সড়কে দুই বান্ধবীর মৃত্যু
দুর্ঘটনা নাকি অন্য কিছু- সংশয় স্বজনদের
সৈয়দা কচি হকের কাছে পাওয়া পরিচয়পত্র- সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৮:০৫ | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৮:১৬
বয়সের কিছু পার্থক্য থাকলেও ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিলেন কর্মজীবী নারী সৈয়দ সোনিয়া আমিন (২৫) ও সৈয়দা কচি হক (৩৮)। কোথাও বেড়াতে হলে একসঙ্গেই যেতেন। মঙ্গলবার রাতেও তেমনি গিয়েছিলেন তাদের বন্ধুপ্রতিম এক বড় বোনের বাসায়।
আড্ডা শেষে মধ্যরাতে স্কুটিতে চেপে তারা বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় মহাখালীর সেতু ভবনের সামনের সড়কে কোনো যানবাহনের ধাক্কায় তারা ছিটকে পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই দু'জনের মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এ ঘটনায় দায়ী যানটিকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি 'অন্য কিছু' তা নিয়ে সংশয় আছে স্বজনদের।
বনানী থানার ওসি নূরে আযম মিয়া সমকালকে বলেন, ঘটনাস্থলের আশেপাশের ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে ঘটনার সময় গভীর রাত হওয়ায় অফিসগুলো বন্ধ ছিল। এ কারণে তাদের সিসি ক্যামেরাও তখন সচল ছিল না। ফলে দুর্ঘটনার কোনো ভিডিও পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি দুর্ঘটনা বলেই
মনে হয়েছে। সেই অনুয়ায়ী একটি মামলাও হয়েছে। জড়িত যান ও এর চালককে শনাক্ত
করার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, মিরপুরের শাহ আলী থানার অদূরে স্টাফ কোয়াটারে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন সৈয়দ সোনিয়া আমিন। তিনি একটি ভারতীয় প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। মাঝেমধ্যেই সেদেশে যেতেন ও বেশ কিছুদিন থাকতেন। এই সূত্রে ভারতীয় নাগরিক সৈয়দ মহসীনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নয় মাস আগে তারা বিয়ে করেন। কিছুদিন আগে দেশে ফেরেন সোনিয়া। সর্বশেষ তিনি কোনো চাকরি করছিলেন না। মঙ্গলবার রাতে বনানীতে 'নীলু আপা' নামে একজনের বাসায় যান সোনিয়া ও তার ঘনিষ্ঠ কচি হক।
সোনিয়ার মা মনোয়ারা বেগম জানান, তার দুই মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে সোনিয়া ছিল তৃতীয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তার ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত কারণে ভিসা জটিলতায় আর যেতে পারেনি। ফলে আগামী মাসে স্বামীর কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সে।
তিনি জানান, পাঁচ বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন শাখায় কাজ করতে গিয়ে সোনিয়া ও কচির পরিচয় হয়। সেই থেকে তাদের বন্ধুত্ব। কচি পরে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও দুজনের বন্ধুত্বে ভাটা পড়েনি। সোমবারও কচির বাসায় যায় সোনিয়া।
সোনিয়ার চাচাত ভাই সুজন জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলা সদরের সিকদার বাড়ি এলাকায়। সোনিয়ার বাবার নাম নুরুল আমিন।
সৈয়দা কচি হকের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলায়। তার বাবা সৈয়দ ফজলুল হক আগেই মারা গেছেন। কচি উত্তরায় পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানে টেরিটরি অফিসার হিসেবে চাকরি করতেন। আট বছর ধরে তিনি এই চাকরি করে আসছিলেন। দুই বোনের মধ্যে ছোট কচি অবিবাহিত ছিলেন। তার বড় বোনের নাম চুমকি। দুই বোন কল্যাণপুরের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। নিজের স্কুটি দিয়েই চলাফেরা করতেন কচি। তিনি প্রতিদিন সকাল ৯টায় বাসা থেকে বের হয়ে অফিসে যেতেন। আবার রাত ১১টার আগেই বাসায় ফিরতেন।
কচির মামা অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন জানান, মঙ্গলবার রাতের দুর্ঘটনার ছবি ফেসবুকে দেখে একজন তাকে ফোন করে বিষয়টি জানান। বুধবার ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) মর্গে গিয়ে তিনি ভাগ্নির লাশ শনাক্ত করেন। তবে এত রাতে কচি কোথায় গিযেছিলেন সেটা তার জানা নেই। আর এমন জনচলাচলের জায়গায় দু'টি মেয়ের লাশ পড়েছিল, অথচ কেউ কিছু বলতে পারছে না, বিষয়টি তার কাছে রহস্যজনক মনে হয়েছে। কোন গাড়ি ধাক্কা দিয়েছে তাও বলতে পারে না পুলিশ বা কেউ। এখানে অন্য কোনো ঘটনা থাকতে পারে বলে সন্দেহ তার।
ঢামেকা হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদশর্ক বাচ্চু মিয়া জানান, মঙ্গলবার রাত দেড়টার দিকে অচেতন ও রক্তাক্ত অবস্থায় দুই নারীকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। চিকিৎসকরা তাদের পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
সড়কে এই দুই নারীর মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকা স্কুটির গায়ে 'প্রেস' লেখা ছিল। রাতে যখন দুর্ঘটনার খবর আসে তখন গণমাধ্যমকর্মীরা কেউ তাদের সহকর্মী হিসেবে ওই দুইজনকে শনাক্ত করতে পারছিলেন না।
এ প্রসঙ্গে কচির স্বজন
জানান, বছরখানেক আগে স্বল্পপরিচিত একটি পত্রিকায় চাকরি নিয়েছিলেন তিনি।
তখনই স্কুটিতে প্রেস লিখে নিয়েছিলেন। পরে তিনি পত্রিকার চাকরি ছেড়ে আবার
বিপণনের কাজে ফেরেন।
- বিষয় :
- সড়ক দুর্ঘটনা
- মহাখালীতে সড়ক দুর্ঘটনা
