ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

জাকাত দেওয়ার নামে প্রতারণার ফাঁদ!

জাকাত দেওয়ার নামে প্রতারণার ফাঁদ!
×

প্রতীকী ছবি

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ২৩:৫৬

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির সামনে হাঁটছিলেন গৃহবধূ রুনা রহমান। এ সময় অপরিচিত এক নারী গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। এক ফাঁকে জানান, অদূরে প্রবাসী এক ধনবান ব্যক্তি প্রচুর জাকাত দিচ্ছেন। সঙ্গে থাকা আরও দুই পুরুষকে দেখিয়ে বলেন, 'আমরা টাকা পাইছি, আপনি গেলে আপনিও পাইবেন।' এতে আগ্রহী হন রুনা। এবার তাকে সঙ্গে নিয়ে জাকাত দেওয়ার স্থানে রওনা হন ওই নারী। দূর থেকে দেখান, এক ব্যক্তি অন্যদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছেন। এ পর্যায়ে রুনার স্বর্ণালংকার খুলে ব্যাগে রেখে যাওয়ার পরামর্শ দেন। নইলে ধনী ভেবে হয়তো তাকে জাকাত দেওয়া হবে না। এরপর কৌশলে তার গহনা-মোবাইল ফোনসেট রেখে পাঠানো হয় জাকাত আনতে। তবে তিনি গিয়ে জাকাত পাননি। আবার ফিরে এসে দেখেন- তার লাখ টাকার গহনা ও ফোনসেট নিয়ে সেই নারীও হাওয়া।

এমনই অভিনব কৌশলে প্রতারণায় জড়িত একটি চক্রকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রথমে চক্রের নারী সদস্য সাহিদা বেগম ধরা পড়ে যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায়। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চক্রের অন্য সদস্যদের নাম-ঠিকানা। একে একে ধরা পড়ে মুস্তাকুল ওরফে জনি, তার ভাই ও সাহিদার ভগ্নিপতি ইজারুল, জাহিদ, মিরাজ ও কালু। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় প্রতারণার বিস্তারিত কাহিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিশাত রহমান মিথুন সমকালকে বলেন, মূলত মানুষের লোভকে পুঁজি করেই এ চক্রের সদস্যরা প্রতারণা করে আসছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর খুব দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হয়। তবে তারা জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, চক্রটি প্রায় দুই বছর ধরে এ ধরনের প্রতারণা করে আসছিল। তারা এর আগেও বেশ কয়েকটি ঘটনায় নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসেট ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নিয়েছে। এমন চক্র আছে পাঁচ-সাতটি। মূলত তারা নারীদের টার্গেট করে। এর মধ্যে গত বছরের মাঝামাঝি আজিমপুরের চায়না বিল্ডিং গলিতে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর স্ত্রী একটি চক্রের ফাঁদে পড়েন। তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় তিন লাখ টাকার স্বর্ণালংকার। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তখন ওই চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে গত ২২ জানুয়ারি। সেদিন প্রভাবশালী এক ব্যক্তির গাড়িচালকের স্ত্রী রুনার গলায় স্বর্ণের চেইন, কানে দুল ও আংটি দেখে এগিয়ে যায় সাহিদা। সে যেচে কথা বলে এবং জাকাত দেওয়ার গল্প ফাঁদে। তার বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য নিজের ব্যাগ খুলে জাকাত হিসেবে পাওয়া টাকাও দেখায়। এরপর তাকে জানায়, ওখানে অনেক ভিড় জমেছে। তবে তার সঙ্গে গেলে লাইনে না দাঁড়িয়ে দ্রুত জাকাত পাওয়া যাবে। তার সঙ্গে এগোতে শুরু করেন ভুক্তভোগী। কিছুদূর যেতেই তাকে দেখানো হয়, দূরে এক ব্যক্তি কয়েকজনের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে। আসলে সবই ছিল সাজানো। টাকার দাতা ও গ্রহীতা সবাই চক্রের সদস্য। তবে রুনার তা জানার কথা নয়। এ পর্যায়ে সাহিদা বলে, 'আপনের গলায়-কানে সোনার জিনিস দেখলে তো জাকাত দিব না। আপনি ওইগুলা ভ্যানিটি ব্যাগে ভইরা ফেলেন। মোবাইলটাও রাখেন।' ভুক্তভোগী তার পরামর্শে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে গহনা ও ফোন রাখেন। শেষ ধাপে তাকে বলা হয়, 'ব্যাগটা আমার কাছে রাইখা আপনে টাকাটা লইয়া আসেন। ভ্যানিটি ব্যাগ লইয়া জাকাত চাইতে গেলে দিত না।' ব্যস, রুনা ব্যাগ রেখে চক্রের দুই পুরুষ সদস্যের সঙ্গে জাকাত আনতে যান। তাকে বিদ্যুৎ অফিস চত্বরে নিয়ে গিয়ে প্রতারকরা কৌশলে সটকে পড়ে।

লালবাগ থানার ওসি এমএম মুর্শেদ সমকালকে বলেন, লালবাগ ছাড়াও রাজধানীর নিউমার্কেট, বাড্ডা, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর, ধলপুর, কেরানীগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকায় এই প্রতারকরা সক্রিয়। তারা একই কৌশলে আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়েছে। তাঁতীবাজারের অসাধু কয়েকজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীও এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত। তারা প্রতারকদের হাতিয়ে নেওয়া স্বর্ণ কম দামে কিনে নেয়।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জ্যোতির্ময় মল্লিক সমকালকে জানান, এই চক্রের অনেকের বিরুদ্ধেই হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। তাদের আরও তিন সদস্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা এর আগেই গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

আরও পড়ুন

×