শোকসভায় মাহেরিনকে স্মরণ
‘শিক্ষক প্রয়োজনে জীবন দিয়েও শিক্ষার্থীকে রক্ষা করেন’
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ২২:১০ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ২২:১৫
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গত বছরের ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহতদের স্মরণে এবং আহতদের সুস্থতা কামনায় শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে নিহত শিক্ষক মাহেরিন চৌধুরীর স্বামী মুনসুর হেলাল বলেন, ‘মাহেরিন শুধু একজন শিক্ষিকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মা, একজন বন্ধু, জীবন বাঁচানোর কারিগর।’
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মিলনায়তনে ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’ স্লোগানে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষক ও অভিভাবকেরা দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণা করেন। তাদের ভাষ্য, জুলাই শুধু একটি মাস নয়, এটি তাদের হারানোর এবং গভীর শোকের মাস। এ মাস এলেই আগুনের লেলিহান শিখা, কালো ধোঁয়া, শিশুদের আর্তনাদ এবং স্বজন হারানোর স্মৃতি ফিরে আসে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক জেসমিন সুলতানা। তিনি বলেন, ‘সেদিন আমরা খুব কাছ থেকে মৃত্যু দেখেছি। আগুনের ভয়াবহতা দেখেছি। কালো ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে যেতে দেখেছি। দেখেছি বাঁচার জন্য শিশুদের আকুতি, স্বজনদের বুকফাটা কান্না। সেই দৃশ্য কোনো দিন ভুলে থাকার নয়।’
তিনি বলেন, ‘যে শিশুদের একটু আগেই ক্লাসে পড়িয়েছি, মাথায় হাত রেখে বলেছিলাম- মা, আগামীকাল পড়া শিখে আসবে, মুহূর্তের মধ্যে তাদের অনেককেই হারিয়ে ফেললাম। এই কষ্ট শুধু আমাদের নয়, পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে।’
বক্তব্যের শুরুতে তিনি দুর্ঘটনায় নিহত কো-অর্ডিনেটর মাহেরিন চৌধুরী, ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর মাহফুজা খাতুন, শিক্ষিকা মাসুকা এবং নিহত শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
জেসমিন সুলতানা বলেন, দুর্ঘটনার সময় শিক্ষকরা নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার ভাষ্য, ‘আমরা শিক্ষকরা আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। সেই আত্মত্যাগের সবচেয়ে বড় উদাহরণ রেখে গেছেন মাহেরিন চৌধুরী, মাহফুজা খাতুন ও মাসুকা ম্যাডাম।’
তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিকভাবে সুস্থ করে তুলতেও শিক্ষকরা কাজ করে যাচ্ছেন। কাউন্সেলিং ও বিভিন্ন পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁরা শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন।
জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘আমরা মাহেরিন ম্যাডামের আদর্শে উজ্জীবিত। তিনি দেখিয়ে গেছেন, শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন; তিনি একজন মা, একজন বন্ধু, একজন জীবন বাঁচানোর কারিগর। শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়েও শিক্ষার্থীদের রক্ষা করেন।’
অনুষ্ঠানে আরও কয়েকজন শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তারা সব সময় পাশে থাকবেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্মরণে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। এতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল (অব.) নুর নবী, অধ্যক্ষ জিয়াউল আলমসহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী হতাহত হন। নিহত কো-অর্ডিনেটর মাহেরিন চৌধুরী শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারান।
- বিষয় :
- মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি
- শোকসভা