ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সমকাল সংলাপে বিশিষ্টজন

পরীক্ষার ফলাফল জীবন-মৃত্যুর নিয়ামক হতে পারে না

পরীক্ষার ফলাফল জীবন-মৃত্যুর নিয়ামক হতে পারে না
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে গতকাল রোববার অনুষ্ঠিত ‘পরীক্ষার ফলাফল: বন্ধ হোক শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা’ শীর্ষক সংলাপে উপস্থিত অতিথিরা। ছবি: সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৫০

পরীক্ষার ফল কখনোই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের চূড়ান্ত নির্ণায়ক হতে পারে না। কিন্তু ফলকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবারের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, সামাজিক তুলনা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদাসীনতা এবং পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা কাঙ্ক্ষিত সফলতা না পাওয়াকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি না হওয়া কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে প্ররোচিত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পরীক্ষার ফল নয়, একজন শিক্ষার্থীর মূল্য নির্ধারিত হবে তার মানবিক গুণাবলি, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বহুমাত্রিক প্রতিভার ভিত্তিতে। সেই বার্তা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজ ও রাষ্ট্র– সব পর্যায় থেকে একযোগে আসতে হবে। 

গতকাল রোববার বিকেলে সমকাল কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘পরীক্ষার ফলাফল: বন্ধ হোক শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা’ শীর্ষক এক সংলাপে শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, গবেষক, শিশু অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকরা এসব মতামত তুলে ধরেন।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। সভা সঞ্চালনা করেন গবেষক ও লেখক গওহার নঈম ওয়ারা। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী, ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার, আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি তানসেন রোজ এবং আলোক শিক্ষালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান। 

ফল প্রকাশের পর বাড়ছে আত্মহত্যা

সূচনা বক্তব্যে গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। গত বছর ফল প্রকাশের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। গবেষণা বলছে, আত্মহত্যার চেষ্টার সংখ্যা আত্মহত্যার ১০ গুণ হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, আত্মহত্যার পেছনে কেবল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়াই কারণ নয়। অনেকে প্রত্যাশিত সেরা ফল না পাওয়ার হতাশা থেকেও চরম সিদ্ধান্ত নেয়। আবার কেউ কেউ গুজব শুনে ফল জানার আগেই আত্মহত্যা করে। পরে দেখা যায়, তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।

গওহার নঈম ওয়ারার মতে, সামাজিক মাধ্যমে পরীক্ষার ফল নিয়ে অতিরিক্ত প্রচার, সহপাঠীদের সঙ্গে তুলনা এবং সামাজিক প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সহপাঠী এবং গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা নিয়ে দেশে ধারাবাহিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

পরীক্ষা চলাকালেও ঘটছে আত্মহত্যা

আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, আত্মহত্যার ঘটনা শুধু ফল প্রকাশের পর নয়; পরীক্ষা চলাকালেও ঘটছে। চলতি বছর ভোলার এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসে না।

সম্প্রতি ১৪২টি ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তানসেন রোজ জানান, পরীক্ষা ও ফল-সংশ্লিষ্ট আত্মহত্যার ঘটনায় প্রায় ৭৫ শতাংশই নারী শিক্ষার্থী।

তাঁর মতে, আত্মহত্যার তিনটি প্রধান কারণ– নিজের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার হতাশা, পরিবারের অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ এবং সামাজিক তুলনা। ‘পাশের বাড়ির সন্তান ভালো করেছে, তুমি পারোনি’– এ ধরনের মন্তব্য শিক্ষার্থীদের গভীর অপরাধ ও লজ্জাবোধে আক্রান্ত করে।

তানসেন রোজ আরও জানান, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজ কক্ষে আত্মহত্যা করেছে। তাই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় এবং ফল প্রকাশের পর অন্তত দুই সপ্তাহ কোনো শিক্ষার্থীকে একা না রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

ফল প্রকাশের দিন বিদ্যালয়ে রাখার উদ্যোগ

আলোক শিক্ষালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ডেকে এনে ফল হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং অভিভাবকদেরও উপস্থিত রাখা হয়। এতে কেউ প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল করলেও একাকিত্বে ভোগে না এবং তাৎক্ষণিক শিক্ষক ও অভিভাবকের মানসিক সহায়তা পায়।

ফল নয়, এটি শেষ ধাক্কা

‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, পরীক্ষার ফল অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মূল কারণ নয়। বরং আগে থেকেই জমে থাকা মানসিক সংকটের শেষ ধাক্কা হিসেবে কাজ করে।

লায়লা খন্দকার বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর শৈশবের যৌন নির্যাতন, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কিংবা দীর্ঘদিনের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

বাল্যবিবাহ ও সহজলভ্য বিষ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, গত বছরের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আত্মহত্যাকারী নারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বাল্যবিবাহের শিকার ছিল। সংসারের চাপের মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর সে চাপ আরও বেড়ে যায়।

তিনি নেত্রকোনার এক শিক্ষার্থীর ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ফল জানার আগেই বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও অন্যদের কাছ থেকে অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরে ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।

গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিষাক্ত ট্যাবলেট সহজলভ্য হওয়াও বড় ঝুঁকি। গত বছরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘটনায় শিক্ষার্থীরা এ ধরনের বিষ গ্রহণ করে প্রাণ হারিয়েছে।

কম বয়সীদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, বিশ্বে কম বয়সীদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন আত্মহত্যা করেন। বছরে এ সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

কামাল চৌধুরী বলেন, শুধু একাডেমিক ফল নয়; গান, ছবি আঁকা, সাহিত্যচর্চা, খেলাধুলা, বিতর্কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রতিভার সমান মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

কামাল চৌধুরী বলেন, এখন আবার শিশুদের ওপর স্কুলে ভর্তির চাপ যুক্ত হচ্ছে। এ পর্যায়ে ফেল করলে এর প্রভাব বড় হলেও থেকে যাবে। তিনি বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও আত্মহত্যা করে, কিন্তু খবরে আসে কম। 

শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত দুর্বলতা

গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রেও নানা অসংগতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মান অর্জনের আগেই এমপিওভুক্ত হয়েছে। আবার কোথাও পরীক্ষার ফলকে কৃত্রিমভাবে ভালো দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

এ সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিক্ষাসমস্যা’ প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে লায়লা খন্দকার বলেন, আনন্দহীন শিক্ষা কখনোই সুস্থ মানুষ গড়ে তুলতে পারে না। শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি না করে শেখার আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

গণমাধ্যমের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ

সভাপতির বক্তব্যে সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, এই আলোচনায় আসা তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছে। অথচ বিষয়টিকে এখনও জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আত্মহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই দায়িত্ববোধ থেকে সমকাল এই সংলাপের আয়োজন করেছে।

আরও পড়ুন

×