ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন

প্রচারে প্রতিশ্রুতির বন্যা

প্রচারে প্রতিশ্রুতির বন্যা
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৩৪

ভোটের প্রচারে সরগরম রাজধানী ঢাকা। গতকাল শুক্রবার দিন-রাত প্রচার ছিল তুঙ্গে। প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিতে কমতি রাখেননি। রাস্তা প্রশস্ত হবে, জলাবদ্ধতা দূর হবে, আবর্জনা থাকবে না, সুপেয় জল মিলবে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট থাকবে না- আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চার মেয়র প্রার্থীর প্রচারেও ঘুরেফিরে ছিল এসব প্রতিশ্রুতি।

আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ভোট। গতকাল ছিল প্রচারের অষ্টম দিন। আগের দিনগুলোর প্রচারে ধানের শীষের প্রার্থীদের বক্তব্যে ঘুরেফিরে ছিল নির্বাচনে কারচুপির শঙ্কা। গতকাল নৌকার প্রার্থীদের মতো তারাও দিয়েছেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।

উৎসবমুখর প্রচারের দিনে রাজধানীর দুটি ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা উত্তরে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী মাসুদ খান অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবু তাহেরের কর্মী-সমর্থকরা গতকাল দুপুর ১টার দিকে তার প্রচারে হামলা করেছে। তিনজন আহত হয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণের ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেন আনু অভিযোগ করেন, গোপীবাগের আরএন দাস রোডে তার প্রচারে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নিজামউদ্দিনের কর্মী-সমর্থকরা হামলা করেছে। এতে ১০ জন আহত হয়েছেন।

উন্নয়নের রূপরেখা তাপসের :ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজল নূর তাপস গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় ফুলবাড়িয়া থেকে গণসংযোগ শুরু করেন। তার দাবি, তিনিই একমাত্র প্রার্থী, যিনি ঐতিহ্যের ঢাকাকে ঘিরে পরিকল্পিত উন্নয়নের রূপরেখা দিয়েছেন। আবারও পুরান ঢাকার গর্ব ও ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকার করে তাপস বলেন, পাঁচ ধাপের সুনির্দিষ্ট উন্নয়নের রূপরেখা দিয়েছেন তিনি। বিজয়ী হলে ধাপে ধাপে এগুলো বাস্তবায়ন করবেন। তাপসের রূপরেখা হলো- ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা এবং উন্নত ঢাকা।

বঙ্গবন্ধুর নাতি তাপসের প্রচারে ছিলেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নৌকার প্রার্থীকে নিয়ে তারা মিছিল-স্লোগানে ভোটের প্রচার চালান। প্রচারে ব্যাপক জনসমাগম দেখে তাপস বলেন, তার উন্নয়নের রূপরেখা ঢাকাবাসী সাদরে গ্রহণ করেছেন। ভোটের মাধ্যমে তাকেই জনগণ তাদের সেবক হিসেবে নির্বাচিত করবে। ৩০ জানুয়ারির ভোটে তাদের বিজয় সুনিশ্চিত বলেও দাবি করেন তিনি।

নির্বাচনে কারচুপির শঙ্কা করছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এর জবাবে তাপস বলেন, 'নেতাকর্মী ও জনগণের মাঝে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। তারা অভিযোগ নিয়ে ব্যস্ত, আমরা গণসংযোগ নিয়ে।'

ফুলবাড়িয়া থেকে নাজিরাবাজার এলাকায় যান তাপস। স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে তুলে দেন লিফলেট। বিজয়ী হলে পুরান ঢাকাকে নতুন করে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নৌকায় ভোট প্রার্থনা করেন।

নিজেদের দাবি-দাওয়াও তুলে ধরেন স্থানীয়রা। পুরান ঢাকার অলিগলি ও রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা, জলাবদ্ধতা দূর করার দাবি তোলেন। দুপুরে আরমানিটোলার তারা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন তাপস। এরপর বংশাল, কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকা এবং কোতোয়ালির বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করেন।

এদিকে গতকাল তাপসের পক্ষে গণসংযোগে নামেন সঙ্গীত, নাট্য ও চলচ্চিত্র শিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মীরা। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে শিল্পীরা রাজধানীর সবুজবাগ বরদেশ্বরী কালিমাতা মন্দিরের সামনে থেকে সবুজবাগের বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করেন। তারা তাপসের সমর্থনে প্রচারপত্র বিতরণ ও মানুষের কাছে ভোট প্রার্থনা করেন।

গণসংযোগকালে বরদেশ্বরী কালিমন্দির সংলগ্ন স্থানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি কণ্ঠশিল্পী রফিকুল আলম, সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার রানা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অভিনেত্রী তারিন জাহান, চলচ্চিত্রবিষয়ক সম্পাদক চিত্রনায়িকা শাহনূর, নাট্যাভিনেতা প্রণীল, কণ্ঠশিল্পী কল্লোল সারোয়ার, জয়দেব রায়, গিয়াস উদ্দিন গিয়াস প্রমুখ।

জীবন দিতেও প্রস্তুত ইশরাক :দক্ষিণে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন বলেন, মামলা-হামলায় পিছপা হবেন না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জীবন দিতেও তিনি প্রস্তুত রয়েছেন। দুর্নীতিবাজ, লুটেরাদের দুঃশাসন চলছে। ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে ৩০ জানুয়ারি ধানের শীষে ভোট চান অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক।

গতকাল কদমতলীর বর্ণমালা স্কুলের সামনে পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন। কদমতলী ও শ্যামপুরের জনদুর্ভোগ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশরাক বলেন, গত নয় বছর যাদের অধীনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচালিত হয়েছিল তাদের অবহেলা, দুর্নীতিতে ঢাকা বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা এক নম্বরে। বায়ুদূষণের তালিকায়ও এক নম্বরে, নারী ও শিশুদের জন্য অনিরাপদ শহরের তালিকায় ঢাকা এক নম্বর। মেয়র নির্বাচিত হলে ঢাকাকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করার প্রতিশ্রুতি দেন ইশরাক।

ইশরাকের সঙ্গে প্রচারে ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সালাউদ্দিন আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

বর্ণমালা স্কুল থেকে গণসংযোগ শুরু হয়ে জাপানি মার্কেট, কদমতলা, মুরাদপুর, পূর্ব জুরাইন, পোস্তগোলা আলম মার্কেট রোড, শ্যামপুর রোড, শ্যামপুর বাজার, শ্যামপুর সরকারি মডেল কলেজ হয়ে শ্যামপুর লাল মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন।

নির্বাচিত হলে জবাবদিহি করবেন আতিকুল :উত্তরে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে প্রতি মাসে প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের সঙ্গে সভা করে জবাবদিহি করবেন নগরবাসীর কাছে।

গতকাল রাজধানীর বাউনিয়া এলাকায় ভোটের প্রচারে এ কথা বলেছেন আতিকুল। সকালে কালীবাড়ি (বালুঘাট) বাউনিয়া মোড় গণসংযোগ শুরু করেন তিনি। এরপর মানিকদী, মাটিকাটা, লালসরাই এলাকায় ভোটের প্রচার চালান। দুপুরের পর ভাসানটেক, বাইগারটেক, আলব্দীটেক, বারনকোট, দামালকোট ও বিআরবি কলোনিতে গিয়ে নৌকায় ভোট প্রার্থনা করেন আতিকুল।

তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনবেন। যেসব সমস্যা সমাধান হয়নি, যেসব উন্নয়ন বাকি আছে সেগুলো করবেন। সিটি করপোরেশনের যতটা সামর্থ্য রয়েছে, তাই দিয়ে জনগণের সেবা করবেন। এটাই জনগণের কাছে তার অঙ্গীকার।

নির্বাচিত হলে ছয় মাসের মধ্যে বাউনিয়া এলাকার সড়ক প্রশস্ত করার কাজ শুরু করেবেন বলে ওয়াদা করেন আতিকুল। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, 'যেখানে ২০ ফুট রাস্তা আছে, তা অন্তত ৬০ ফুট করতে হবে।'

নৌকায় ভোট চেয়ে আতিকুল বলেন, নৌকা ব্যাক গিয়ার নেই, নৌকার আছে শুধু ফ্রন্ট গিয়ার। নয় মাস মেয়রের দায়িত্বে থাকাকালে সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, সমাধানের পরিকল্পনাও করেছেন। আবার মেয়র হলে ফুটপাত, এলইডি লাইট, ড্রেনেজ, রাস্তাসহ আধুনিক পরিকল্পিত বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার কাজ আগামী ছয় মাসের মধ্যে শুরু করবেন।

নাগরিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি তাবিথের :উত্তর সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেছেন, ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাস্তা, ড্রেনেজ, পয়ঃনিস্কাশনসহ সব নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত নগরবাসী। মেয়র নির্বাচিত হতে পারলে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে আধুনিক ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাবিথ।

গতকাল সকালে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে পথসভায় এসব কথা বলেন তাবিথ। এখান থেকে শুরু করে তিনি মোহাম্মদপুরের অলিগলি, জেনেভা ক্যাম্পে প্রচার চালান। দোকানে দোকানে লিফলেট বিতরণ করেন। পথচারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করেন। তাবিথ বলেন, ভোটের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ঢাকাবাসী শরিক হয়েছেন। নগরবাসীই তাকে সাহস জোগাচ্ছেন। এভাবে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত সবাইকে মাঠে থাকতে হবে।

তাবিথ আউয়াল বলেন, আধুনিক ঢাকা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন। ঢাকাবাসী তাকে গ্রহণ করেছেন। তিনি নির্বাচিত হলে ঢাকাবাসীর সুখ-দুঃখের নিত্যসঙ্গী হবেন। ধানের শীষের প্রার্থী অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন ইচ্ছা করে ৩০ জানুয়ারি সরস্বতী পূজার দিন ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ধানের শীষে ভোট দিয়ে এর জবাব দিতে আহ্বান জানান তিনি।

বাবর রোডে ভোটের প্রচারে তাবিথ বলেন, এখানে বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। সুপেয় পানির অভাব আছে। জলাবদ্ধতা হয়, পয়ঃনিস্কাশনের ভালো ব্যবস্থা নেই। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যার সমাধান করবেন।

তাবিথ বলেন, জেনেভা ক্যাম্প ঢাকা সিটি করপোরেশনেরই অংশ। এখানকার বাসিন্দাদের আধুনিক ঢাকার সুযোগ-সুবিধার বাইরে রাখার সুযোগ নেই। এ সময় তাবিথের পক্ষে উর্দুতে স্লোগান ওঠে। উর্দুভাষীদের উদ্দেশে তাবিথ বলেন, ভোটকেন্দ্রে যাবেন, ধানের শীষে ভোট দিয়ে দুর্ভোগ দূর করতে রায় দেবেন।

তাবিথের প্রচারে অংশ নেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, মহানগর উত্তরের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

আরও পড়ুন

×