যান্ত্রিক ঢাকায় ফুলের জলসা
কংক্রিটে ভরা শহর, সড়কের উত্তাপ আর ধোঁয়ায় ভারি বাতাসের কারণে রাজধানী ঢাকাকে যন্ত্রের মতো মনে হলেও একটু দৃষ্টি মেললে অন্য এক চিত্র চোখে পড়ে; ফুল, রং, ঘ্রাণের ক্যানভাস ফুটে ওঠে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে তোলা -মাহবুব হোসেন নবীন
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ | ০৯:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ধুলোর ওড়াউড়ি, নির্মাণযজ্ঞের খরখরে শব্দ, অবিরাম যানজট। আরও আছে কংক্রিটের দেয়াল, অ্যাসফল্টের উত্তাপ আর ধোঁয়ায় ভারী বাতাস। সঙ্গে মানুষের বল্গাহীন ব্যস্ততা। এসবই জাদুর শহর ঢাকার চেনা অলংকার! সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিদিন ছুটছে এই নগর। মনে হয়, অনন্তকাল ধরে চলা এক যন্ত্রের শহর। অথচ একই নগরে আছে ভিন্ন এক রূপ– বাহারি রং, রকমারি ফুল আর সুবাসের ঐকতান।
এটা সত্যি, এই শহরকে এখনও ছেড়ে যায়নি প্রকৃতি; বরং দূষণ আর যান্ত্রিকতার ভিড়ে নীরবে জানান দিচ্ছে রোশনি ছড়িয়ে। ব্যস্ত ও যান্ত্রিক নগরের মাঝেও প্রকৃতি মানুষের মনে কিছুটা হলেও প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। রাজধানীর ফুলে ভরা এলাকাগুলো ঘুরে মানুষের চোখেমুখে অন্যরকম আভা দেখা যায়।
হাতিরঝিলে এখন চোখ ফেললে ধরা দেবে কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম তরঙ্গ। দূর থেকে মনে হবে, গাছের ডালে ডালে জ্বলছে অগ্নিশিখা! বৈশাখের তপ্ত রোদে সেই লাল আরও জ্বলজ্বলে। এর পাশে জারুলের নরম বেগুনি শক্তি যেন শহরের কঠোরতাকে কোমল করে দিচ্ছে। হাঁটতে আসা অনেকেই থেমে ছবি তুলছেন, কোনো কোনো ক্লান্ত পথিক গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে খানিকটা জিরিয়ে নিচ্ছেন। এক পথচারী বলেই বসলেন, ‘ফুলগুলো না থাকলে শহরটাকে আরও বেশি ক্লান্ত লাগত।’
ঝিলপাড়ে কৃষ্ণচূড়া ও জারুলের সারির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অনিন্দিতা। বললেন, ‘ঢাকা শহর যতই কংক্রিট আর যানজটে ভরে যাক না কেন, এই ফুলগুলো দেখলে মনে হয় প্রকৃতি এখনও আমাদের সঙ্গে আছে। বিশেষ করে বিকেলের আলো যখন লাল কৃষ্ণচূড়ায় শহরটা হঠাৎ করেই অন্যরকম সুন্দর হয়ে উঠেছে। এই দৃশ্যগুলোই আমি ক্যামেরাবন্দি করে রাখতে পছন্দ করি।’
ঢাকার ফুসফুসখ্যাত রমনা পার্কের সকাল যেন বেশি জীবন্ত। বেলি, রঙ্গন, টগর আর কাঠগোলাপের সুবাসে ভোরের বাতাস এখন আরও স্নিগ্ধতা ছড়ানো। প্রাতর্ভ্রমণে আসা মানুষ ঘাসের ওপর হাঁটতে হাঁটতে নেন অন্যরকম অনুভূতি।
প্রতিদিন রমনা পার্কে হাঁটতে আসেন রহমান জামান। অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিদিন অফিস শেষে এখানে একটু হাঁটতে আসি। সারা দিনের ধুলো, শব্দ আর মানসিক চাপ এই ফুলের গন্ধে অনেকটা হালকা হয়ে যায়। মনে হয় শহরের ভেতরেই একটা ছোট শান্ত জগৎ আছে, যেখানে কিছু সময়ের জন্য নিজেকে ফিরে পাওয়া যায়।
একই চিত্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও। বিশাল সবুজের বুকে ফুটে থাকা গোছা গোছা ফুল যেন শহুরে ক্লান্ত মনকে সাময়িক প্রফুল্লতায় ভরায়। আবার ধানমন্ডি লেকে হাঁটার পথের ধারে এখন বাগানবিলাস, টগর আর ছোট ছোট রঙিন ফুলের সমাহার। বিকেলের আলো পড়লে ফুলের রং হয়ে ওঠে আরও দীপ্তিময়। তরুণ-তরুণী, যুবক কিংবা বৃদ্ধ– সবার চোখেই ধরা পড়ে এই সৌন্দর্য।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বলধা গার্ডেনে এখন দেখা মিলছে হরেক ফুল। গার্ডেনে ঢুকতেই বাইরের শহুরে শব্দ একেবারেই যেন বিলীন। শতবর্ষী এই উদ্যানে গোলাপ, অর্কিড, লিলি, রুয়েলিয়া, লতা পারুল, জবা, নাগলিঙ্গমসহ দেশি-বিদেশি অসংখ্য ফুলের মিছিল! সৌরভ, ছায়াঘেরা পথ আর পাখির ডাকে সেখানে এক ভিন্ন জগৎ।
রাজধানীর প্রধান সড়ক-মহাসড়কেও চোখে পড়ছে রঙের বাহারি উৎসব। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আগারগাঁও-সংলগ্ন সড়ক, বিজয় সরণি থেকে শ্যামলী পর্যন্ত বিস্তৃত পথজুড়ে সারি সারি সোনালু, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া আর কাঠগোলাপের মায়ায় ভরে উঠেছে। সড়ক-বিভাজকে লাগানো ঝোঁপাকৃতির বাগানবিলাস আর মৌসুমি ফুলও বদলে দিয়েছে পথের সৌন্দর্য। দুপুরের সূর্যের কিরণে হলুদ সোনালু যেন হয়ে ওঠে ছোট ছোট আলোর মালা। সড়কের পাশে বাতাসে দুলতে থাকা ফুলগুলো যেন নগরের আনুষ্ঠানিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি একধরনের মানবিক প্রশান্তি যোগ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে থাকা বিশালাকৃতির নাগলিঙ্গম গাছ এখন শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীর মধ্যে ভিন্ন আকর্ষণ তৈরি করছে।
যান্ত্রিক শহরের আরেকটি আড়ালের গল্প মানুষের ছাদবাগানে। ধানমন্ডি, কলাবাগান, আফতাবনগর কিংবা পুরান ঢাকার অনেক আবাসিক ভবনের ছাদে গোলাপ, সূর্যমুখী, ডালিয়া, গাঁদা, এমনকি ছোট্ট জলাশয় তৈরি করে তাতে পদ্ম ফুলও ফুটেছে। দিনের শেষে অনেকেই এই ছাদবাগানে খুঁজে পান স্বস্তির কিছু মুহূর্ত।
দূষণ, যান্ত্রিকতা আর ক্লান্তির মধ্যেও ঢাকা নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়– প্রকৃতি এখনও হেরে যায়নি। শহরের মহাসড়ক, উদ্যান, লেকপাড় কিংবা বাগানে ফুটে থাকা ফুল যেন বলে যায়, কংক্রিটের ভেতরেও জীবন আছে, রং আছে।
