চৌধুরীপাড়া ঝিল
সংরক্ষিত জলাধার উদ্ধারের পর ভরাট করে থানা হচ্ছে
পরিবেশ ছাড়পত্র ও রাজউকের অনুমোদন নেই
রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়া এলাকায় সংরক্ষিত জলাধার ভরাট করে রামপুরা থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ঝিলের প্রায় ৫০ শতাংশ জায়গা পুলিশকে বরাদ্দ দিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। সম্প্রতি তোলা -সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:২১ | আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৯:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়া এলাকার সংরক্ষিত জলাধার ভরাট করে রামপুরা থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। জলাধারটি রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী সংরক্ষিত জলাধার হিসেবে চিহ্নিত। তবে প্রকল্পটির জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র বা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তর চৌধুরীপাড়া ঝিলের প্রায় ৫০ শতাংশ জায়গা রামপুরা থানার ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাধার ভরাটের ফলে ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। পরিবেশবিদরা মনে করেন, নগর এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য সংরক্ষিত জলাধার অপরিহার্য। এ ধরনের জলাধার ভরাট শুধু আইনবিরোধী নয়, এটি নগরবাসীর জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সরেজমিন দেখা গেছে, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া মাটির মসজিদ-সংলগ্ন ও রামপুরার বউবাজারের মধ্যবর্তী স্থানে ৩৯ একর জায়গা নিয়ে গঠিত বিশাল ঝিল। এর উত্তরে রামপুরা বউবাজার, দক্ষিণে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, পূর্ব দিকে খিলগাঁও রিয়াজবাগ ও পশ্চিমে রামপুরা হাজীপাড়া।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছুদিন আগেও ঝিলের চারপাশ এবং মধ্যখানে ছিল বাঁশ-কাঠ ও টিনের একতলা-দোতলা লম্বা ঘরবাড়ি।
প্রতিটি বাড়ি ঘিরে থাকত কচুরিপানা, বড় বড় ঘাস, কচু গাছসহ আগাছা-পরগাছা। বর্তমানে ঝিলের দক্ষিণ অংশ পুরো ফাঁকা। এখানে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর এখন পরিষ্কার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ঝিলের প্রবেশমুখে ঝোলানো ব্যানারে লেখা আছে ‘রামপুরা থানার জন্য নির্ধারিত জমি। জমির পরিমাণ ৩০ কাঠা।’
থানার জন্য ঝিলের জমি বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, ঢাকায় বেশ কয়েকটি থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণ হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে রামপুরা থানার জন্য চৌধুরীপাড়া ঝিলের ৫০ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ঝিল ভরাটের বিষয় জানতে চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৪ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এ ব্যাপারে মনিরুজ্জামানকে বারবার কল দিয়ে এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি।
গত শনিবার চৌধুরীপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, থানা নির্মাণের জন্য ঝিল পরিষ্কারের কার্যক্রম চলছে। গণপূর্ত থেকে কাজ পেয়েছে সিএসআই কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মীর সঙ্গে কথা হয় ঝিলপাড়ে। তারা বলেন, এখানে রামপুরা থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা হবে। পাশ দিয়ে রাস্তা যাবে। আমরা এখন নকশার অপেক্ষায় আছি। নকশা পেলে কাজ শুরু হয়ে যাবে।
সেইভ ফিউচার বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক এবং পরিবেশ ও জলবায়ু ন্যায়বিচার কর্মী নয়ন সরকার বলেন, চৌধুরীপাড়ার সংরক্ষিত জলাধার থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এই জলাধার আগেই নানা দিক থেকে দখল ও ভরাটের মাধ্যমে সংকুচিত করা হয়েছে। ড্যাপ অনুযায়ী এটি একটি সংরক্ষিত জলাধার, যা রাজধানীর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরাট এবং শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলাধার ভরাট মানে শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়, এটি নগরবাসীর জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির জন্যও হুমকি। ঢাকায় প্রতিবার বৃষ্টিতে যে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা যায়, তার মূল কারণ জলাধার ও খাল দখল। আমরা সরকারের কাছ থেকে দখলকৃত জলাধার পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ না দেখে বরং নতুন করে সরকারি দখলের উদাহরণ দেখছি, যা গভীরভাবে নিন্দনীয়।
তিনি মনে করেন, থানার স্থায়ী ভবন নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা এমন স্থানে হওয়া উচিত নয় যা পরিবেশ ও আইনের পরিপন্থি। এর আগেও কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠে থানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত জনগণের আন্দোলনের মুখে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। অথচ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংরক্ষিত জলাধার দখল করে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা টেকসই উন্নয়নের পরিপন্থি এবং সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ ও জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০– দুটিরই স্পষ্ট লঙ্ঘন।
রাজউকের একটি সূত্র জানিয়েছে, চৌধুরীপারার ঝিলটি ড্যাপে সংরক্ষিত জলাধার। এটি কোনোভাবেই ভরাট করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মালিবাগ, রামপুরাসহ আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে ঝিলটি ভূমিকা রাখছে। বরং ঝিলটি দখলমুক্ত করে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ঝিলটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের হলেও এটি ড্যাপে সংরক্ষিত জলাধার। এটা বরাদ্দ দেওয়ার আগে গণপূর্ত রাজউকের কোনো অনুমোদন নেয়নি। আমরা গণপূর্তের কাছে চিঠি লিখে জানতে চাইব ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত জলাধারকে তারা বরাদ্দ দিয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর কীভাবে ড্যাপে সংরক্ষিত জলাধার ভরাটের অনুমতি দেয়– এটাই এখন বড় প্রশ্ন। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কোন কর্মকর্তারা এই অনুমোদন দিয়েছেন, কার চাপে দিয়েছেন এবং কীভাবে তারা দেশের বিদ্যমান আইন ও পরিকল্পনা লঙ্ঘনের সাহস পান?
তিনি বলেন, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী সংরক্ষিত জলাশয় ভরাট করা একটি সুস্পষ্ট অপরাধ– এটি ক্রিমিনাল অফেন্স। যদি সত্যিই আইনের শাসন কার্যকর থাকত, তাহলে শুধু জলাধার ভরাটকারীরা নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারাও এর দায়ে শাস্তির মুখোমুখি হতেন।
- বিষয় :
- জলাধার ভরাট
- রাজউক
- ড্যাপ
