গুজবের হুইসপার তত্ত্ব ও করোনা
প্রফেসর ড. ইকবাল হোছাইন
প্রফেসর ড. ইকবাল হোছাইন
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২০ | ০৪:৪৬ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
গুজব এখন আমাদের সংস্কৃতির শক্তিশালী অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্বের বড় বড় অঘটন গুজব তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এতই গুজব ছড়ানো হয়েছে যে, প্রখ্যাত সাংবাদিক ফ্রেন্স সিউনি বুস্টন হেরাল্ড পত্রিকায় নিয়মিত রিউমার ক্লিনিক নামে একটি কলাম লিখতেন। কলামের ওপর ভিত্তি করে রবার্ট এইচ ক্লে ১৯৪৪ সালে 'এ সাইকোলজি অব রিউমার' নামে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন।
সব গবেষণাকে মাড়িয়ে মনোবিজ্ঞানী লয়েলের গবেষণা সবার ওপরে উঠে আসে। তিনি গবেষণা করে বের করেন, সমাজের বিধিবদ্ধ নিয়মের বিপরীতে রাজনৈতিক গুজব খুবই কার্যকরী। এ বিষয়টি অ্যারিস্টটলের রাজনৈতিক তত্ত্বের পর থেকেই পরিস্টম্ফুট হচ্ছে, বর্তমানে যা করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) চেয়েও মহামারি আকার ধারণ করেছে।
গুজবের বৈজ্ঞানিক সামাজিক ও মানসিক কার্যকারণ বোঝাতে চায়নিজ হুইসপার পদ্ধতিটি সারাবিশ্বে বিভিন্ন নামে জনপ্রিয় হয়েছে। গুজবের প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার এ উদাহরণটি না দিয়ে পারলাম না। চায়নিজ হুইসপার, যা নর্থ আমেরিকায় টেলিফোন গেম নামে ডাকা হয়। খেলাটি সারাবিশ্বেই মোটামুটি এ রকম। প্রথম প্লেয়ার একটি সংবাদ (যে কোনো বিষয়ে) তার পাশের দ্বিতীয়জনের কানে কানে নির্দিষ্ট শব্দের মাধ্যমে বলবে। দ্বিতীয় জন তৃতীয়জনকে একই সংবাদ সরবরাহ করবে। এভাবে সংবাদটি যখন সর্বশেষ খেলোয়াড়ের কাছে পৌঁছবে তখন সে গ্রুপের সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরটি শাব্দিকভাবে ঘোষণা দেবে। অতঃপর প্রথম খেলোয়াড় মূল সংবাদের সঙ্গে (যা প্রথম খেলোয়াড় পাস করেছিল) সর্বশেষ সংবাদের বিকৃতির মাত্রা বিশ্নেষণ করবে এবং সংবাদের বিকৃতির মাত্রা বিশ্নেষণ করবে।
সংবাদ সরবরাহের তাৎক্ষণিক বিকৃতি খেলায় অংশগ্রহণকারীদের আনন্দিত করে, যাকে হিউমেরাস অ্যাফেক্ট বলে বিশ্নেষকরা উল্লেখ করেছেন। কিউমুলেটিভ ইররের এ খেলায় দেখানো হয়েছে, কীভাবে খবর মৌলিকত্ব হারিয়ে বিকৃতির মাধ্যমে গুজবে রূপান্তরিত হয়। কেন এটি ঘটে? সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন, সংবাদ সংগ্রহ, গ্রহণ ও বিতরণ) সময়ে উদ্বেগ, অস্থিরতা, অসচেতনতা এবং সংশ্নিষ্ট বিষয়ে জানার স্বল্পতাই মূলত মেসেজ বা সংবাদ বিকৃতির অন্যতম কারণ। এ বিকৃতিই দ্রুত গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ বিকৃতির মাধ্যমে গুজব ছড়ানোবিষয়ক জ্ঞানকে সহজে বোঝানোর এ চায়নিজ পদ্ধতি সারাবিশ্বে এতই জনপ্রিয় হয়েছে যে, প্রায় প্রতিটি দেশ নিজেদের মতো এ খেলার নাম দিয়েছে। ফ্রান্সে এ খেলাকে টেলিফোন ফ্যান, মালয়েশিয়ায় টেলিফোন রোসাক এবং পোল্যান্ডে একে এ কোন টেলিফোন বলে ডাকা হয়।
রাজতান্ত্রিক বিশ্বে এক সময় রাজা-রানীকে সম্মানের দিক থেকে সীমাহীন উচ্চতায় ভাবা হতো। সমাজের শিক্ষিত শ্রেণি রাজপরিবারে কী হচ্ছে না হচ্ছে, খবর ও গুজবের সমন্বয়ে বিভিন্ন মুখরোচক খবর তৈরি করত আর সাধারণ প্রজারা এগুলো অনেকটা স্বর্গীয় বাণীর মতো মনোমুগ্ধকরের মতো গিলত। মানুষ হিসেবে অন্যরাও যে সংবাদের উপজীব্য হতে পারে, তা কল্পনাই ছিল না। ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের সংবাদের প্রভাব ব্রিটিশদের মাঝে এখানও একই প্রভাব বলয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ ধারার তথ্য তৈরি ও বিতরণের ধারণা ফরাসি বিপ্লব ও শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে অনেকটাই ভেঙে যায়। আর ৭ম শতাব্দীর সেক্যুলারিজম বিপ্লব চার্চকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রিত সংবাদের ব্যুহ ভেদ করেছিল। এ সময় চার্চের পাদ্রিদের অত্যাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তারা ইচ্ছামতো মানুষদের স্বর্গ বা নরকের সার্টিফিকেট প্রদান শুরু করেছিল। আর ধর্মের নামে সামাজিক অত্যাচার তো ছিলই। মূলত নিজেদের স্বার্থ ও প্রয়োজনে চার্চ নেতারা ও রাজারা যে সংবাদ সমাজে প্রচার করত, তা-ই পরবর্তী সংবাদ আসার আগ পর্যন্ত সংবাদ ও গুজব আকারে সমাজে ঘোরাফেরা করত।
শিল্প বিপ্লবের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর বলয়ে ইহুদিরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও প্রচার মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নিয়ে নেয়। সে সময় থেকেই জাতিগত স্বার্থে তারা সংবাদে সত্য ও মিথ্যার সংযোগের প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়, যা বিভিন্ন সময় গুজব আকারে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ১৮৯৭ সালে হাঙ্গেরিয়ান সাংবাদিক থিওডর হারজেল (১৮৬০-১৯০৪) জায়োনিজম মুভমেন্ট শুরু হলে তা মহামারি আকার ধারণ করে, যা এখনও অব্যাহত।
বর্তমান যুগকে তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ বলা হয়। এ যুগে তথ্য গোপন করা খুবই কঠিন। অনেকে সোশ্যাল মিডিয়াকে গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যমে পরিণত করেছে। বর্তমানে চলতে থাকা প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিয়ে গুজবের যে রমরমা বাজার তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে মুনাফালোভী অসৎ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নামধারী কিছু ধর্মব্যবসায়ীও যোগ দিয়েছেন। এসব ধর্মব্যবসায়ী ধর্মের অপব্যাখ্যা এমনভাবে করেছেন- এ ভাইরাস ইহুদি-নাসারাদের খতম করতে এসেছে। এ ভাইরাসে মুসলমানদের কিছু হবে না। বিষয়টি সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে বদ্ধমূল করে দিয়েছে। অনেক যোগ্য আলেম অবশ্য সমাজহিতৈষী কাজ করছেন।
উদ্ভট কথার কারণে যদি করোনাভাইরাস 'কমিউনিটি ট্রান্সফার' শুরু হয় তাহলে মানব বিপর্যয় কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে, একবার কি আমরা চিন্তা করেছি? এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণে সরকারের দায়িত্বটা একটু বেশি। কিন্তু দেশে করোনা রোগী নেই বা আর বাড়ছে না- এসব কারণে আইইডিসিআরের দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা বিশ্বস্ততার জায়গাটি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কেননা, তদের বিবৃতি, দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির বিড়ম্বনা আর মৃতের সংখ্যার মধ্যে গুজবের গন্ধ ছড়াতেই থাকবে যদি সরকার স্বচ্ছ ও পরিস্কার বিবৃতির মাধ্যমে জনগণকে সঠিক তথ্যটি সরবরাহ না করে। এ জন্য সরকারকে সঠিক তথ্যটি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। এ মুহূর্তে সঠিত তথ্য নিশ্চিত করে গুজব নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি।
লেখক: অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি
