গৃহহীনরা ঘরে থাকবে কী করে
×
রাজীব আহাম্মদ
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৪০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
পান্থপথে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে থাকেন তাসলিমা বেগম। বয়স তার ২৮। ১৪ বছর আগে ঢাকায় আসেন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে। এরপর থেকে তার ঠিকানা কখনও বস্তি, কখনও ফুটপাত। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। অকারণে বাইরে বের হলে রয়েছে শাস্তির হুঁশিয়ারি। নির্দেশনার কথা শুনে বিস্মিত তাসলিমার জিজ্ঞাসা, তার তো বাড়িই নেই, ঘরে থাকবেন কী করে!
এই প্রশ্ন আরও অনেকের। গত বছরের জুনে জাতীয় সংসদে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা সাড়ে ছয় লাখ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর 'বস্তিশুমারি ও ভাসমান লোক গণনা জরিপ-২০১৪'তে এ হিসাব উঠে আসে। তার পর ছয় বছরে নতুন জরিপ হয়নি। তবে বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে। জরিপে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আলাদা করা হয়নি। তবে ভাসমান মানুষের মধ্যে কাজ করা বিভিন্ন এনজিওর হিসাবে রাজধানীতে তাসলিমার মতো অন্তত ৫০ হাজার মানুষ রয়েছেন যাদের ঘর নেই।
করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে গোটা দেশ ঘরবন্দি হয়ে থাকলেও ভাসমান মানুষের যাওয়ার জায়গা নেই। তারা থাকেন পথে, ফুটপাতে, স্টেশনে, পার্কে। এসব স্থানেই তাদের খাওয়া, ঘুম ও জীবনের অন্যান্য কাজ চলছে। প্রতিবেশী ভারতের কলকাতায় ফুটপাতবাসীরাও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে- এমন খবর পাওয়া গেছে। ভাসমান মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার সুযোগ না থাকায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশেও একই বিপদ ঘটতে পারে।
গত রোববার বিকেলে তাসলিমার সঙ্গে কথা হয় পান্থপথে তার 'নিবাসের' সামনে। তখন ঘড়িতে সময় বিকেল প্রায় সাড়ে ৪টা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়াল ঘেঁষে পলিথিন দিয়ে ঝুপড়ি তুলে এক সন্তান ও মাকে নিয়ে সেখানে থাকেন তিনি। পুরো পরিবারের তখন দুপুরের খাবার আয়োজন চলছিল। ফুটপাতে ইটের ওপর হাঁড়ি বসিয়ে কুড়িয়ে আনা পল্গাস্টিক, শুকনো ডাল দিয়ে রান্না করছিলেন তাসলিমা।
সেখানে তাসলিমা ছাড়াও আরও চারটি পরিবার থাকে। সব মিলিয়ে ১৪ জনের বাস ওই ফুটপাতে। আগে তারা থাকতেন পান্থকুঞ্জ পার্কের ফুটপাতে। সেখানে উন্নয়ন কাজ শুরুর পর চলে এসেছেন পান্থপথে। তাসলিমা বললেন, করোনার ভয় পেলে তাদের চলবে না। পেটের ভাত জোগাড় করতে পথে থাকতেই হবে। আর ঘরই তো নেই, থাকবেনই বা কোথায়!
সোনারগাঁও হোটেলের প্রধান ফটকের বিপরীতে রোড ডিভাইডারে পলিথিন দিয়ে ছাউনি তুলে থাকেন মো. লিটন। একসময় নেশা করতেন। তিন কুলে কেউ নেই। এখন প্লাস্টিক কুড়ানো আরও চার কিশোরের সঙ্গে পলিথিনের ছাউনির নিচে থাকেন। নিজের কথা বলতে বলতে দুপুরের রান্না করছিলেন লিটন। রান্না বলতে ভাত ও গরুর মাংসের উচ্ছিষ্টাংশ। কুকুরের খাবার হিসেবে বিত্তবানরা এ উচ্ছিষ্টাংশ কিনে নেন কারওয়ান বাজার থেকে। গৃহহীন লিটনও তা খান! প্রথমে সেগুলো সিদ্ধ করেন। তারপর পেঁয়াজ দিয়ে তেলে ভাজেন। রান্না করেন মসলা ছাড়াই। খাবার দেখিয়ে লিটন বললেন, এটোকাটা খেয়ে বেঁচে আছেন। করোনা আর কী মারবে। পুলিশ তাড়া করে, ঘরে থাকতে বলে। কিন্তু ঘরই তো নাই, যাব কই?
ঢাকার পথে পথে এমন অসংখ্য লিটন ও তাসলিমা ঘুরে বেড়ান। এদের এবং গাদাগাদি করে বস্তির এক কামরার বাড়িতে পুরো পরিবার নিয়ে বসবাসকারী বস্তিবাসীরও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উপায় নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানীসহ সংশ্নিষ্ট সবাই বারবার সতর্ক করছেন, লাখ লাখ বস্তিবাসী এবং শহরের 'ভাসমান' মানুষের মাধ্যমে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ শহরজুড়েই এসব অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকারী মানুষের বিচরণ।
করোনার বিস্তার ঠেকাতে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দরিদ্র এসব মানুষের স্বাস্থ্যবিধি এবং খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তারা ঘরে থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান বলেছেন, সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিই ভাসমান, ছিন্নমূল মানুষের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। করোনা থেকে বাঁচতে যেসব সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন, সেগুলো আরও সম্ভব নয়। তবে ভাসমান মানুষের মধ্যে করোনার বিস্তার রুখতে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। ছিন্নমূল মানুষকে আলাদা করে আইসোলেশনে রাখতে হবে। নিরাপদ ঘরে রাখতে হবে। তাদের খাদ্য সহায়তা দিতে হবে।
করোনা থেকে বাঁচতে বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। ফুটপাতে থাকা মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি একটি বড় সমস্যা। লিটন জানালেন, পাঁচ লিটারের দুটি জারে করে কারওয়ান বাজারের গোসলখানা থেকে পানি আনেন। এ পানি দিয়ে তাকে খাওয়া ও গোসল সারতে হয়। বারবার হাত ধোয়ার বিলাসিতা তার জন্য নয়। পানিই যখন মহার্ঘ তাসলিমা, লিটনদের জন্য তখন মাস্ক, স্যানিটাইজারের চিন্তা তো আকাশকসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।
দাতব্য সংগঠন বিদ্যানন্দ জানিয়েছে, তারা ভাসমান মানুষের আবাসস্থলে জীবাণুনাশক ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ভাসমান জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন সংগঠন ত্রাণ দিলেও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় আর কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছিল ভাসমান মানুষের সুরক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে তা সমন্বয় করা হবে।
এর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজি মোহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, দরিদ্র মানুষের জন্য ত্রাণ সরবরাহ ছাড়া আর কোনো কার্যক্রমের কথা তার জানা নেই। ভাসমান মানুষের করোনা সুরক্ষাসামগ্রী সম্পর্কে করপোরেশন থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি।
এই প্রশ্ন আরও অনেকের। গত বছরের জুনে জাতীয় সংসদে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা সাড়ে ছয় লাখ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর 'বস্তিশুমারি ও ভাসমান লোক গণনা জরিপ-২০১৪'তে এ হিসাব উঠে আসে। তার পর ছয় বছরে নতুন জরিপ হয়নি। তবে বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে। জরিপে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আলাদা করা হয়নি। তবে ভাসমান মানুষের মধ্যে কাজ করা বিভিন্ন এনজিওর হিসাবে রাজধানীতে তাসলিমার মতো অন্তত ৫০ হাজার মানুষ রয়েছেন যাদের ঘর নেই।
করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে গোটা দেশ ঘরবন্দি হয়ে থাকলেও ভাসমান মানুষের যাওয়ার জায়গা নেই। তারা থাকেন পথে, ফুটপাতে, স্টেশনে, পার্কে। এসব স্থানেই তাদের খাওয়া, ঘুম ও জীবনের অন্যান্য কাজ চলছে। প্রতিবেশী ভারতের কলকাতায় ফুটপাতবাসীরাও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে- এমন খবর পাওয়া গেছে। ভাসমান মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার সুযোগ না থাকায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশেও একই বিপদ ঘটতে পারে।
গত রোববার বিকেলে তাসলিমার সঙ্গে কথা হয় পান্থপথে তার 'নিবাসের' সামনে। তখন ঘড়িতে সময় বিকেল প্রায় সাড়ে ৪টা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়াল ঘেঁষে পলিথিন দিয়ে ঝুপড়ি তুলে এক সন্তান ও মাকে নিয়ে সেখানে থাকেন তিনি। পুরো পরিবারের তখন দুপুরের খাবার আয়োজন চলছিল। ফুটপাতে ইটের ওপর হাঁড়ি বসিয়ে কুড়িয়ে আনা পল্গাস্টিক, শুকনো ডাল দিয়ে রান্না করছিলেন তাসলিমা।
সেখানে তাসলিমা ছাড়াও আরও চারটি পরিবার থাকে। সব মিলিয়ে ১৪ জনের বাস ওই ফুটপাতে। আগে তারা থাকতেন পান্থকুঞ্জ পার্কের ফুটপাতে। সেখানে উন্নয়ন কাজ শুরুর পর চলে এসেছেন পান্থপথে। তাসলিমা বললেন, করোনার ভয় পেলে তাদের চলবে না। পেটের ভাত জোগাড় করতে পথে থাকতেই হবে। আর ঘরই তো নেই, থাকবেনই বা কোথায়!
সোনারগাঁও হোটেলের প্রধান ফটকের বিপরীতে রোড ডিভাইডারে পলিথিন দিয়ে ছাউনি তুলে থাকেন মো. লিটন। একসময় নেশা করতেন। তিন কুলে কেউ নেই। এখন প্লাস্টিক কুড়ানো আরও চার কিশোরের সঙ্গে পলিথিনের ছাউনির নিচে থাকেন। নিজের কথা বলতে বলতে দুপুরের রান্না করছিলেন লিটন। রান্না বলতে ভাত ও গরুর মাংসের উচ্ছিষ্টাংশ। কুকুরের খাবার হিসেবে বিত্তবানরা এ উচ্ছিষ্টাংশ কিনে নেন কারওয়ান বাজার থেকে। গৃহহীন লিটনও তা খান! প্রথমে সেগুলো সিদ্ধ করেন। তারপর পেঁয়াজ দিয়ে তেলে ভাজেন। রান্না করেন মসলা ছাড়াই। খাবার দেখিয়ে লিটন বললেন, এটোকাটা খেয়ে বেঁচে আছেন। করোনা আর কী মারবে। পুলিশ তাড়া করে, ঘরে থাকতে বলে। কিন্তু ঘরই তো নাই, যাব কই?
ঢাকার পথে পথে এমন অসংখ্য লিটন ও তাসলিমা ঘুরে বেড়ান। এদের এবং গাদাগাদি করে বস্তির এক কামরার বাড়িতে পুরো পরিবার নিয়ে বসবাসকারী বস্তিবাসীরও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উপায় নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানীসহ সংশ্নিষ্ট সবাই বারবার সতর্ক করছেন, লাখ লাখ বস্তিবাসী এবং শহরের 'ভাসমান' মানুষের মাধ্যমে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ শহরজুড়েই এসব অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকারী মানুষের বিচরণ।
করোনার বিস্তার ঠেকাতে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দরিদ্র এসব মানুষের স্বাস্থ্যবিধি এবং খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তারা ঘরে থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান বলেছেন, সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিই ভাসমান, ছিন্নমূল মানুষের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। করোনা থেকে বাঁচতে যেসব সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন, সেগুলো আরও সম্ভব নয়। তবে ভাসমান মানুষের মধ্যে করোনার বিস্তার রুখতে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। ছিন্নমূল মানুষকে আলাদা করে আইসোলেশনে রাখতে হবে। নিরাপদ ঘরে রাখতে হবে। তাদের খাদ্য সহায়তা দিতে হবে।
করোনা থেকে বাঁচতে বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। ফুটপাতে থাকা মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি একটি বড় সমস্যা। লিটন জানালেন, পাঁচ লিটারের দুটি জারে করে কারওয়ান বাজারের গোসলখানা থেকে পানি আনেন। এ পানি দিয়ে তাকে খাওয়া ও গোসল সারতে হয়। বারবার হাত ধোয়ার বিলাসিতা তার জন্য নয়। পানিই যখন মহার্ঘ তাসলিমা, লিটনদের জন্য তখন মাস্ক, স্যানিটাইজারের চিন্তা তো আকাশকসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।
দাতব্য সংগঠন বিদ্যানন্দ জানিয়েছে, তারা ভাসমান মানুষের আবাসস্থলে জীবাণুনাশক ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ভাসমান জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন সংগঠন ত্রাণ দিলেও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় আর কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছিল ভাসমান মানুষের সুরক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে তা সমন্বয় করা হবে।
এর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজি মোহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, দরিদ্র মানুষের জন্য ত্রাণ সরবরাহ ছাড়া আর কোনো কার্যক্রমের কথা তার জানা নেই। ভাসমান মানুষের করোনা সুরক্ষাসামগ্রী সম্পর্কে করপোরেশন থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি।
