ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আলোর ভাষা

অগ্নিদগ্ধ কার্যালয়ে শিল্পপ্রদর্শনী ঘিরে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা, প্রতিরোধের বার্তা

ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আলোর ভাষা
×

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পুড়িয়ে দেওয়া প্রথম আলো ভবনে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, প্রধান

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ | ১০:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কারওয়ান বাজারে অগ্নিদগ্ধ ভবনের ভাঙা দেয়াল, পোড়া কাঠামো আর ছাইচাপা স্মৃতির ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে পুনর্জাগরণের এক প্রতীকী ভাষা। ধ্বংসের মাঝখানে শিখা হয়ে জ্বলছে শিল্পপ্রদর্শনী ‘আলো’। এটা কেবল প্রদর্শনী নয়; সহিংসতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের দৃশ্যমান দলিল।

দর্শনার্থীর ভিড়, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং বিচার দাবির উচ্চারণ গতকাল শনিবার প্রর্দশনীতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ঘোষণা দেন, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার তদন্ত আগামী দুই মাসের মধ্যে শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছি। এরপর শুরু হবে বিচারিক প্রক্রিয়া। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এটা একটা জীবন্ত জাদুঘরের মতো মনে হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে কীভাবে জেগে ওঠা যায়, তারই এক প্রচেষ্টা। সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী শক্তি প্রগতিকে থামাতে চাইলেও ইতিহাস বলে, তারা কখনও সফল হয়নি।

তিনি জানান, ঘটনার পর সরকার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। এখন সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর আস্থা রেখে তিনি বলেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, এই হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা গেছে।

পোড়া দেয়াল, দগ্ধ আসবাব, ছাইচাপা কক্ষ– সবকিছু অপরিবর্তিত রেখে তৈরি করা হয়েছে প্রদর্শনী। দর্শনার্থীরা নীরবে ঘুরে দেখেছেন ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। কেউ ছবি তুলেছেন, কেউ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেছেন স্তব্ধ হয়ে।

প্রদর্শনীতে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর এমন হামলা সভ্য সমাজে লজ্জাজনক। এ ঘটনায় বিদেশে আমাদের কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। আমাদের মাথা হেঁট হয়েছে। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি– এ ধরনের ঘটনা আর ঘটতে দেওয়া হবে না।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যমে হামলাকে ‘সভ্যতার ওপর আক্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যে কোনো গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ আমরা সভ্যতার বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে দেখি। অতীতের ঘটনাও তদন্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ঘটনাকে সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন। সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, উৎকণ্ঠায় বারবার ফোন করেছি। নানা জায়গায় যোগাযোগ করেছি। কিন্তু অসহায়তার যে অনুভূতি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রদর্শনী দেখে তাঁর মন্তব্য, ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে এবং এটি মানুষের নিষ্ঠুরতার জীবন্ত উদাহরণ।

প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই লক্ষ্য।

গতকাল দিনজুড়ে প্রদর্শনীতে ছিল নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন ও তাঁর স্ত্রী ডিয়ান ডাও ঘণ্টাখানেক প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও দলবদ্ধভাবে প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।

সংগীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, অদিতি মহসীন, সায়ান ওয়াহিদ; আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়; নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী, নাট্যব্যক্তিত্ব ত্রপা মজুমদারসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।

দর্শনার্থী অনেকে মন্তব্য করেন, এটি কেবল শিল্প প্রদর্শনী নয়, বরং ইতিহাসের এক কঠিন মুহূর্তকে স্মরণ করার জায়গা। শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে সহিংসতার নির্মমতা এবং পুনর্গঠনের আশাবাদ।

গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে উগ্রবাদীদের হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে প্রথম আলো কার্যালয়। সেই ধ্বংসস্তূপকে শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান রূপ দিয়েছেন শিল্পপ্রকল্প ‘আলো’তে। ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া প্রদর্শনীর নির্ধারিত শেষ দিন ছিল গতকাল। তবে দর্শনার্থীর আগ্রহে সময় বাড়িয়ে ২ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত।

আরও পড়ুন

×