ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

শিক্ষাব্যবস্থা

ট্যাব নয়, চাই শিক্ষকের দক্ষতা উন্নয়ন

ট্যাব নয়, চাই শিক্ষকের দক্ষতা উন্নয়ন
×

এই উদ্যোগে শিক্ষককে যেন পেশাগত সত্তা হিসেবে নয়, বরং ডিভাইস পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মোশাররফ তানসেন 

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ২১:৩৪

বাংলাদেশ সরকারের ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগটি শুনতে আধুনিক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং আকর্ষণীয়-সুলভ মনে হতে পারে। শুনলেই ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, ক্ষমতায়িত শিক্ষক এবং একুশ শতকের শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্রুত অগ্রগতির ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু আকর্ষণীয় এই স্লোগানের আড়ালে রয়েছে একটি উদ্বেগজনক নীতিগত ধারণা– শিক্ষকের হাতে একটি ডিভাইস তুলে দিলেই যেন শিক্ষার রূপান্তর ঘটবে। বাস্তবতা তা নয়। প্রযুক্তি শিক্ষায় সহায়তা করতে পারে কিন্তু প্রযুক্তি একা কোনো দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থাকে সুস্থ করে তুলতে পারে না। গভীর কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ শেষ পর্যন্ত ব্যয়বহুল আরেকটি প্রতীকী কর্মসূচিতে পরিণত হতে পারে, যাকে ভুল করে উন্নয়ন বলা হবে।

বাংলাদেশে এর আগেও এমন প্রবণতা দেখা গেছে। শিক্ষানীতি প্রায়ই দৃশ্যমান উপকরণের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে কিন্তু অর্থবহ ফলাফলের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। ভবন নির্মিত হয়েছে, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি; পাঠ্যবই বিতরণ হয়েছে, কিন্তু পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তন আসেনি; ডিভাইস কেনা হয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষণ, মেরামত বা শ্রেণিকক্ষে কার্যকর ব্যবহারের টেকসই ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। শিক্ষকের হাতে একটি ট্যাব হয়তো সরকারি প্রতিবেদনের জন্য চমৎকার ছবি তৈরি করতে পারে কিন্তু ছবি দিয়ে সাক্ষরতা, গণিত দক্ষতা বা বিশ্লেষণমূলক চিন্তাশক্তি বাড়ে না।

প্রথম সমস্যা ধারণাগত। এই উদ্যোগে শিক্ষককে যেন পেশাগত সত্তা হিসেবে নয়, বরং ডিভাইস পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। অথচ শ্রেণিকক্ষের মান নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা হার্ডওয়্যারের নয়; শিক্ষকের জ্ঞান, প্রেরণা, বিষয় দক্ষতা, পাঠদান দক্ষতা এবং পেশাগত সহায়তার। দুর্বল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক ট্যাব পেলেও দুর্বলই থাকবেন। আবার ভালোভাবে প্রস্তুত, আত্মবিশ্বাসী একজন শিক্ষক ট্যাব ছাড়াও অনেক বেশি কিছু অর্জন করতে পারেন। 

দ্বিতীয়ত, এই নীতিতে কোনো কিছুর প্রাপ্তিকেই ব্যবহার ধরে নেওয়া হচ্ছে। কোনো ডিভাইস হাতে থাকলেই তা অর্থবহভাবে শিক্ষায় ব্যবহৃত হবে– এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বের বহু প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসূচিতে দেখা গেছে, যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকলে এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা উপেক্ষা করলে ডিভাইস প্রায়ই অপ্রয়োজনীয়, অপব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। আমাদের শিক্ষকরা ইতোমধ্যে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা, প্রশাসনিক চাপ, পরীক্ষা-কেন্দ্রিকতা এবং প্রস্তুতির জন্য সীমিত সময় এসব সমস্যার মধ্য দিয়েই কাজ করেন। একটি ট্যাব তাদের জন্য হঠাৎ করে সময়, আত্মবিশ্বাস বা শিক্ষণ-কৌশল তৈরি করে দেবে না। ধারাবাহিক সহায়তা, মানসম্মত কনটেন্ট এবং বাস্তবভিত্তিক কৌশল ছাড়া ট্যাবটি শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল নোটবুক, অতিরিক্ত বোঝা বা মাঝে মাঝে উপস্থাপনার পর্দা হয়ে যেতে পারে।

তৃতীয়ত, এই উদ্যোগ বৈষম্য কমানোর বদলে বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষা-বাস্তবতা গভীরভাবে অসম। শহুরে বিদ্যালয় ও তুলনামূলক সচ্ছল প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো ডিজিটাল সুবিধা বেশি কাজে লাগাতে পারবে, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রাম, চর, পাহাড়ি অঞ্চল ও হাওরের বিদ্যালয়ে এখনও বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা অনিশ্চিত। বহু বিদ্যালয়ে এখন পর্যাপ্ত আসবাব নেই, ফ্যান নেই, ব্যবহারোপযোগী টয়লেট নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, গ্রন্থাগার নেই। এমন বাস্তবতায় ট্যাব বিতরণ অনেক সময় বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। গরম, গাদাগাদি শ্রেণিকক্ষে বসা একটি শিশুর জন্য শিক্ষক ট্যাব পেয়েছেন– এ তথ্যের শিক্ষামূল্য খুব সামান্য।

চতুর্থত, রক্ষণাবেক্ষণ, যা অনেক সরকারি প্রযুক্তি প্রকল্পের একটি উপেক্ষিত দিক। ট্যাব ভাঙে, ব্যাটারি নষ্ট হয়, চার্জার হারায়, সফটওয়্যার পুরোনো হয়ে যায়, আপডেট লাগে। চুরি বা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। কেনাকাটা রাজনৈতিক আলোচনায় আসে, রক্ষণাবেক্ষণ আসে না। যদি দীর্ঘমেয়াদি মেরামত বা বদলের ব্যবস্থা, ওয়ারেন্টি, নিরাপদ সংরক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত না করা হয়, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই হাজার হাজার অকেজো ট্যাবের স্তূপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ অতীত সাফল্যের স্মারক হিসেবে নষ্ট ট্যাবের গুদাম নিশ্চয়ই চাইবে না।

পঞ্চমত, প্রশ্ন হলো, এই ট্যাব দিয়ে শিক্ষকরা আসলে কী করবেন? যদি উত্তর হয় শুধু পিডিএফ বই নামানো বা অফিসিয়াল নির্দেশনা পাওয়া, তবে শিক্ষাগত লাভ সীমিত হয়ে পড়বে। কার্যকর শিক্ষা-প্রযুক্তির জন্য দরকার মানসম্মত বাংলা কনটেন্ট, পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপকরণ, মূল্যায়ন সহায়ক উপাদান, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সরঞ্জাম এবং সক্রিয় শেখাকে উৎসাহিত করে এমন রিসোর্স। শক্তিশালী কনটেন্ট ভিত্তি ছাড়া ট্যাব হবে একটি খালি পাত্র মাত্র।

ষষ্ঠত, উদ্ভাবনের নামে প্রশাসনিক নজরদারির ঝুঁকি আছে। অনেক ব্যবস্থায় শিক্ষকদের দেওয়া ডিভাইস ধীরে ধীরে হাজিরা তদারকি, প্রতিবেদন পাঠানো, তথ্য আপলোড বা দাপ্তরিক জবাবদিহির যন্ত্রে পরিণত হয়। শিক্ষক যদি পাঠ পরিকল্পনার চেয়ে বেশি সময় ফরম পূরণে ব্যয় করেন, তবে এই ট্যাব শিক্ষার চেয়ে শিক্ষকদের চাপই বাড়াবে। শিক্ষকদের দরকার আস্থা ও পেশাগত স্বাধীনতা, আরেকটি আমলাতান্ত্রিক নজরদারি নয়।

সপ্তমত, এই উদ্যোগ সীমিত সম্পদকে জরুরি ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিতে পারে। বাংলাদেশে এখনও মৌলিক শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও যথাযথভাবে পড়তে বা গণনা করতে পারে না। শিক্ষকদের শূন্য পদ রয়েছে। শিক্ষকদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন অসম। প্রারম্ভিক শ্রেণির শেখা দুর্বল। বিদ্যালয়-নেতৃত্ব পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মানসিক সুস্থতা অবহেলিত। গ্রন্থাগার ও ল্যাব সুবিধা সীমিত। তাই প্রতিটি টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। ট্যাব উপকারী কিনা সেটা নয়, প্রশ্ন হওয়া উচিত– এটাই সীমিত অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার কিনা?

তা ছাড়া বিশ্বজুড়ে এখন অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা, মনোযোগ বিচ্ছিন্নতা, গভীর পাঠাভ্যাসের ক্ষীয়মানতা নিয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে। প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে শিখন বাড়ে, ভুলভাবে ব্যবহার করলে মনোযোগ ভেঙে দেয়। যদি ট্যাবের উপস্থিতি ‘স্ক্রিন-ফার্স্ট’ শিক্ষাদানকে উৎসাহিত করে, তবে বিশ্বের অন্যরা যেসব সমস্যা থেকে বেরোতে চাইছে, বাংলাদেশ তা কেবল আমদানি করবে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ শিক্ষকতার আবেগীয় বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। শিক্ষক কেবল কর্মসম্পাদক নন, তিনি মানুষও। তাঁর দরকার মর্যাদা, ন্যায্য কর্মভার, সময়মতো পদোন্নতি, সহায়ক তদারকি ও সামাজিক স্বীকৃতি। শিক্ষক যখন নিজেকে অবহেলিত, কম মূল্যায়িত বা অতিরিক্ত চাপে মনে করেন, তখন একটি ট্যাব প্রতীকী উপহার বলে মনে হতে পারে। যেন বলা হচ্ছে– এই নিন যন্ত্র, এখন ভালো ফল দিন। কিন্তু বলা হচ্ছে না– আমরা আপনার দক্ষতাকে মূল্য দিই, আপনার বিকাশে বিনিয়োগ করব, আপনার কাজের পরিবেশ উন্নত করব।

এসব সমালোচনার অর্থ এই নয় যে বিদ্যালয়ে প্রযুক্তি দরকার নেই। বাংলাদেশকে ডিজিটাল সাক্ষরতা, আধুনিক সরঞ্জাম ও স্মার্ট ব্যবস্থার দিকে এগোতেই হবে। শিক্ষকরা পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ ও বিশেষায়িত শিক্ষণ কাজে প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হতে পারেন। কিন্তু প্রযুক্তি হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক, প্রমাণনির্ভর এবং প্রয়োজনকেন্দ্রিক। সবার হাতে এক ডিভাইস তুলে দেওয়া অনেক সময় প্রজ্ঞার বদলে একদেশদর্শিতাকে প্রাধান্য দেয়।

বরং ভালো বিকল্প হতে পারে শিক্ষক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উচ্চমানের ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা, বিদ্যালয়-নেতৃত্ব উন্নয়ন, পাঠদানের উপকরণ, গ্রন্থাগার, ল্যাব, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। যেখানে সত্যিকারের প্রয়োজন আছে, সেখানে ধাপে ধাপে প্রযুক্তি দেওয়া যেতে পারে। আগে শিক্ষককে শক্তিশালী করা, পরে ডিভাইস দেওয়া– এটিই বেশি টেকসই পথ। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো ট্যাব নয়, একজন দক্ষ ও অনুপ্রাণিত শিক্ষকই শ্রেণিকক্ষ বদলে দিতে পারেন।

মোশাররফ তানসেন: পিএইচডি গবেষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ, মালালা ফান্ড
 

আরও পড়ুন

×