মালিক-চালক-মাস্টারদের অবহেলাই দায়ী
×
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০ | ১২:০০
রাজধানীর সদরঘাটের কাছে শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ 'এমভি মর্নিং বার্ড' ডুবে যাওয়ার ঘটনার পেছনে সংশ্নিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলাকেই মূলত দায়ী করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার শিকার লঞ্চটিকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী 'এমভি ময়ূর-২' নামের লঞ্চের মালিক-চালক-মাস্টারদের চরম অবহেলা ও গাফিলতির কারণেই এতবড় একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে বলেই মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। এই কারণে বিষয়টিকে নিছক দুর্ঘটনা নয়, 'হত্যাকা ' হিসেবে বিবেচনায় নিয়েই সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
এ অবস্থায় ওই দুর্ঘটনার তদন্তে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন নৌমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা আরও বলছেন, লঞ্চ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের পাশাপাশি লঞ্চ পরিচালনাকারীদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে ওই নৌদুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় 'এমভি ময়ূর-২' লঞ্চের মালিক ও মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে 'অবহেলাজনিত মৃত্যু' ঘটানোর অভিযোগ এনে দায়েরকৃত মামলায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। যদিও দুর্ঘটনার দিন সোমবারই ঘাতক লঞ্চটিকে আটক করা হয়েছে।
গত সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় চাঁদপুর থেকে আসা 'এমভি ময়ূর-২' লঞ্চের ধাক্কায় শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে যায় মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে ঢাকার সদরঘাটের দিকে আসা যাত্রীবাহী লঞ্চ 'এমভি মর্নিং বার্ড'। সোমবার ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধারের একদিন পর গতকাল মঙ্গলবার আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ফলে এই দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ জনে।
এই দুর্ঘটনার পর সদরঘাটের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে পেছন দিকে চলতে থাকা ময়ূর-২-এর ধাক্কায় তুলনামূলকভাবে আকারে অনেক ছোট মর্নিং বার্ডকে মুহূর্তের মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যেতে দেখা যায়। সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর ওই ভিডিও দেখার কথা জানিয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজটি দেখে মনে হয়েছে এটি দুর্ঘটনা নয়, একটি হত্যাকা। পরিকল্পিতভাবে ধাক্কা দিয়েই এই দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এক্ষেত্রে লঞ্চ মালিক ও চালকদের গাফিলতি আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান নৌপ্রতিমন্ত্রী।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে বলেছেন, তদন্তে দোষী হিসেবে যারাই চিহ্নিত হবেন, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে। ভুক্তভোগীদেরও ন্যায়বিচার দেওয়া হবে।
জানা গেছে, ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক ঢাকার বাসিন্দা মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদের কোম্পানির নাম 'সি-হর্স করপোরেশন'। তিনি ময়ূর-২ লঞ্চের রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন এই কোম্পানির নামেই। লঞ্চটির নামে খোলা ফেসবুক পেজে পাওয়া দুটি নম্বরে (০১৭৫৯৯৪৪১৪৪ ও ০১৭৩২৫৫০৫৪৮) যোগাযোগ করেও এই লঞ্চের মালিক, সুকানি, মাস্টার ও সুপারভাইজার কাউকেই পাওয়া যায়নি। নম্বর দুটি বন্ধও পাওয়া গেছে।
তবে ময়ূর-২ লঞ্চের চালক শিপন হাওলাদার সোমবারই সমকালকে জানিয়েছেন, ২১ জুন থেকেই তিনি ওই লঞ্চের চাকরিতে নেই। বেতন পরিশোধ করে তাকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার সময় তিনি লঞ্চে ছিলেনও না। তার অবর্তমানে লঞ্চের মাস্টার লঞ্চটি চালাচ্ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে ময়ূর-২-এর আঘাতে ডুবে যাওয়া 'মর্নিং বার্ড' লঞ্চের মালিক দু'জন। তারা হলেন মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন ও আব্দুল গফুর। 'তালতলা ওয়াটার ওয়েজ' কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রেশন রয়েছে মর্নিং বার্ড লঞ্চের। বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এই লঞ্চের দুই মালিকের কাউকেই পাওয়া যায়নি।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রগুলো বলছে, ময়ূর-২ এবং মর্নিং বার্ড উভয় লঞ্চেরই রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট রয়েছে। তবে ঘটনার সময় ময়ূর-২ যারা চালাচ্ছিলেন, সেই মাস্টার, সারেং, সুকানি ও সুপারভাইজারদের লঞ্চ পরিচালনায় দক্ষতা ছিল কিনা অথবা এক্ষেত্রে তাদের কোনো অবহেলা ও গাফিলতি ছিল কিনা, এসব বিষয়েও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এরই মধ্যে দেড়তলা বিশিষ্ট মর্নিং বার্ড লঞ্চটি অনেকটাই লক্করঝক্কর হওয়ার পরও এটির ফিটনেস ও চলাচলের অনুমতি প্রদানকারী বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। নৌপরিবহন সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও এমন দাবি তুলেছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এই দুর্ঘটনা স্পষ্টতই দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতি। প্রাকৃতিক অনেক দুর্ঘটনা আমরা হয়তো এড়াতে পারি না। কিন্তু ছোট লঞ্চকে বড় লঞ্চ ধাক্কা মেরে ডুবিয়ে দিল- এটা স্বেচ্ছাচারিতা। তার মানে যারা লঞ্চ চালাচ্ছেন তারা দায়িত্বশীল ও যোগ্য নন। তিনি বলেন, একজন চালকের কোনোভাবেই চাওয়ার কথা নয়, তার যাত্রীরা ডুবে যান। কিন্তু দায়িত্বে অবহেলার কথা যখন বলা হচ্ছে, তখন এর ভেতরের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা দরকার।
এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য সারেংদের দায়িতত্বজ্ঞানহীনতা ও মনিটরিং না থাকাকে দায়ী করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, এ বছরই সদরঘাটে এ ধরনের ছোটখাটো ১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। ফলে সোমবারের বড় দুর্ঘটনা আমরা এড়াতে পারলাম না।
বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ও ঢাকা নদীবন্দরের (সদরঘাট) প্রধান কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন সমকালকে বলেছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ও দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ দুটির সঠিক কাগজপত্র ছিল কিনা, সেটি তদন্ত শেষে বোঝা যাবে।
ঢাকা নদীবন্দরের (সদরঘাট) পরিদর্শক আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, করোনা আক্রান্ত হয়ে তিনি বর্তমানে আইসোলেশনে বাসায় রয়েছেন। তবে দুর্ঘটনার জন্য লঞ্চের মালিকের রেসপনসিবিলিটি রয়েছে। এর জন্য চালক, মাস্টার ও সুপারভাজারও সমানভাবে দায়ী।
তদন্ত শুরু :সোমবারের লঞ্চ দুর্ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রথম দিনে সদরঘাটের বিআইডব্লিউটিএ টার্মিনালের ভিআইপি কক্ষে লঞ্চডুবির প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। কমিটির আহ্বায়ক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) রফিকুল ইসলাম খান এবং সদস্য সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌনিরাপত্তা) রফিকুল ইসলামসহ সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
আজ বুধবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দিনের তদন্ত কার্যক্রম চলবে। কমিটির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম খান সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে দুর্ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী স্থাপনা/নৌযানে প্রত্যক্ষদর্শী, বেঁচে যাওয়া ও আহত যাত্রী, নিহত যাত্রীদের সঙ্গে ভ্রমণরত আত্মীয়-স্বজন এবং দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
সোমবার দুর্ঘটনার পরপর গঠিত এই তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থাকে শনাক্তকরণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন নৌমন্ত্রণালয়ে প্রদান করতে বলা হয়েছে।
এ অবস্থায় ওই দুর্ঘটনার তদন্তে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন নৌমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা আরও বলছেন, লঞ্চ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের পাশাপাশি লঞ্চ পরিচালনাকারীদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে ওই নৌদুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় 'এমভি ময়ূর-২' লঞ্চের মালিক ও মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে 'অবহেলাজনিত মৃত্যু' ঘটানোর অভিযোগ এনে দায়েরকৃত মামলায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। যদিও দুর্ঘটনার দিন সোমবারই ঘাতক লঞ্চটিকে আটক করা হয়েছে।
গত সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় চাঁদপুর থেকে আসা 'এমভি ময়ূর-২' লঞ্চের ধাক্কায় শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে যায় মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে ঢাকার সদরঘাটের দিকে আসা যাত্রীবাহী লঞ্চ 'এমভি মর্নিং বার্ড'। সোমবার ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধারের একদিন পর গতকাল মঙ্গলবার আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ফলে এই দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ জনে।
এই দুর্ঘটনার পর সদরঘাটের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে পেছন দিকে চলতে থাকা ময়ূর-২-এর ধাক্কায় তুলনামূলকভাবে আকারে অনেক ছোট মর্নিং বার্ডকে মুহূর্তের মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যেতে দেখা যায়। সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর ওই ভিডিও দেখার কথা জানিয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজটি দেখে মনে হয়েছে এটি দুর্ঘটনা নয়, একটি হত্যাকা। পরিকল্পিতভাবে ধাক্কা দিয়েই এই দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এক্ষেত্রে লঞ্চ মালিক ও চালকদের গাফিলতি আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান নৌপ্রতিমন্ত্রী।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে বলেছেন, তদন্তে দোষী হিসেবে যারাই চিহ্নিত হবেন, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে। ভুক্তভোগীদেরও ন্যায়বিচার দেওয়া হবে।
জানা গেছে, ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক ঢাকার বাসিন্দা মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদের কোম্পানির নাম 'সি-হর্স করপোরেশন'। তিনি ময়ূর-২ লঞ্চের রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন এই কোম্পানির নামেই। লঞ্চটির নামে খোলা ফেসবুক পেজে পাওয়া দুটি নম্বরে (০১৭৫৯৯৪৪১৪৪ ও ০১৭৩২৫৫০৫৪৮) যোগাযোগ করেও এই লঞ্চের মালিক, সুকানি, মাস্টার ও সুপারভাইজার কাউকেই পাওয়া যায়নি। নম্বর দুটি বন্ধও পাওয়া গেছে।
তবে ময়ূর-২ লঞ্চের চালক শিপন হাওলাদার সোমবারই সমকালকে জানিয়েছেন, ২১ জুন থেকেই তিনি ওই লঞ্চের চাকরিতে নেই। বেতন পরিশোধ করে তাকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার সময় তিনি লঞ্চে ছিলেনও না। তার অবর্তমানে লঞ্চের মাস্টার লঞ্চটি চালাচ্ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে ময়ূর-২-এর আঘাতে ডুবে যাওয়া 'মর্নিং বার্ড' লঞ্চের মালিক দু'জন। তারা হলেন মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন ও আব্দুল গফুর। 'তালতলা ওয়াটার ওয়েজ' কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রেশন রয়েছে মর্নিং বার্ড লঞ্চের। বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এই লঞ্চের দুই মালিকের কাউকেই পাওয়া যায়নি।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রগুলো বলছে, ময়ূর-২ এবং মর্নিং বার্ড উভয় লঞ্চেরই রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট রয়েছে। তবে ঘটনার সময় ময়ূর-২ যারা চালাচ্ছিলেন, সেই মাস্টার, সারেং, সুকানি ও সুপারভাইজারদের লঞ্চ পরিচালনায় দক্ষতা ছিল কিনা অথবা এক্ষেত্রে তাদের কোনো অবহেলা ও গাফিলতি ছিল কিনা, এসব বিষয়েও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এরই মধ্যে দেড়তলা বিশিষ্ট মর্নিং বার্ড লঞ্চটি অনেকটাই লক্করঝক্কর হওয়ার পরও এটির ফিটনেস ও চলাচলের অনুমতি প্রদানকারী বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। নৌপরিবহন সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও এমন দাবি তুলেছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এই দুর্ঘটনা স্পষ্টতই দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতি। প্রাকৃতিক অনেক দুর্ঘটনা আমরা হয়তো এড়াতে পারি না। কিন্তু ছোট লঞ্চকে বড় লঞ্চ ধাক্কা মেরে ডুবিয়ে দিল- এটা স্বেচ্ছাচারিতা। তার মানে যারা লঞ্চ চালাচ্ছেন তারা দায়িত্বশীল ও যোগ্য নন। তিনি বলেন, একজন চালকের কোনোভাবেই চাওয়ার কথা নয়, তার যাত্রীরা ডুবে যান। কিন্তু দায়িত্বে অবহেলার কথা যখন বলা হচ্ছে, তখন এর ভেতরের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা দরকার।
এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য সারেংদের দায়িতত্বজ্ঞানহীনতা ও মনিটরিং না থাকাকে দায়ী করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, এ বছরই সদরঘাটে এ ধরনের ছোটখাটো ১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। ফলে সোমবারের বড় দুর্ঘটনা আমরা এড়াতে পারলাম না।
বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ও ঢাকা নদীবন্দরের (সদরঘাট) প্রধান কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন সমকালকে বলেছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ও দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ দুটির সঠিক কাগজপত্র ছিল কিনা, সেটি তদন্ত শেষে বোঝা যাবে।
ঢাকা নদীবন্দরের (সদরঘাট) পরিদর্শক আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, করোনা আক্রান্ত হয়ে তিনি বর্তমানে আইসোলেশনে বাসায় রয়েছেন। তবে দুর্ঘটনার জন্য লঞ্চের মালিকের রেসপনসিবিলিটি রয়েছে। এর জন্য চালক, মাস্টার ও সুপারভাজারও সমানভাবে দায়ী।
তদন্ত শুরু :সোমবারের লঞ্চ দুর্ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রথম দিনে সদরঘাটের বিআইডব্লিউটিএ টার্মিনালের ভিআইপি কক্ষে লঞ্চডুবির প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। কমিটির আহ্বায়ক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) রফিকুল ইসলাম খান এবং সদস্য সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌনিরাপত্তা) রফিকুল ইসলামসহ সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
আজ বুধবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দিনের তদন্ত কার্যক্রম চলবে। কমিটির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম খান সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে দুর্ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী স্থাপনা/নৌযানে প্রত্যক্ষদর্শী, বেঁচে যাওয়া ও আহত যাত্রী, নিহত যাত্রীদের সঙ্গে ভ্রমণরত আত্মীয়-স্বজন এবং দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
সোমবার দুর্ঘটনার পরপর গঠিত এই তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থাকে শনাক্তকরণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন নৌমন্ত্রণালয়ে প্রদান করতে বলা হয়েছে।
- বিষয় :
- বুড়িগঙ্গা ট্র্যাজেডি