ঢাবি-জাবির আলোচিত দুই হত্যা
এক মামলায় দায়সারা চার্জশিট, অন্যটির আসামিরা প্রকাশ্যে
তোফাজ্জল ও শামীম মোল্লা হত্যা মামলা তদন্তে পিবিআই
তোফাজ্জল হোসেন, শামীম মোল্লা
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১৪ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যুবক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরের দুটি ঘটনায় সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এক বছর পরেও একটি মামলার তদন্তই শেষ হয়নি। জামিনে আসামিরা ক্যাম্পাসে ঘুরছেন। অন্য মামলায় দায়সারা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়ার পর নারাজি আবেদনে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। দুটি মামলায় তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
নিহতদের স্বজনরা বলছেন, এক বছরেও যদি তদন্ত শেষ করতে না পারে, তাহলে বিচার হবে কবে? দ্রুত বিচার শেষ করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে ছাত্রদের মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মারধরের এক পর্যায়ে ক্ষুধার্ত জানালে তাঁকে খাবার খাইয়ে আবারও পেটানো হয়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শাহবাগ থানায় মামলা এবং আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে।
একই দিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) গেলে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও শিক্ষার্থী শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে।
দায়সারা চার্জশিটে বাদ ৮ আসামি
তোফাজ্জল হত্যায় তদন্ত শেষে ২১ জনের বিরুদ্ধে গত বছর ডিসেম্বরে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান। গত ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিএমএম আদালতে পুলিশের এ অভিযোগপত্রের বিপরীতে নারাজি দেন বাদী বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ।
আবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার আসামিদের জবানবন্দিতে রকি, স্যাকলাইন, রোবটিক সোহাগ, পারভেজ, আশরাফ মুন্দি, আবু রায়হান, রাশেদ কামাল অনিক ও রিয়াদের নাম আসে। পুলিশ তদন্তে তাদের অপরাধের বিষয়ে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পায়নি উল্লেখ করেছে।
বাদী বলেছেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে তোফাজ্জলের লাশ নিয়ে যাওয়া কনস্টেবলকে সাক্ষী মানা হয়নি। ঘটনাস্থলের সিসিটিভির ফুটেজ, মোবাইলে ধারণ করা মারধরের ছবি ও ভিডিও পর্যন্ত যথাযথ বিশ্লেষণ হয়নি। তদন্ত সঠিকভাবে করলে গ্রেপ্তারদের জবানবন্দিতে আসা আটজনের নাম বাদ যেত না। বরং অনেকের নাম উঠে আসত। তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই চার্জশিট দিয়েছেন বলেও নারাজি আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলাটি পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পিবিআই দক্ষিণের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন ইউনিট তদন্ত করছে। এ ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘মামলার ডকেট আমরা এপ্রিলে হাতে পেয়েছি। তদন্ত চলছে।’
হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয়জনের নাম চার্জশিটে রয়েছে। বর্তমানে কারাগারে থাকা এসব আসামি হলেন–জালাল মিয়া, আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ, আল হোসাইন সাজ্জাদ, মোত্তাকিন সাকিন শাহ, সুমন মিয়া ও ওয়াজিবুল আলম।
এ ছাড়া চার্জশিটের বাকি ১৫ পলাতক আসামি হলেন ফিরোজ কবির, আবদুস সামাদ, সাকিব রায়হান, ইয়াছিন আলী গাইন, ইয়ামুজ্জামান ইয়াম, ফজলে রাব্বি, শাহরিয়ার কবির শোভন, মেহেদী হাসান ইমরান, রাতুল হাসান, সুলতান মিয়া, নাসির উদ্দিন, মোবাশ্বের বিল্লাহ, শিশির আহমেদ, মহসিন উদ্দিন সাফি ও আবদুল্লাহিল কাফি।
তোফাজ্জলের গ্রামের বাড়ি বরগুনায়। তাঁর বাবা-মা ও একমাত্র ভাই মারা গেছেন। মামাতো বোন আসমা আক্তার সমকালকে বলেন, ‘তোফাজ্জল হত্যায় জড়িতদের একজনও যেন চার্জশিটের বাইরে না থাকে। সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। তদন্ত দেরি হলে বিচার বিলম্বিত হবে।’
জাবিতে আসামিরা প্রকাশ্যে
শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মামলাটি প্রথমে থানা তদন্ত করে। পরে পিবিআই ঢাকা জেলায় পাঠানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আট শিক্ষার্থীকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করে। তাদের মধ্যে তিনজন গ্রেপ্তার হন; একজন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। বাকিরা পলাতক। বহিষ্কারাদেশ শেষে পাঁচজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে আহসান লাবিব জাকসুর সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক পদে বিজয়ী হয়েছেন। অন্য তিনজনের মধ্যে রাজু আহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক এবং রাজন ও রাজু সংগঠনের সদস্য। মুক্তি পেয়ে মাহমুদুল হাসান রায়হানও ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার কুদরত-ই খুদা সমকালকে বলেন, তদন্ত চলমান। হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহত শামীম মোল্লার ভাই শাহীন মোল্লা সমকালকে বলেন, ‘বিনা দোষে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আসামিদের অনেকে বাইরে ঘোরাফেরা করলেও পুলিশ গ্রেপ্তার করছে না। এক বছর পার হলেও তদন্ত শেষ হয়নি। কবে বিচার পাব, তা আল্লাহই ভালো জানেন।’
