রাজধানীতে হকার ছয় লাখ, বসার ব্যবস্থা ৪ হাজারের
হকার ইস্যুতে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাস্তা-ফুটপাতে রং দিয়ে বসার স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৯:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
হকার ইস্যুতে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাস্তা-ফুটপাতে রং দিয়ে বসার স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সে উদ্যোগ বাস্তবায়নে এখন দুই সংস্থার গলদঘর্ম দশা! কারণ নতুন পদ্ধতিতে এত বিপুলসংখ্যক হকারের বসার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।
ঢাকা মহানগরীতে হকার সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। খুব কম স্থানই আছে, যেখানে নীতিমালা অনুসরণ করে হকার বসার ব্যবস্থা করা যায়। নীতিমালা মেনে দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার হকারের জন্য স্থান পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর হকারদের শৃঙ্খলায় আনতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসক সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাদের উদ্যোগে হকার নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়ন করে সরকার। সে নীতিমালা অনুসরণ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে রমনা ভবনের পাশের সড়কে ৪০০ হকারকে বসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বায়তুল মোকাররমে ক্রীড়া পরিষদের পাশে ৪৫০, ফুলবাড়িয়ায় ১৫০, নিউমার্কেট দক্ষিণ গেটে ২৫০, নিউমার্কেট বটতলা থেকে বিজিবি গেট পর্যন্ত এলাকায় ১০০ হকার বসছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত এক হাজার ৯০০ হকার রাস্তা-ফুটপাতে বসার সুযোগ পেয়েছে। একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটিতে দুই হাজার হকারের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে সর্বোচ্চ এক লাখ হকারের বসার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। বাকি পাঁচ লাখ হকারকে বসানো এখন দুশ্চিন্তার বিষয়।
এত হকার বসবে কোথায়
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আরও কিছু জায়গা হকারের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে সেখানে এখনও হকার বসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। রাজউক ভবনের পেছন থেকে একটি সড়ক রয়েছে মতিঝিলের ইউনুস সেন্টার পর্যন্ত। ওই সড়কে যানবাহন তেমন চলে না। সেখানে ২০০ হকারকে বসানোর ব্যবস্থা করা যাবে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীতে এজিবি কলোনির খেলার মাঠের চারপাশে থাকা রাস্তার একটি লেনে হকার বসাতে চায়। সেখানে আরও ৪০০ হকার বসানো সম্ভব। মতিঝিলের ইসলাম চেম্বারের পেছনের সড়কে ২০০ হকার বসানো যেতে পারে। শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মৈত্রী সংঘের মাঠের চারপাশের রাস্তার একপাশে আরও ৪০০ হকার বসতে পারে। এভাবে আরও সর্বোচ্চ দুই হাজার হকারকে জায়গা নির্দিষ্ট করে বসানো সম্ভব। তবে ডিএসসিসি এলাকায় বর্তমানে হকারের সংখ্যা প্রায় চার লাখ। তাহলে বাকি হকারের বসার ব্যবস্থার কী হবে?
এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ মিরপুর ১০ ও ১৪ নম্বর এলাকায় আরও ৪৫০ হকারকে বসার ব্যবস্থা করেছে। এ ছাড়া শ্যামলীর রিংরোড ও মোহাম্মদপুর এলাকায়ও কিছু হকারের বসার ব্যবস্থা করতে চায় সংস্থাটি। এভাবে আরও কয়েকটি স্থান মিলিয়ে ঢাকা উত্তর হয়তো দুই হাজার হকারের ব্যবস্থা করতে পারবে। তবে ডিএনসিসি এলাকায় হকার আছে দুই লাখ। বাকিদের বসার জায়গা কোথায় হবে, তা বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে।
নৈশ মার্কেটের পরিকল্পনা
হকারকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে কয়েকটি এলাকায় নৈশ মার্কেট বসানোর পরিকল্পনা করেছে দুই সিটি করপোরেশন। অফিসপাড়ায় বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সেসব এলাকায় হকাররা বসতে পারবেন। তাদের নিজ উদ্যোগে সোলার বাতির ব্যবস্থা করতে হবে। সিটি করপোরেশনের তরফে তাদের প্রাকৃতিক কাজ সম্পাদনের জন্য ভ্রাম্যমাণ টয়লেট ও নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে সহযোগিতা করা হবে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নৈশ মার্কেটর মাধ্যমে রাজধানীর এক-চতুর্থাংশ হকারকে শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব। এ জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটনের আট বিভাগে আটটি নৈশ মার্কেট করার চিন্তা রয়েছে। রমনা, মতিঝিল, মিরপুর, উত্তরা, তেজগাঁ, ওয়ারী, লালবাগ ও গুলশান বিভাগের সুবিধাজনক স্থানে মার্কেটগুলো বসানো হবে। এ জন্য ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জায়গা খুঁজছে। এ ছাড়া পূর্বাচলে আরেকটি নৈশ মার্কেট বসানোরও পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিএনসিসির চেয়ে ডিএসসিসিতে উন্মুক্ত স্থান অনেক কম, অপরিকল্পিত ও ঘিঞ্জি।
সদরঘাট-বাবুবাজার এলাকাতেই ১০ হাজার হকার আছে। তবে ওই এলাকা এতটাই ঘিঞ্জি যে, নীতিমালা মেনে সেখানে ১০০ হকার বসানোর মতো জায়গা নেই। তবে দুয়েকটি পয়েন্টে নৈশ মার্কেট বানিয়ে তাদের বসানো যেতে পারে। তবে সব হকারকে তো এভাবে বসার সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার ও হকার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, আমরা জায়গাগুলো নির্ধারণ করে দিচ্ছি। সেখানে কতজন হকার বসবে সে বিষয়ে সিটি করপোরেশন সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ওই জায়গার বাইরে হকার না বসানোর অনুরোধ থাকবে। তা না হলে আবার নাগরিক ভোগান্তি বাড়বে এবং পথচারী ও যান চলাচলেও সমস্যা তৈরি হবে।
নির্ধারিত সীমানা মানছে না হকাররা
এরই মধ্যে যেসব রাস্তা-ফুটপাতে রং দিয়ে হকার বসার জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে সেটা অনুসরণ করছে না হকাররা। আগের মতোই তারা ইচ্ছেমতো ফুটপাত ও রাস্তার ভেতরে বসে যাচ্ছে। গুলিস্তান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গুলিস্তান সিনেমা হল থেকে শুরু করে জিপিও পর্যন্ত পুরো ফুটপাতই হকারের দখলে। আর রাস্তায় তারা দোকান বসিয়ে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করছে। এ ছাড়া রমনা ভবনের উত্তর পাশে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনের সড়কটি বসার জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সেখানে হকারের সংখ্যা কম। চিহ্নিত করা জায়গাগুলো অনেকটা ফাঁকা। অথচ রমনা ভবনের দক্ষিণ পাশের পুরো সড়কই হকারে ঠাসা। সড়কটি দিয়ে চলাচলের জো নেই।
হকার মনিরুল ইসলাম বলেন, আমাকে একটা কার্ড দিয়ে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে বসতে বলা হয়েছে। কিন্তু ওখানে বিক্রি কম হয়। এ জন্য সেখানে বসেননি। হকার আলী হোসেন বলেন, কোথায় বসব কেউ বলে দেয়নি। তাই রাস্তায় বসেছি।
জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, ফুটপাতে হকার বসানোর নতুন ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত সুফল মেলেনি। কারণ পুলিশ সব সময় পাহারা দিয়ে হকারকে ফুটপাত বা রাস্তায় বসা বন্ধ করতে পারবে না। সিটি করপোরেশনেরও দায়িত্ব আছে।
হকার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, রাজধানীর ফুটপাত-সড়কের হকার সমস্যা ছোটখাটো বিষয় নয়। অতীতে বহু উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। তবে তা কার্যকর কিছু হয়নি। এবার সিটি করপোরেশন হকার পুনর্বাসন না করে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এটা কাউকে না কাউকে নিতে হবে। সিটি করপোরেশন সেই উদ্যোগই নিয়েছে। তবে শুধু জায়গা নির্ধারণ করে দিয়ে সব হকারকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা সম্ভব নয়। এ জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকান্দার হায়াৎ সমকালকে বলেন, এভাবে হকার সমস্যার সমাধান হবে না। হকারের জন্য আইন করতে হবে, যেটা অনেক দেশেই আছে। সংসদে পাস করা আইন হতে হবে। সেটা না হওয়া পর্যন্ত হকার সমস্যার সমাধান হবে না।
- বিষয় :
- হকার
- রাজধানী
- রাজধানী ঢাকা
