ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

বুড়িগঙ্গা ট্র্যাজেডি

অভিযান সমাপ্ত, মিলল আরও দুই লাশ

অভিযান সমাপ্ত, মিলল আরও দুই লাশ
×

মঙ্গলবার বুড়িগঙ্গায় দ্বিতীয় দিনের উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা - সমকাল

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০ | ১২:০০

বুড়িগঙ্গা এখন মৃতপ্রায়। তীব্র স্রোত নেই, আছড়ে পড়া ঢেউও নেই। লঞ্চডুবিতে সেই নদীতেই প্রাণ কেড়ে নিল ৩৪ জনের। টানা ৩০ ঘণ্টা অভিযান চালিয়েও ডুবে যাওয়া ছোট লঞ্চটি পুরোপুরি টেনেও তুলতে পারল না উদ্ধারকারীরা। ভেতরে আর কোনো মরদেহ রয়েছে কিনা, সে বিষয়েও পুরোপুরি নিশ্চিতও হওয়া যায়নি। এর মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার উদ্ধার কার্যক্রম সমাপ্তি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
লঞ্চডুবিতে হতাহতের ঘটনায় দায়ের মামলায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে গতকাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ গঠিত তদন্ত কমিটি কার্যক্রম শুরু করেছে। গতকাল বিকেল থেকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নেওয়া শুরু হয়েছে।
গত সোমবার সকালে মর্নিং বার্ড নামের ছোট্ট লঞ্চটি অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। সকাল ৯টার কিছু সময় পর সদরঘাটের অদূরেই ময়ূর-২ নামের বিশাল একটি লঞ্চ পেছন দিয়ে সেটিকে ধাক্কা দেয়। এতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই লঞ্চটি তলিয়ে যায়। কয়েকজন যাত্রী লঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও নারী ও শিশুসহ বেশিরভাগ যাত্রীই আটকা পড়ে মারা যান।
দুর্ঘটনার পর থেকেই ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরিরা ডুবে যাওয়া লঞ্চে তল্লাশি অভিযান শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা হয় ৩২ জনের লাশ। অভিযানের ১৩ ঘণ্টার মাথায় সোমবার রাতে লঞ্চটি টেনে তোলার সময় সুমন বেপারী নামে এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। গতকাল দু'জনের লাশ ভেসে ওঠে। মৃতদের ৩২ জনই মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা।
গতকাল বিকেল ৩টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও দুপুর থেকেই উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থল ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। পরে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভার পর উদ্ধার কার্যক্রমের সমাপ্তি টানা হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন সমকালকে বলেন, ডুবন্ত লঞ্চটিতে একাধিকবার তল্লাশি চালিয়েছেন ডুবুরিরা। তারা মনে করছেন, ভেতরে আর কোনো মরদেহ নেই। তাই সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, লঞ্চডুবির ঘটনায় কেউ নিখোঁজ রয়েছেন বলে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এসব সত্ত্বেও পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের একটি ডুবুরি দল অবস্থান করছে। লঞ্চটি টেনে তোলার কার্যক্রমও স্থগিত ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ।
সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ হাসনাত সমকালকে বলেন, দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেও লঞ্চটি পুরোপুরি টেনে তোলা যায়নি। এজন্য আপাতত সেটি উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
সরানো হলো লঞ্চটি :ডুবে যাওয়া মর্নিং বার্ড লঞ্চটিকে টেনে তুলতে সোমবার দুপুরেই ঘটনাস্থলে আনার চেষ্টা হয় উদ্ধারকারী 'প্রত্যয়' জাহাজকে। কিন্তু পোস্তগোলা ব্রিজে সেটি আটকে যায়। মাঝে প্রত্যয়ের ভারী ক্রেনের ধাক্কায় বড় ধরনের ফাটলে ব্রিজে যান চলাচলই বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে আসে অপেক্ষাকৃত ছোট উদ্ধার জাহাজ 'দুরন্ত'। সেটি দিয়েই সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে ডুবন্ত লঞ্চটিকে টেনে তোলার চেষ্টা হয়। শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব না হওয়ায় গতকাল দুপুর পর্যন্ত উপড়ে থাকা লঞ্চটি ওই অবস্থাতেই টেনে মাঝনদী থেকে সরানো হয়। লঞ্চটিকে ওই অবস্থাতেই বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীরে রাখা হয়েছে।
উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া বিআইডব্লিউটিএ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার সকাল ১০টায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয় এবং এরপর টানা চলতে থাকে। মাঝে ঘণ্টাখানেক বিরতি দিয়ে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় তা আবার শুরু হয়। নদীর ৬০ থেকে ৭০ ফুট গভীরে উল্টে থাকা লঞ্চটিকে টেনে তুলতে দুরন্ত জাহাজসহ কয়েকটি ট্যাগ বোটের মাধ্যমে ১১টি এয়ার লিফটিং ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এর একেকটি ব্যাগ আট টন ওজন তুলতে পারে।
বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ও ঢাকা নদীবন্দরের প্রধান এ কে এম আরিফ হাসনাত সমকালকে বলেন, উদ্ধারকারী জাহাজ আসতে না পারায় ডুবে যাওয়া লঞ্চটি পুরোপুরি টেনে তোলা যায়নি। তবে নতুন দুর্ঘটনা এড়াতে সেটিকে উপুড় অবস্থায় টেনে সদরঘাটের দক্ষিণ তীরে কুমিল্লা ডকইয়ার্ডের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আপাতত লঞ্চটিকে চিহ্নিত করতে ঘটনাস্থলে বয়া স্থাপন করা হয়েছে। এতে ছোট ছোট নৌযানগুলো ওই পথ এড়িয়ে চলতে পারবে। শুস্ক মৌসুমে পানি কমলে লঞ্চটি টেনে তোলা হবে।
অবশেষে মিলল রহমানের লাশ :মুন্সীগঞ্জের আবদুল্লাহপুরের বাসিন্দা আবদুর রহমান স্ত্রী হাসিনা রহমান ও আট বছরের ছেলে সিফাতকে নিয়ে মর্নিং বার্ড লঞ্চে ঢাকায় ফিরছিলেন। লঞ্চটি ডুবে গেলে তিনজনই নিখোঁজ হন। শেষ পর্যন্ত একই সঙ্গে মা-ছেলের লাশ মিললেও আবদুর রহমানের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। উদ্ধার অভিযান শেষে গতকাল বিকেল ৫টার দিকে বুড়িগঙ্গায় ঘটনাস্থলের অদূরে ভেসে ওঠে তার লাশ। আবদুর রহমান একসময়ে ঢাকার আদালতে মুহুরি ছিলেন। পরে অবশ্য আইনজীবী হন।
সোমবার হাসিনা ও সিফাতের লাশ গ্রামের বাড়ি দাফন করেই আবদুর রহমানের খোঁজে বুড়িগঙ্গার তীরে চলে আসেন স্বজনরা। গতকাল দুপুরে লঞ্চডুবির স্থলে আবদুর রহমানের ছেলে হাসিব রহমান কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, মা-ভাইয়ের লাশ দাফন করে এসেছি। এখন বাবাকে খুঁজছি। তার লাশটা পেলেও জীবনভর কবরটা দেখে সান্ত্বনা পাবো।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা জানান, ভাসমান ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের পর হাসিব রহমান তার বাবা আবদুর রহমানের লাশ বলে শনাক্ত করেন। এর আগে সকালে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি টেনে সরানোর সময় ভেসে ওঠে এক তরুণের লাশ। পরে স্বজনরা তাকে মো. আশিক (১৭) বলে শনাক্ত করেন। ওই তরুণ ডুবে যাওয়া লঞ্চটির ইঞ্জিন রুমে দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতেন বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন।
গ্রেপ্তার হয়নি কোনো আসামি :ময়ূর-২ লঞ্চের চরম গাফিলতি আর অবহেলার কারণে এত প্রাণহানি হলেও ওই ঘটনায় দায়ের মামলার কোনো আসামি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়নি। নৌপুলিশ সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামসুল বাদী হয়ে সাতজনের বিরুদ্ধে সোমবার রাতে একটি মামলা করেন।
মামলায় ময়ূর লঞ্চের মালিক মোফাজ্জল হামিদ ছোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার, জাকির হোসেন, ড্রাইভার শিপন হাওলাদার, মাস্টার শাকিল ও সুকানি নাসিরের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। মামলায় বেপরোয়া লঞ্চ চালিয়ে মানুষ হত্যা ও ধাক্কা দিয়ে লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য দ বিধির ২৮০, ৩০৪ (ক), ৪৩৭ ও ৩৪ ধারার অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু সব আসামিই এখন পর্যন্ত লাপাত্তা।
জানতে চাইলে সদরঘাট নৌপুলিশ থানার ওসি রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে নৌপুলিশের পক্ষ থেকে অভিযান চলছে। অন্যান্য সংস্থাও আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।
সাক্ষ্য দিলেন তিনজন :নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত সাত সদস্যের কমিটি গতকাল বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ওই সময়ে ঘটনার তিন প্রত্যক্ষদর্শী কমিটির কাছে সাক্ষ্য দেন। আজ বুধবার দুপুরে কমিটি আবারও সাক্ষ্য নেবে।
তদন্ত দলের প্রধান নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে জব্দ করা ভিডিও ফুটেজ বিশ্নেষণ করা হচ্ছে। নৌপুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চের চালকের সন্ধান করছেন তারা। দুর্ঘটনায় চালকও মারা গেছেন, নাকি আত্মগোপন করেছেন, তা জানার চেষ্টা চলছে।
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ : ময়ূর-২ লঞ্চের মালিকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ১৭ আগস্টের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন্নাহার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহার গ্রহণ করে গতকাল মঙ্গলবার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবির বাবুল এ তথ্য জানিয়েছেন।
এদিকে দেশের একমাত্র নৌ-আদালতে লঞ্চ দুর্ঘটনার ১৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নৌ-আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) পারভীন সুলতানা জানিয়েছেন, মামলার আসামিপক্ষ অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় মামলার কার্যক্রম পরিচালনা খুব কষ্টকর। এ ছাড়া সময়মতো সাক্ষীদেরও খুঁজে পাওয়া যায় না। মূলত এ দুই কারণেই মামলার বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে মাত্র পাঁচ বছর; কিন্তু আসামিরা কিছুদিন জেল খেটে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে আসে।


আরও পড়ুন

×