ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

 সিটি নির্বাচন

বিতর্কিত কাউন্সিলররাই মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন

বিতর্কিত কাউন্সিলররাই মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন
×

অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২১:২২

নানা অপকর্মের হোতারাই ফের কাউন্সিলর হতে তদবির করছেন; দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী এলাকা। বিগত সময়ে নানা অপকর্ম করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তারা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে তারা দলীয় সমর্থন পেতে তৎপর। ক্যাসিনো-সম্পৃক্ততা, দখল, চাঁদাবাজি, চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, কোরবানির পশুহাটের নিয়ন্ত্রণসহ এলাকায় নানা কর্মকাণ্ডের কারণে তারা ছিলেন সমালোচিত। সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে বিতর্কিত এই কাউন্সিলররা এবারও দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এসব কাউন্সিলরের বেশিরভাগ সরকারি দলের সমর্থনপুষ্ট এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পদধারী নেতাও।

এলাকাবাসী চান, আগামী নির্বাচনে বিতর্কিতরা যেন প্রার্থী হতে না পারেন। কোনো দলই যেন তাদের মনোনয়ন না দেয়। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, তারা আবার নির্বাচিত হলে তাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড আরও বাড়তে পারে। তাতে এলাকাবাসীর সেবাপ্রাপ্তির চেয়ে যন্ত্রণার পরিমাণ আরও বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনটা দলীয় ভিত্তিতে না হয়ে নির্দলীয় হলে অনেক ভালো মানুষের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকত। তা না করে রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। এতে মনোনয়নবাণিজ্য চলে। তখন খারাপ প্রার্থীরাও মনোনয়ন পেয়ে যান। প্রার্থীর সংখ্যাও কমে যায়। ভোটাররাও দলীয় বিবেচনায় ভোট দেন। নির্দলীয় হলে অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তখন ভোটাররা ভালো প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। কাজেই এ অবস্থার শিগগিরই কোনো পরিবর্তন হবে না, যদি দল উপযুক্ত ব্যক্তিদের মনোনয়ন না দেয়।

বিগত সময়ে বিতর্কিত কাউন্সিলরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা আসন্ন নির্বাচনেও প্রার্থী হতে চান। সে অনুযায়ী তারা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এলাকায় পোস্টার-ব্যানার সাঁটিয়েছেন। অনুসারীদের দিয়েও চলছে প্রচার। ইতোমধ্যে ক্যাসিনো, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুই সিটি করপোরেশনের চার কাউন্সিলরকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন বর্তমানে জেলে। আরেকজন বিদেশে পলাতক। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ ক্যাসিনো ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চলার সময় তিনি সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছিলেন। এর পর তিনি আর দেশে ফেরেননি। তাকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ ছাড়া ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজুর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তিনিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়ে জেলে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিব ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাবিবুর রহমান মিজানও জেলে। তাদের কোনো তৎপরতা না থাকলেও অন্য কাউন্সিলরদের সবাই বর্তমানে তৎপর। এর মধ্যে বিতর্কিতরা বেশি তৎপর।

ডিএসসিসির ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইদুল ইসলাম ওরফে মাদবর সাঈদ শনিবার দুপুরে সমকালকে বলেন, তিনি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। কাউন্সিলর পদে যেসব প্রার্থী মনোনয়ন চান; ২৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ডেকেছেন। তিনি একটা দিকনির্দেশনা দেবেন। আশা করেন, এবারও তিনি দলীয় মনোনয়ন পাবেন।

অথচ সাঈদ মাদবরের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার বাবার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখারও অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম ওরফে গোল্ডেন শফিকের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য তাকে সবাই গোল্ডেন শফিক হিসেবে চেনেন। এ ছাড়া বিমানবন্দরের কার পার্কিংয়ের নিয়ন্ত্রণ, ক্যাসিনো ব্যবসা, কোরবানির পশুহাটের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজিসহ এলাকায় হেন অভিযোগ নেই যা তার বিরুদ্ধে নেই। অথচ তিনিও এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। এ প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে লোকজন এসব মিথ্যা রটনা ছড়ায়। এলাকার জনগণ তার সঙ্গে আছে। ডিএসসিসির ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিসুর রহমানও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন পুরোদমে।

অথচ তার বিরুদ্ধে জলাশয় ভরাট, অন্যের জমি দখলসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, তার সম্পর্কে পত্রিকায় এসব কথা লিখে তার অনেক ক্ষতি করা হয়েছে। কেউ যাচাই-বাছাই করেনি এগুলো কতটা সত্য। যাচাই-বাছাই করলে এসব কোনোটার সত্যতা পেত না। তার পরও তিনি নির্বাচনে আছেন। আশা করছেন, এবারও তিনি মনোনয়ন পাবেন।

ডিএসসিসির ২২ নম্বর ওয়ার্ডের তারিকুল ইসলাম সজীবও এবার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছেন পুরোদমে। তার বিরুদ্ধেও অভিযোগের শেষ নেই। তিনি বলেন, ভোটে তিনি আছেন। সেভাবে প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

এদিকে সম্প্রতি ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চলাকালে বেশকিছু কাউন্সিলরের নাম বেশি করে আলোচনায় আসে। তাদের মধ্যে চারজন ছাড়া অন্যরাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা হলেন ডিএসসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আশ্রাফুজ্জামান ফরিদ, ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোস্তফা জামান, ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ, ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হাসান পিল্লু, ডিএনসিসির ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী, ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ইরান।

অবশ্য এ প্রসঙ্গে ফরিদুর রহমান খান ইরান বলেন, একটি আবাসন গ্রুপের এক কর্মকর্তা তার ওয়ার্ডে প্রার্থী হতে চান। বিগত নির্বাচনেও মনোনয়ন চেয়েছিলেন, কিন্তু পাননি। তাদের একটা পত্রিকা আছে। সেই পত্রিকায় তার সম্পর্কে এসব নেতিবাচক খবর ছাপা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ফার্মগেটের টেম্পোস্টা্যন্ড থেকে দৈনিক ৫ লাখ টাকা আমি চাঁদা পাই। অথচ সেই রিপোর্টেই লেখা হয়েছে, ৫২টা টেম্পো ছাড়ে। টেম্পোপ্রতি ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। তাহলে কি ৫ লাখ টাকা হয়?

সংশ্নিষ্টরা জানান, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একটি সমাবেশে বলেছেন, বিগত সময়ে যারা নেতিবাচক কার্যক্রমের কারণে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন, দল তাদের মনোনয়ন দেবে না। যারা পরিচ্ছন্ন ও ইতিবাচক ইমেজের অধিকারী, তারাই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সমর্থন পাবেন।

তারপরও বিভিন্ন সমালোচনায় জড়িয়ে যাওয়া ডিএনসিসির ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুর রউফ নান্নু, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রজ্জব হোসেন, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের হুমায়ুন রশিদ জনি, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল হাশেম হাসু, ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের জাহাঙ্গীর আলম ও ডিএসসিসির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজুল ইসলাম ভাট্টি, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাম আশরাফ তালুকদার, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সালাউদ্দিন আহমেদ ঢালী, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাসিবুর রহমান মানিক, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবু সাঈদ, ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের সারোয়ার হোসেন আলো, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের আরিফ হোসেনসহ অনেকেই মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

আরও পড়ুন

×