ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

পুড়ে যাওয়া হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ঘুরছেন পথে পথে

পুড়ে যাওয়া হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ঘুরছেন পথে পথে
×

.

লতিফুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৪২

রাজধানীর গুলিস্তানে হকার্স মার্কেটে ২০০৪ সালের নভেম্বরে অগ্নিকাণ্ডে সম্বল হারিয়েছেন এক হাজার ৬৪৬ ব্যবসায়ী। সেই সময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন টিনের তৈরি দ্বিতল ওই মার্কেটের জায়গায় ১২ তলা ভবন নির্মাণ করে পাঁচতলা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার মার্কেট নির্মাণে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা সালামি নিয়েছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু দুই দশকেও শেষ হয়নি মার্কেটের নির্মাণকাজ। সেখানে দোকান বসিয়ে বছরের পর বছর চলছে চাঁদাবাজি। এদিকে পুরে যাওয়া মার্কেটের অনেক ব্যবসায়ী ঘুরছেন পথে পথে।
ব্যবসায়ীরা জানান, আগে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে চলত চাঁদাবাজি। ৫ আগস্টের পর চলছে বিএনপির নামে। মার্কেটের পার্কিংয়ের স্থানে প্রায় ৪০০ ও সামনে ছয় শতাধিক দোকান বসানো হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মার্কেটের কমিটিতে পরিবর্তন এসেছে। এই কমিটি আর স্থানীয় বিএনপির নাম ভাঙিয়ে পার্কিং, ফুটপাতে চলছে চাঁদাবাজি। কেউ চাঁদা না দিলে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। এমনকি চাহিদামাফিক চাঁদা না দেওয়ায় মরধরের ঘটনাও ঘটেছে। 

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে চাঁদাবাজির কবল থেকে মুক্তি ও চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তারের দাবিতে অভিযোগ করেছেন মজিবুর রহমান নামে এক ব্যবসায়ী। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মাসে কোটি টাকার চাঁদা বাণিজ্যের আরেকটি অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। 
চাঁদাবাজ চক্রে বিএনপির কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে গত ১ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সব আঞ্চলিক ইউনিট কমিটি স্থগিত করে। তার পরও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। 

গত ১১ আগস্ট দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের চারতলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তবে পলেস্তারা, টাইলস বসানো এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপনের কাজ বাকি। ভবনটির চারপাশের ফুটপাতে চৌকি বসিয়ে ব্যবসা চলছে। ভবনের বেজমেন্টও দোকানে ঠাসা। দোকানিরা বলছেন, বেজমেন্টে দোকান তৈরি করে ভাড়া দিয়েছেন দোকান মালিক সমিতির নেতারা। এ ছাড়া ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। 
এই প্রতিবেদক সমিতির অফিসে অবস্থানকালে এক ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের কাছে অভিযোগ করেন, দুই মাস আগে মাসিক ৩০ হাজার টাকায় দুই বছরের চুক্তিতে তিনি দোকান ভাড়া নিয়েছেন। এখন হঠাৎ করে তাঁর কাছ থেকে মাসিক ৪০ হাজার টাকা ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। বিষয়টি পরে সমাধান করা হবে জানিয়ে তখন ওই ব্যবসায়ীকে বিদায় করেন নেতারা।
সূত্র জানায়, মার্কেট নির্মাণের জন্য প্রথম যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, তারা কাজ শেষ করেনি। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০১২ সালে সেই কার্যাদেশ বাতিল করে অর্পি ইঞ্জিনিয়ারিং নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল অসমাপ্ত কাজ শেষ করে ভবনের চারতলা পর্যন্ত সম্পন্ন করার বিষয়ে। পঞ্চম ও ষষ্ঠতলা পর্যন্ত কাজ করবে অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু চারতলা পর্যন্ত ছাদ হলেও দীর্ঘদিনে বাকি কাজ শেষ না করায় অন্য ঠিকাদারও কাজ শুরু করতে পারেননি। এখন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অর্পি ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের অবশিষ্ট কাজের পরিমাপ করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে করপোরেশন। 

মাসে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ
গুলিস্তান এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন টিটুর বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের ব্যবসায়ীরা। বলা হয়েছে, গুলিস্তানের ফুটপাতে অবৈধ দোকান ভাড়া ও জামানতের নামে টিটু প্রতি মাসে চার-পাঁচ কোটি টাকা আদায় করেন। গত বছর চাঁদাবাজির অভিযোগে কমিটি স্থগিত করা হলেও তাঁর চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। তিনি এখন আরও বেপরোয়া। রাসেল নামে এক ব্যবসায়ীকে দাবি করা জামানত ও চাঁদার টাকা না দেওয়ায় তাঁকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসিয়েছেন টিটু। ৫ আগস্টের পর শূন্য থেকে অল্প সময়ে কয়েক কোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এই সময়ে ঢাকা-মানিকগঞ্জ রুটে চলাচলকারী তিনটি বাসও কিনেছেন। এদিকে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, টিটুর চাঁদাবাজির সহযোগী আবু সুফিয়ানও অল্প সময়ে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। গুলিস্তান-উত্তরা রুটে তিনি দুটি বাস কিনেছেন। 
গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার মার্কেট কমিটির আহ্বায়ক নুরুল হক হাদী সমকালকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর ব্যবসায়ীরা আমাকে মার্কেট সমিতির আহ্বায়ক বানিয়েছেন। এই মার্কেটে আমি শুরু থেকেই দোকানের মালিক। ২০ বছর আগে মার্কেট পুড়ে গেলেও এখন পর্যন্ত করপোরেশন মার্কেট নির্মাণকাজ শেষ করে ক্ষতিগ্রস্তদের দোকান বুঝিয়ে দেয়নি। ব্যবসায়ীরা অনেকেই এখন বেকার হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখন বেজমেন্টে যাদের দোকান আছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত। করপোরেশন আমাদের দোকান বুঝিয়ে দিলে বেজমেন্ট ছেড়ে দিব।’
মনির হোসেন টিটু নিজেকে ওয়ার্ড বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পরিচয় দিয়ে সমকালকে বলেন, ‘গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানে কেনা একটি দোকান থেকে শুধু ভাড়া আদায় করি। ব্যাংকে ঋণ করে চার-পাঁচ মাস আগে বাস কিনেছি। আমাকে ফাঁসানোর জন্য এসব অভিযোগ আনা হয়েছে।’
ডিএসসিসির মার্কেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া সমকালকে বলেন, ‘আগের ঠিকাদার নির্ধারিত সময় পার হলেও কাজ শেষ করেনি। দীর্ঘদিন তাঁর খোঁজ না পাওয়ায় ম্যাজিস্টেটের মাধ্যমে সম্পাদিত কাজ পরিমাপ করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। মার্কেটে অবৈধ দোকান উচ্ছেদের জন্য সম্পত্তি বিভাগের কাছে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। তারা পার্কিংয়ের অনেক স্থাপনা ভেঙে ফেলেছে।’

আরও পড়ুন

×