সাংহাই মডেলে ঢাকাকে গড়তে চায় সরকার
ঢাকা শহর (ফাইল ফটো)
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২০ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
চীনের সাংহাই শহরের মডেলে ঢাকা শহরকে সাজাতে চায় সরকার। এক সময় সাংহাই ঢাকা শহরের মতো অপরিকল্পিত জঞ্জালের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। ল্যান্ড রিডেভেলপমেন্ট (ভূমি পুনঃউন্নয়ন) প্রকল্পের মাধ্যমে সাংহাই আজ বিশ্বের আধুনিক শহরের কাতারে চলে গেছে। চীনের সবচেয়ে আধুনিক শহর এখন সাংহাই। ঠিক সেভাবেই ঢাকা শহরকে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জানা গেছে, গত ৪ মার্চ রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্থাপত্য অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বেশ কয়েকজনকে ডেকে নেন প্রধানমন্ত্রী। তখন ঢাকা শহরকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে সাজানো যায়, তিনি তা জানতে চান। পাশাপাশি এটাও জানতে চান, চীনের সাংহাই কীভাবে এত আধুনিক, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হলো। সাংহাই যদি পারে তাহলে ঢাকা পারবে না কেন– সে প্রশ্নও রাখেন।
এ সময় রাজউক চেয়ারম্যান ও উপস্থিত অন্যরা সাংহাই শহরের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে জানান, রিডেভেলপমেন্ট ও ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে আজ সাংহাই এ অবস্থায় এসেছে।
তখনই তিনি সংশ্লিষ্টদের সাংহাই আদলে ঢাকা শহরকে ঢেলে সাজানোর নির্দেশ এবং এ বিষয়ে দ্রুত কাজ শুরুর পরামর্শ দেন। দ্রুত এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপনের জন্য বলেন প্রধানমন্ত্রী।
এর পরই রাজউক ‘ঢাকা আরবান রিজেনারেশন প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। দ্রুত সারসংক্ষেপ তৈরি করে পূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের কাছে উপস্থাপন করেছে।
প্রকল্প প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এই মডেলে রাজউক আগেই যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে যেতে পারেনি। এ জন্য প্রকল্প প্রণয়নের কাজটা সহজ হয়েছে। এখন যেহেতু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী চাইছেন, এতে বাস্তবায়ন করাটা সহজ হয়ে যাবে। বাকি বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী সাংহাই মডেলকে অনুসরণ করতে বলেছেন। আমরা সেভাবেই এগোব। ঢাকা শহরে যেসব ঘিঞ্জি ও অপরিকল্পিত এলাকা আছে, সেখানকার জমির মালিকদের জমি নিয়ে ওই এলাকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। বহুতল ভবন তৈরি করে জমির মালিকদের জমি অনুযায়ী ফ্লোর স্পেস দেওয়া হবে। সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এর মাধ্যমে ওই এলাকার রাস্তাঘাট যেমন প্রশস্ত হবে, তেমনি খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও জলাশয়ও তৈরি করা যাবে। একবারে পুরো ঢাকা শহরে এটা করা না গেলেও পুরান ঢাকার একটি বড় অংশ নিয়ে কাজটা শুরু করতে চাই।
সাংহাই মডেল কী
সাংহাই এখন চীনের একটি বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক শহর। পুডং নদীর পাশে অবস্থিত এ শহর এক সময় ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হয়েছিল। ২০ শতকের শেষ দিকে ‘গ্রেটার সাংহাই প্ল্যান’ নামে পুরো শহরের একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়। পুরোনো অবকাঠামো সব অপসারণ করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে এ কাজের বেশির ভাগই এগিয়েছে। ২০৩৫ সালে পুরো কাজ শেষ হবে। তবে তার আগেই সাংহাই দেশটির সবচেয়ে আধুনিক শহরে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগের আমলে রাজউক এ ধরনের একটি প্রকল্পের পাইলটিং করতে চেয়েছিল। বাবুবাজারসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করে ৪০০ একর জমি নিয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এক সময় দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দারা রাজউকের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন। পুরান ঢাকার শত শত বাসিন্দা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নগরভবনে গিয়ে তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকনের কাছে রাজউকের খপ্পর থেকে পুরান ঢাকাবাসীর জমি রক্ষার দাবি জানান। এক পর্যায়ে তিনি ঘোষণা দেন, এলাকাবাসীর মতকে উপেক্ষা করে কোনো প্রকল্প রাজউককে বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না।
রাজউকের প্রকল্পে যা আছে
শুরুতেই জাপানের হিকিফুন এলাকার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, হিকিফুনও এক সময় জনাকীর্ণ ছিল। নগর পুনঃউন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ফলে আধুনিক বাসযোগ্য এলাকায় পরিণত হয়েছে শহরটি। পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ছোট ছোট জমিকে এক করে পরিকিল্পতভাবে পুরো এলাকার উন্নয়ন করে মালিকানা অনুযায়ী শেয়ার দেওয়া হয় জমির মালিকদের। এর মাঝ দিয়েই পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে এলাকাটি। এটা বাস্তবায়ন করা হলে প্রকল্প শেষে ছোট আয়তনের জমির মালিকরাও উন্নত অবকাঠামোসহ বেশি মূল্যের প্লট বা ফ্লোর স্পেস ফেরত পাবেন। ডেভেলপারদের অনুকরণে ফ্লোর স্পেস বিক্রির মাধ্যমে প্রকল্পের খরচ তুলে আনা হবে।
প্রথম ধাপে হাজারীবাগ, বংশাল, চকবাজার, ইসলামবাগ, মৌলভীবাজার, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পে জরাজীর্ণ এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে আধুনকিয়ান, ভবনের উচ্চতা, সড়কের প্রশস্ততা, ভূমিকম্প সহনীয়ভাবে ভবন তৈরি, মালিকানা অনুযায়ী সম্পদ বুঝিয়ে দেওয়া, আধুনিক ফুটপাত, খেলার মাঠ, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি কীভাবে হবে, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যমান অবস্থার চিত্র ও প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কেমন চিত্র দাঁড়াবে, তা সচিত্র উপস্থাপন করা হয়।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, বিভিন্ন দেশের মানুষের সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, সামাজিক ব্যবস্থা, বসবাসের ধরন ভিন্ন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটা ব্যতিক্রম নয়। এখানে সিউল, সিঙ্গাপুর বা সাংহাই মডেল না এনে বাংলাদেশ মডেল আনতে হবে। কারণ সাংহাইতে জমির মালিকানার বিষয়ে সরকারের যেমন নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, বাংলাদেশে তা নেই। চাকচিক্যই কিন্তু পরিকল্পনার মূল বিষয় নয়। অন্তর্ভুক্তিই মূল বিষয়।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় প্রচুর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কম। আবার সরকার যে বাস্তবায়ন করবে, সরকারেরও সেই সক্ষমতা আছে কিনা– সেটাও বিবেচ্য। এ ছাড়া এই ধরনের একটি পাইলট প্রকল্প আগে করতে গিয়ে রাজউক ব্যর্থ হয়েছে। এসব থেকে বলব, সাংহাই মডেল খোঁজ না করে বাংলাদেশ মডেলটা কী হওয়া উচিত, সেটা আলোচনা করা দরকার।
