চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই লেখকের জীবন
জন্মদিনে কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে ‘মঞ্জু সরকারের গ্রন্থোৎসব ২০২৬’ আয়োজন করা হয় সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের ৭৩তম জন্মদিন গতকাল মঙ্গলবার উদযাপন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় গ্রন্থ উৎসবের। নিজের লেখকজীবনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর যে স্বপ্ন নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেই পরিসর সংকুচিত হয়েছে। তাঁর সামনে এখন প্রশ্ন পাঠকই কি কমে গেছে, নাকি লেখকের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ তৈরির সক্ষমতা কমেছে?
তবে এই বাস্তবতাকে লেখালেখি থেকে সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখেন না মঞ্জু সরকার। বরং চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকেই লেখকের জীবন ও ভালোবাসা হিসেবে দেখেন।
অনুষ্ঠানে নতুন দুটি বই– গল্প সংকলন ‘শখের বাগানে সাপ’ এবং উপন্যাস ‘নিয়ন্ত্রক’ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপ্রাণন এ আয়োজন করে।
গবেষক ও প্রকাশক মফিদুল হক মঞ্জু সরকারের গল্পের জীবনঘনিষ্ঠতার দিকটি তুলে ধরেন। ‘গৃহপালিত গরুটার গতিপথ’ গল্পের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, প্রান্তিক মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গকে মঞ্জু সরকার অল্প পরিসরে যে গভীরতায় তুলে ধরেছেন, তা বিস্ময়কর। তাঁর গল্প বাংলা সাহিত্যে টিকে থাকবে।
‘নিয়ন্ত্রক’ নিয়ে সৈয়দ মুফাদ আহমেদ বলেন, পারকিনসন্সে আক্রান্ত একজন মানুষের অন্তর্গত স্বগতোক্তিকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটিতে চারপাশের সম্পর্ক ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে। চরিত্রগুলোর আচরণ তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় উপন্যাসটি সমাজকে দেখার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ‘শখের বাগানে সাপ’-এর গল্পগুলোতে সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার শক্তিশালী উপস্থিতি দেখেছেন সৈয়দ মুফাদ আহমেদ। তাঁর রসবোধেরও প্রশংসা করেন তিনি।
মঞ্জু সরকারের সাহিত্যিক সামর্থ্যের আরেকটি দিক তুলে ধরেন নাট্যকার, নাট্যনির্মাতা ও চলচ্চিত্রকার গিয়াসউদ্দিন সেলিম। তিনি বলেন, তাঁর ‘অবগুণ্ঠন’ উপন্যাস অবলম্বনে চ্যানেল আইয়ের জন্য সিরিজ নির্মাণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখাগুলোর পাশাপাশি নতুন গল্পগ্রন্থের ‘গৃহপালিত গরুটার গতিপথ’ গল্পটিও তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
শিক্ষাবিদ ও লেখক খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের আলোচনায় উঠে আসে মওলানা ভাসানীকে নিয়ে মঞ্জু সরকারের কাছে একটি বড় উপন্যাসের প্রত্যাশা। তাঁর মতে, সাহিত্যে মওলানা ভাসানী গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল একটি চরিত্র হলেও তাঁকে ফিকশনে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নির্মাণের কাজ এখনও হয়নি।
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, মানুষের সঙ্গে ভাসানীর সম্পর্ক, কনট্রাডিকশন এবং মানুষকে প্রভাবিত বা ম্যানিপুলেট করার ক্ষমতা– সব মিলিয়ে তিনি একটি বড় উপন্যাসের উপযুক্ত চরিত্র। প্রবন্ধে কোনো ব্যক্তিকে তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যায়, কিন্তু রক্ত-মাংসের চরিত্র হিসেবে নির্মাণের কাজ ফিকশন লেখকের। মঞ্জু সরকারের কাছে অন্তত একটি প্রতিশ্রুতি চান তিনি– এই কাজ শেষ করেই যেন লেখক থামেন।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে মঞ্জু সরকার একটু আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখন বই লিখে পাঠকরা কীভাবে নিচ্ছে, তা জানতে পারি না। একসময় আমার অনেক বই দুই হাজার কপি পর্যন্ত ছাপা হতো, এখন একটি বই ছাপা হয় ২০০/৩০০ কপি।’
স্বাগত বক্তব্য রাখেন সম্পাদক ও প্রকাশক আবু মোহাম্মদ ইউসুফ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার। সংগীত পরিচালনা করেন অনুপম কুমার পাল।
মঞ্জু সরকারের জন্ম রংপুরে ১৯৫৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ছোটগল্প, উপন্যাস ও শিশু-কিশোর সাহিত্য মিলিয়ে অর্ধশতাধিক গ্রন্থ রয়েছে তাঁর। সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তাঁর সাহিত্যকর্ম কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল ও পিএইচডি কোর্সে পড়ানো হয়। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে দুই যুগের বেশি সময় চাকরি করেছেন। এরপর দুটি জাতীয় দৈনিকে প্রায় এক দশক সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
- বিষয় :
- জন্মদিন