রাজউকের 'রাজা' যেন সিবিএর মালেক
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৬
হাতিরঝিল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে পদায়ন হলেও কখনোই তিনি অফিস
করেন না। মাস শেষে খাতায় স্বাক্ষর করে বেতন তুলে নেন। তার স্ত্রীকেও কখনও
অফিসে দেখা যায় না। মাস শেষে পিওনই বাসায় গিয়ে হাজিরা খাতায় তার স্ত্রীর
স্বাক্ষর নিয়ে আসে। এই 'সৌভাগ্যবান' ব্যক্তি হলেন রাজধানী উন্নয়ন
কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সিবিএ নেতা এম এ মালেক। তিনি রাজউক শ্রমিক-কর্মচারী
লীগের সভাপতি ও রাজউক শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন সমবায় সমিতির সভাপতি। তার
স্ত্রী সেলিনা আক্তারও রাজউকের উচ্চমান সহকারী।
১৯৮৩ সালে রাজউকে নিরাপত্তাকর্মী পদে চাকরি পান মালেক। পরে পিওন, নিম্নমান
সহকারীর পদ পেরিয়ে বর্তমানে তিনি উচ্চমান সহকারী। রাজউকে চাকরি পাওয়ার পর
তার বৈষয়িক উন্নতি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। রাজউকে এখন তার একচেটিয়া
প্রভাব। কেউ অবাধ্য হলেই তার ওপর নেমে আসে মালেকের খড়্গ। রাজউকে তিনি যা
বলেন, তা-ই হয়। প্লট বাণিজ্য, ফ্ল্যাট বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি
বাণিজ্য, কর্মচারীদের কোয়ার্টার বরাদ্দ বাণিজ্য, প্রবাসীদের প্লট গায়েব,
নকশা জালিয়াতি, সমবায় সমিতির কোটি কোটি টাকা লুটপাট- এ রকম অসংখ্য
অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে আছে মালেকের নাম। তবে মালেক সব অভিযোগই অস্বীকার
করেছেন।
অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি অগাধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।
রাজধানীতে রয়েছে তার একাধিক বাড়ি, একাধিক প্লট-ফ্ল্যাট, একাধিক গাড়ি, রিয়েল
এস্টেট কোম্পানি প্রভৃতি। দুদকে তার বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও রাজউক
কর্তৃপক্ষও তাকে কখনও ঘাটাতে যায় না। রাজউকে মালেকের এমন বিস্ময়কর উত্থানে
অনেক বড় বড় কর্মকর্তারও ভ্রু কুঁচকে যায়।
মালেকের ঘনিষ্ঠরা জানান, রাজধানীতেই মালেকের তিনটি বাড়ি রয়েছে। একটি
আফতাবনগরের বি ব্লকে, আরেকটি এফ ব্লকে। বাড্ডার ডিআইটিতে আরেকটি। আটতলা ওই
বাড়িতেই (প্লট-১৪, রোড-১২) থাকেন তিনি। বাকিগুলো ভাড়া দেওয়া। উত্তরার সাত
নম্বর সেক্টরে রয়েছে তিন কাঠার একটি প্লট। উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ১১
নম্বর রাস্তার ৫২ নম্বর প্লটের মালিকও তিনি। উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ৯
নম্বর সড়কের ২৬ নম্বর প্লট, ১১ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডের ২১ নম্বর
প্লটের মালিকও মালেক। আফতাবনগর আবাসিক এলাকার ডি ব্লকের ২ নম্বর রোডের ১৪
নম্বর প্লটের ৭তলা বাড়ির মালিকও তিনি।
এ ছাড়া পূর্বাচল ও ঝিলমিলেও রয়েছে একাধিক প্লট। মালেকের নামে ভাটারায় রয়েছে
এক বিঘা জায়গা। রয়েছে তিনটি গাড়ি (অ্যালিয়ন-ঢাকা মেট্রো গ-৩৯-১১০২, এক্সিও
করোলা ঢাকা মেট্রো গ-২৮-৩১৪২ ও টয়োটা নোয়া ঢাকা মেট্রো চ-১৯-১১৬৮)।
মাদারীপুরের শিবচরের ভেন্নাতলা পুরারটেকের মরহুম জৈনদ্দিন বেপারীর স্বল্প
শিক্ষিত ছেলে মালেক। সাধারণ পরিবার থেকে আসা মালেকের তিন মেয়ে এখন পড়ছে
ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বড় মেয়ে শারমিন আক্তার জলি উত্তরার মনসুর আলী
মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত, মেজ মেয়ে মাসুমা আক্তার মিথি পড়ে নর্থ সাউথ
বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ছোট মেয়ে জেসমিন আক্তার অ্যামি ঢাকা ন্যাশনাল আইডিয়ালের
ছাত্রী।
রাজউক কর্মচারীরা জানান, মালেকের নিয়োগও হয়েছিল অসাধু উপায়ে। গার্ড থেকে
নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক পদের পরীক্ষায় রাজউক শিক্ষাগত যোগ্যতা
চেয়েছিল উচ্চমাধ্যমিক পাস ও বাংলা-ইংরেজিতে টাইপের গতি থাকতে হবে ২০ ও ২৫
শব্দ। অথচ লিখিত পরীক্ষায় মালেক অংশই নেননি। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাও চাহিদা
অনুযায়ী ছিল না। জাল কাগজপত্র তৈরি করে ওই পদে নিয়োগ পান মালেক। এ নিয়ে
রাজউকের আরেকজন নিম্নমান সহকারী কাম টাইপিস্ট মোশাররফ হোসেন স্কাই রাজউক
চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগও দেন। কিন্তু রাজউক কর্তৃপক্ষ সেটা তদন্ত
করে দেখেনি।
কর্মচারীরা জানান, বছর দুয়েক আগে অথরাইজড অফিসার আশীষ কুমারকে একটি
ত্রুটিপূর্ণ প্লটের ফাইল পাস করাতে চাপ দেন মালেক। কিন্তু আশীষ তাতে রাজি
হননি। পরে মালেক অফিস সহকারী মাহাবুবসহ তার দলবল নিয়ে আশীষ কুমারের রুমে
ঢুকে তাকে লাঞ্ছিত করেন। আশীষ কুমার বিষয়টি প্রশাসনকে জানানোর পরও কোনো
ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এভাবে তিনি রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল হুদা ও
জয়নাল আবেদিনকেও হেনস্তা করেন। এ জন্য তারাও কখনও মালেককে ঘাটাননি।
রাজউকের এক কর্মকর্তা জানান, মালেক তার মেজ মেয়ে মাসুমার নামে মাসুমা
কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট নামে একটি কোম্পানিও খুলেছেন। একাধিক
কর্মচারী জানান, রাজউকের ৩৭২ জন মাস্টাররোল কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী করার
জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেছেন মালেক। কর্মচারীদের
বলেছেন, আদালতে মামলা করে তাদের চাকরি স্থায়ী করার ব্যবস্থা করবেন। এভাবে
কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
আরেক কর্মচারী জানান, রাজউকে যত ভুয়া নকশা অনুমোদন হয়, তার সঙ্গে জড়িত
মালেক সিন্ডিকেট। তাদের কাছে রাজউকের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সব
কর্মকর্তার সিল রয়েছে। নকশা পাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে
মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে জাল নকশা দিয়ে দেয় তারা। এ ধরনের ঘটনায় কয়েক মাস আগে
কালাম শিকদার ও কাবুলকে ভ্রাম্যমাণ আদালত আটক করেন। পরে তাদের সাময়িক
বরখাস্ত করে রাজউক। এ ছাড়া বাশার শরিফের কাছ থেকেও কয়েকটি ফাইল উদ্ধার করা
হয়। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারা সবাই মালেকের লোক
হিসেবে রাজউকে পরিচিত। এ ছাড়া সব বদলি ও কর্মচারীদের কোয়ার্টার বরাদ্দও
নিয়ন্ত্রণ করেন মালেক।
মালেকের আয়ের বহু খাত :রাজউক কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির নামে বরাদ্দ
দেওয়া উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ৭১ নম্বর হোল্ডিংয়ের দেড় বিঘা আয়তনের
বাণিজ্যিক প্লটে ছয়তলা নকশা পাস করান মালেক। ফাইল নং-(রাজউক/ন: অ:
অ:/৩সি-১১৭০/২০০১/১৫৪, তাং ১/১১.২০১১ ইং।) সেই নকশা জালিয়াতি করে সেখানে
১১তলা কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। সমিতির সভাপতি হিসেবে অতিরিক্ত
তলার স্পেস বিক্রি করে ২০ কোটি টাকা নিজের পকেটে ঢোকান মালেক। এ ছাড়া
নকশা-বহির্ভূত ১৭টি দোকান বসিয়ে সেগুলো বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ
করেন। পাশে থাকা সমিতির একটি তেলের পাম্প মাসে দেড় লাখ টাকায় ভাড়া দিলে আয়
দেখান ৭০ হাজার টাকা। বাকি টাকা তিনি আত্মসাৎ করেন।
কর্মচারীরা জানান, ২০১৫ সালে রাজউক কর্মচারী সমিতির উত্তরা ভূতের আড্ডা
মাকের্টের চতুর্থ তলায় ফ্লোর বিক্রি করেন চার কোটি টাকায়। ২০১৬ সালে আরও
দুটি ফ্লোর বিক্রি করেন আট কোটি টাকায়। এই ১২ কোটি টাকা রাজউকের ১২৩০
কর্মচারীর সম্পদ। মালেক ওই টাকা সমিতিতে জমা না দিয়ে নিজ ব্যবসায় দুই বছর
খাটান। এ নিয়ে সমিতির সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তিনি ছয় কোটি পাঁচ
লাখ টাকা পরিশোধ করেন। বাকি টাকা আত্মসাৎ করেন।
২০১৫ সালে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে পাঁচ বিঘা আয়তনের ৪ নম্বর বাণিজ্যিক
প্লটটি (মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের পাশে) রাজউক থেকে বরাদ্দ পায় সমিতি। ২০১৬
সালে সেখানে ১৫তলা ভবন নির্মাণের জন্য বিএনএস প্রপার্টিজের সঙ্গে চুক্তি
করে সমিতি। চুক্তি অনুযায়ী ভবনের মোট ফ্লোরের ৬২ শতাংশ পাবে ডেভেলপার। বাকি
৩৮ শতাংশ পাবে সমিতি। সমিতিকে ৩৫ কোটি টাকা সাইনিং মানি দিয়ে তিন বছরের
মধ্যে শপিংমল তৈরি করবে বিএনএস প্রপার্টিজ। সমিতির সভাপতি হিসেবে এমএ মালেক
ওই চুক্তি করেন। তবে সেখানে সাইনিং মানি আরও অনেক বেশি হওয়ার কথা। এ ছাড়া
ফ্লোর ভাগাভাগিও অর্ধেক-অর্ধেক হওয়ার কথা। অভিযোগ রয়েছে, সাইনিং মানি কম
নিয়ে ও ফ্লোর ভাগাভাগিতে সমিতির স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে মালেক গোপনে অন্তত ২২
কোটি টাকা নেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ করতে না পারায় বিএনএস টাকা
ফেরত চায়। তখন বিএনএসকে সমিতির ফান্ড থেকে ৫৭ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়। অথচ
কাজ করতে না পারার ব্যর্থতা বিএনএসের। তখন সবাই বুঝে যান মালেক আসলে ৩৫
কোটি টাকার চুক্তি দলিলে করলেও বিএনএসের কাছ থেকে সাইনিং মানি হিসেবে
নিয়েছিলেন ৫৭ কোটি টাকা। পরে স্বদেশ প্রপার্টিজের সঙ্গে নতুন আরেকটি চুক্তি
করেন। সেখানেও একই কাহিনি ঘটিয়েছেন মালেক। এ ক্ষেত্রে টাকার অঙ্ক আরও অনেক
বড়। এ ছাড়া রাজউকের দুটি কক্ষ মালেক দখল করে নিজের অফিস বানিয়েছেন।
মালেকের বক্তব্য :এসব প্রসঙ্গে মালেকের সঙ্গে রাজউকে এ প্রতিবেদকের কথা হয়।
তিনি দাবি করেন, তিনি প্রতিদিনই রাজউকে যান। কাজেই অফিস না করে বেতন
নেওয়ার কথা ঠিক নয়। তার স্ত্রীও একটু আগেই তার কক্ষ থেকে বেরিয়েছে। সেও
নিয়মিত অফিস করে। একাধিক বাড়ি-ফ্ল্যাট সম্পর্কে বলেন, একটি ছয়তলা বাড়ি ছাড়া
তার আর কোনো সম্পদ নেই। যারা তার বিরোধী, তারা সেই বাড়িটার ছবিই সবাইকে
দেখায়। তারা আরও বলে ভাটারায় নাকি আমার এক বিঘা জমি আছে। পূর্বাচল-ঝিলমিলে
প্লট আছে। এসব নিয়ে দুদকেও অনেক অভিযোগ পড়েছিল। দুদক তদন্ত করে এসবের কোনো
সত্যতা পায়নি। তারা পরে জানিয়েছে, কেউ শত্রুতামূলকভাবে এসব অভিযোগ দিয়েছে।
কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করা প্রসঙ্গে মালেক বলেন, তিনি কখনোই কোনো অফিসারকে
লাঞ্ছিত করেননি। রাজউকের আগের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা সবাই বিদায় নেওয়ার সময়
তার সম্পর্কে অনেক ভালো বলে গেছেন। সর্বশেষ বোর্ড সদস্য আসমাউল হোসেনও বলে
গেছেন মালেকের মতো ভালো সিবিএ নেতা তিনি কোথাও দেখেননি। সমবায় সমিতির অর্থ
আত্মসাৎ সম্পর্কে মালেক বলেন, সমিতির নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে একজন
দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি নির্বাচনে হারার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে এসব কথা
ছড়াচ্ছেন। অথচ যিনি এসব ছড়াচ্ছেন রাজধানীতে তারও আটটি বাড়ি রয়েছে।
- বিষয় :
- সিবিএর মালেক
