গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি
‘বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সংস্কার: সুপারিশ, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:৫৮
রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নোয়াব) সভাপতি এ. কে. আজাদ। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে, সংবাদপত্র স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তাই আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোকে তাদের ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সংস্কার: সুপারিশ, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ আলোচনা হয়। প্রথম আলো এর আয়োজন করে। এতে অংশ নেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সদস্যরা, নোয়াব, সম্পাদক পরিষদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মিডিয়া সেল, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার, এমআরডিআইসহ গবেষক ও শিক্ষাবিদেরা।
এ. কে. আজাদ বলেন, এ সরকারের আমলে গণমাধ্যম কমিশন গঠিত হলো। তাদের সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হলো না। এর বাস্তবায়ন এখনই শুরু করা দরকার। তিনি বলেন, আগামীতে যারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাবেন, সরকার ও বিরোধী দলে বসবেন, সকলকে অঙ্গীকার করতে হবে তারা এ স্বাধীনতা দেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোতে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এ সরকারের আমলেই গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে।
নোয়াব সভাপতি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা মেধাবী ছাত্ররা সাংবাদিকতায় আসতে চান না। তারা বিসিএস, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, ব্যাঙ্ক বা অন্যান্য স্থানে চাকরি করতে চান। কারণ এখানে বেতনভাতা কম। করোনাকালে দেখেছি, অনেক সাংবাদিক বন্ধু হাসপাতালের বিল মেটাতে পারেননি। এসবের জন্য মালিকরা এককভাবে দায়ী নন।’
গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরে এ. কে, আজাদ বলেন, সংবাদপত্রগুলো সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল। একটি পত্রিকা ছাপাতে খরচ হয় ২৫ টাকা। বিক্রি করা হয় ১২টাকায়। এই ১২ টাকার ৩৫ শতাংশ আবার হকারদের কমিশনে চলে যায়। এ মুহূর্তে সরকারের কাছে সংবাদপত্রগুলোর অন্তত ১০০ কোটি টাকার বকেয়া পাওনা রয়েছে।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো যখন রাজনৈতিক ভিত্তিতে বিভক্ত থাকে, তখন সত্যিকার স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘আমি স্বাধীনতার কথা বলি, অথচ আমার ইউনিয়ন রাজনৈতিক আনুগত্যে পরিচালিত হয়— পাঠক কেন আমাকে বিশ্বাস করবে?’ তিনি স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গঠনের সুপারিশকে বাস্তবসম্মত উল্লেখ করলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য করুণা চাইলে হবে না; এটি একটি আন্দোলন। মালিক-সাংবাদিকদের এক হয়ে এই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রকাশ্যভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তারা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। তিনি জানান, কমিশনের সুপারিশ জমা দেওয়ার পরও ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ নিয়ে সরকারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বরং প্রস্তাবিত সংশোধনের ফলে আইনটি তার উদ্দেশ্য হারাতে বসেছে।
গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য গীতি আরা নাসরীন, নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) সদস্য এ. কে. আজাদ, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম, সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) সভাপতি ও মাছরাঙা টিভির বার্তা সম্পাদক রেজওয়ানুল হক রাজা, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রধান মওদুদ হোসেন আলমগীর (পাভেল), এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম রেজওয়ান উল আলম, এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান প্রমুখ।
- বিষয় :
- গোলটেবিল
- নোয়াব
- এ. কে. আজাদ
