ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

শিশুর বিকাশ

প্রাথমিক শিক্ষার রূপান্তরে শিক্ষকদের জন্য বিনিয়োগ

প্রাথমিক শিক্ষার রূপান্তরে শিক্ষকদের জন্য বিনিয়োগ
×

নুরুল্লাহ আল জাকী

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ১১:৩৬ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ | ১১:৪৬

একটি শিশুর জীবনের প্রথম আট বছর তার ভবিষ্যৎ ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়েই মস্তিষ্কের ৯০ শতাংশ বিকাশ ঘটে। তাই এই বয়সে শিশু কী শিখছে, কীভাবে শিখছে এবং কার কাছ থেকে শিখছে, তার ওপর নির্ভর করে আগামী দিনের একটি পুরো প্রজন্মের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গঠন। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সময়োপযোগী সত্য তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেছেন, শিশুর প্রাথমিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষা পদ্ধতি থেকে মুখস্থনির্ভরতা দূর করতে হবে এবং শিক্ষকদের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে। 
এই বক্তব্যকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন কৌশলের ওপর গভীরভাবে আলো ফেলা জরুরি বলে মনে করি।
আমাদের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলকেন্দ্রিক এক অন্ধ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চার-পাঁচ বছরের একটা শিশুকে আমরা শুরুতেই একগাদা বইয়ের বোঝা কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছি এবং মুখস্থ করার এক নির্মম চক্রে ঠেলে দিচ্ছি। 

অথচ এই বয়সে শিশুর শেখার কথা ছিল খেলার ছলে, চারপাশের প্রকৃতি দেখে, কৌতূহলের হাত ধরে। আমরা শিশুর চিন্তাশক্তি ও কৌতূহলকে শুরুতেই গলা টিপে হত্যা করছি। 
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুর যোগাযোগ দক্ষতা, সামাজিকীকরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; পরীক্ষার খাতায় কে কত নম্বর পেল তা বিচার করা নয়।

এই রূপান্তরটি যদি আমরা সত্যিই ঘটাতে চাই, তবে সবার আগে নজর দিতে হবে শিক্ষকের ওপর। কারণ, ক্লাসরুমের চার দেয়ালের ভেতর শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গিই নির্ধারণ করে শিশুর শিখন পরিবেশ কেমন হবে। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কিছু প্রথাগত প্রশিক্ষণ চালু থাকলেও, তা কি বর্তমান যুগের উপযোগী? শিশুর মনস্তত্ত্ব , ইনক্লুসিভ এডুকেশন (অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা) এবং আনন্দময় শিখন  সম্পর্কে আমাদের শিক্ষকেরা কতটা সচেতন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
প্রাক-প্রাথমিক স্তরে একজন শিক্ষকের ভূমিকা কোন প্রথাগত জ্ঞানদাতার মতো হওয়া উচিত নয়, বরং তার ভূমিকা হবে একজন সহায়তাকারী বা ফেসিলিটেটরের। তিনি শিশুকে প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করবেন, আনন্দময় পরিবেশে শেখাবেন। আর এই মানসিকতা তৈরীর জন্য শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, আধুনিক এবং সম্পূর্ণ প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ। নামমাত্র কয়েকদিনের কর্মশালা দিয়ে এই গুণগত পরিবর্তন আনা অসম্ভব।

তবে কেবল প্রশিক্ষণের মডিউল বদলালেই সংকটের সমাধান হবে না। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথা বলেছেন, তার সঠিক দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। আমাদের দেশে বিনিয়োগ বলতে প্রায়শই শুধু বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বোঝানো হয়। কিন্তু প্রকৃত বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানবসম্পদে। প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা এমন এক স্তরে নিয়ে যেতে হবে, যাতে দেশের সেরা মেধাবীরা এই পেশায় আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

পাশাপাশি, আরেকটি বড় সংকট হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত। একটি ক্লাসে যদি ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু ঠাসাঠাসি করে বসে থাকে, তবে পৃথিবীর কোনো আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের পক্ষেই প্রতিটি শিশুর ব্যক্তিগত বিকাশে আলাদা করে নজর দেওয়া সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই অনুপাত ১:২০ বা ১:২৫-এ নামিয়ে আনা দরকার।
সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, শিশুর শৈশবকালীন বিকাশ কেবল বিদ্যালয় বা সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এর জন্য প্রয়োজন 'হোম-স্কুল লিংকেজ' বা পরিবার ও বিদ্যালয়ের যৌথ অংশগ্রহণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়তো আমরা চাপমুক্ত পরিবেশ তৈরি করলাম, কিন্তু ঘরে ফেরার পর মা-বাবা যদি আবার শিশুকে জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য মানসিক চাপে রাখেন, তবে পুরো উদ্যোগই ভেস্তে যাবে। তাই অভিভাবকদের মাঝেও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

আমরা যদি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে হবে আজকের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। মুখস্থবিদ্যার শিকল ভেঙে আমাদের শিশুদের মুক্ত চিন্তার আকাশ দিতে হবে। আর সেই আকাশের যোগ্য সারথি হিসেবে শিক্ষকদের গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্র এই বিনিয়োগে যত দ্রুত এগিয়ে আসবে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ততটাই সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ হবে।

নুরুল্লাহ আল জাকী: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

 

আরও পড়ুন

×