চেনা শহরের অচেনা রূপ
জনসন রোড এলাকা। ছবি- ফোকাস বাংলা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১২:০৮
ঈদের দিনজুড়ে ছিল কোরবানি, মাংস বণ্টন, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা আর পারিবারিক ব্যস্ততা। সেই আনুষ্ঠানিকতার আমেজ কাটতে না কাটতেই ঢাকার চেনা চিত্রে আসে ভিন্নতা। ঈদের পরদিন থেকেই রাজধানীর চিরচেনা সড়কগুলো থেকে উধাও যানজট ও গাড়ির হর্ন। আর এই ফাঁকা ঢাকার সুযোগ নিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে নগরবাসী বেরিয়ে পড়েন চেনা শহরকে নতুন করে আবিষ্কার করতে। নগরীর বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র, উদ্যান, ঐতিহাসিক স্থাপনা আর নান্দনিক রেস্তোরাঁগুলো মুখর হয়ে ওঠে ঢাকাবাসীর আনন্দভ্রমণে।
ঈদের ছুটিতে জাতীয় চিড়িয়াখানার প্রবেশপথেই চোখে পড়ে দর্শনার্থীর দীর্ঘ সারি। শিশুদের হাত ধরে অভিভাবকদের অপেক্ষা, বন্যপ্রাণীগুলোকে কাছ থেকে দেখার বিপুল আগ্রহ আর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর উচ্ছ্বাস– সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
এবারের ঈদে চিড়িয়াখানার মূল আকর্ষণ ছিল বহুল আলোচিত অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। হালকা গোলাপি বর্ণ আর মাথার ওপর থাকা সোনালি চুলের এই মহিষকে দেখতে দর্শনার্থীর ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি। এল-০৭ নম্বর খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ছোট-বড় সবাই ব্যস্ত ছিলেন ছবি ও ভিডিও ধারণে।
উত্তরা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা কায়সার বলেন, ঈদের ছুটিতে ঢাকা ফাঁকা থাকায় পরিবার নিয়ে অনেক স্বস্তিতে ঘুরা যায়। জ্যামের চিন্তা থাকে না আর বাচ্চারাও খুব আনন্দ করছে।
পাশেই থাকা বোটানিক্যাল গার্ডেনে ছিল কিছুটা ভিন্ন চিত্র। শান্ত পরিবেশ ও প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর ছিল এই উদ্যান। সবুজে ঘেরা ছায়াবীতিতে হাঁটাহাঁটি, পারিবারিক আড্ডা আর ছবি তোলায় ব্যস্ত সময় কাটান দর্শনার্থীরা।
পড়ন্ত বিকেলে হাতিরঝিলের হাওয়া
বিকেলের দিকে মানুষের ঢল নামে হাতিরঝিল এলাকায়। লেকপাড়ে খোলা হাওয়ায় হাঁটা, ওয়াটার বাসে চড়ে ঘুরে বেড়ানো কিংবা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে রক্তিম সূর্যাস্ত উপভোগ– সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠতেই হাতিরঝিল যেন রূপ নেয় এক মায়াবী নগরীতে। লেকের পাশের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। সেখানে পরিবারসহ আসা গৃহিণী তানিয়া বেগম বলেন, বাসার পাশেই হাতিরঝিল। বাতাস থাকে এখানে এসে বসে থাকতে আরাম লাগে। ঈদ এখন, চারপাশে এত মানুষ, দেখতেও ভালো লাগে। তবে হাতিরঝিলের পরিবেশ একটু বিশৃঙ্খল হয়েছে। এটা ঠিক করতে পারলে আরও ভালো লাগত।
মুঘল স্থাপত্য আর বুড়িগঙ্গার তীরে স্মৃতির মেলবন্ধন
রাজধানীর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতেও ছিল দর্শনার্থীর সরব উপস্থিতি। লালবাগ কেল্লার প্রাচীন স্থাপত্য, মুঘল আমলের ইতিহাস এবং বিস্তৃত চত্বরে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে সব বয়সী মানুষকে। একই চিত্র বুড়িগঙ্গা তীরের ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলেও। অনেকেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে সন্তানদের নিয়ে এসেছেন এখানে।
আহসান মঞ্জিলে নাতিদের নিয়ে ঘুরতে আসা পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, এই ঈদের সময়েই নাতি-নাতনিদের কাছে পাই। আহসান মঞ্জিলও বাসার কাছে। নাতিদের এখানে নিয়ে এসে এই দালানের গল্প বলি, খুব ভালো কাটে সময়টা।
মেতেছে শৈশব, জমজমাট রেস্তোরাঁ আড্ডা
ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর, শ্যামলীর শিশুমেলা, ফ্যান্টাসি কিংডম, নন্দন পার্ক কিংবা বসুন্ধরা সিটির ‘টগি ফান ওয়ার্ল্ড’– সবখানেই ছিল শিশুদের উৎসবের আমেজ। রাইডগুলোয় চড়ার আনন্দ আর শিশু-কিশোরদের কোলাহলে মুখর ছিল বিনোদনকেন্দ্রগুলো। অন্যদিকে, বিগত কয়েক বছর ধরে ঢাকায় গড়ে ওঠা থিমেটিক ও নান্দনিক রেস্তোরাঁগুলোয় সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত ছিল তরুণ-তরুণীর উপচে পড়া ভিড়। দিনের কোলাহল শেষে সন্ধ্যার পর পুরো ফাঁকা ঢাকাকে উপভোগ করতে অনেকে বেছে নিয়েছেন নিজস্ব বাহন কিংবা রিকশা। নগরজীবনের শত ব্যস্ততার মাঝে পরিবারকে সময় দেওয়ার জন্য ঢাকাবাসীর কাছে নিজেদের এই ফাঁকা শহরটাই ঈদের সবচেয়ে বড় উপহার।
