয়। গত বছরের ১৪ নভেম্বর গুগল প্লে-স্টোর থেকে হঠাৎ সরিয়ে নেওয়া হয় চর্চা অ্যাপটি। ১৭ লাখ ইনস্টল আর ৩০ হাজার পজিটিভ রিভিউ মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। প্রতিষ্ঠাতা রায়হান বলেন, ‘সেই সময়টা আমাদের পুরো টিমের জন্য এক চরম পরীক্ষা ছিল। অনেক চেষ্টার পরও যখন অ্যাপ ফেরানো যাচ্ছিল না, তখন আমরা শূন্য থেকে আবার শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই।’ এই অদম্য মানসিকতা নিয়ে নতুন করে অ্যাপ লঞ্চ করার সাহসই চর্চাকে আজ অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
লক্ষ্য এবার বিশ্বজয়
বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ওয়ান-স্টপ লার্নিং সল্যুশন হওয়ার পাশাপাশি চর্চার চোখ এখন বিশ্ববাজারে। আগামী পাঁচ বছরে ১০ কোটি ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে রুয়েট থেকে শুরু হওয়া এই তরুণদের দল। রায়হান উল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন পরিষ্কার–বাংলাদেশ থেকে জন্ম নেওয়া একটি প্ল্যাটফর্মকে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিক্ষার্থী তাদের শেখার সঙ্গী হিসেবে বেছে নেবে।’ রুয়েট ক্যাম্পাসের সেই ছোট্ট স্বপ্নটি আজ লাখো শিক্ষার্থীর হাতের মুঠোয়। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমেই যে কোনো বাধা জয় করা সম্ভব– এটিই যেন চর্চা অ্যাপের মূল মন্ত্র।
- বিষয় :
- রুয়েট
