সমকালীন প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরে কূটনীতির নতুন বার্তা
রাজু আলীম
রাজু আলীম
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ১৯:৫৬
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে ঘিরে দেশে-বিদেশে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি সফরকে কেন্দ্র করে নয়; বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ অভিমুখ, অর্থনৈতিক কূটনীতির অগ্রাধিকার এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনো সরকারপ্রধানের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর সব সময়ই প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। কারণ সেই সফর অনেক সময় আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের চেয়েও বেশি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, নতুন সরকার কোন সম্পর্ককে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান কোথায় দেখতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া ও চীনকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া নিছক কাকতালীয় নয়। বরং এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশও সফরটিকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখছেন। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তারেক রহমানের এই সফরের প্রধান লক্ষ্য বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে এটি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বেইজিং সফরকে তারা কেবল একটি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখছে না। বরং এটিকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন পর্যায়ে উত্তরণের সম্ভাবনা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যেই জানিয়েছে, তারা এই সফরকে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ বৃদ্ধি, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের উচ্চমানের সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক সমন্বয় জোরদারের সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। চীন কি বাংলাদেশের নতুন সরকারের মধ্যে এমন একটি সুযোগ দেখছে, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব? উত্তর সম্ভবত হ্যাঁ। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া ক্রমেই চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্ব বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নয়; বরং একটি কৌশলগত ভূখণ্ড।
তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভারসাম্য রক্ষা। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূলনীতি ছিল ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। বাস্তবতা হচ্ছে, আজকের বিশ্বে এই নীতিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। কারণ চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হলেও ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। আবার যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারগুলোর একটি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণে তারেক রহমানের চীন সফরকে যদি কেউ সরাসরি ‘চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, তাহলে সেটি অতিসরলীকরণ হবে। বরং এটিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি বাস্তববাদী প্রয়াস হিসেবে দেখা অধিকতর যৌক্তিক। কারণ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গভীরভাবে আন্তঃনির্ভরশীল। গত দেড় দশকে পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নসহ বহু প্রকল্পে চীনের ভূমিকা দৃশ্যমান। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধাও দিয়েছে।
কিন্তু এই সম্পর্কের আরেকটি দিকও রয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক গভীর হলেও তা ভারসাম্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশ আসে চীন থেকে, অথচ রপ্তানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে বড় বাণিজ্যঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই নতুন করে সম্পর্ক সম্প্রসারণের অর্থ হওয়া উচিত কেবল আরও ঋণ বা অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এখানেই বর্তমান সফরের গুরুত্ব। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে গ্রিন এনার্জি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, প্রযুক্তি, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করছে। চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
আসলে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো প্রতিযোগিতামূলক কূটনীতি। অর্থাৎ, চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেয়। কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অপ্রয়োজনীয় বৈরিতাও ক্ষতিকর।
মালয়েশিয়া সফরের দিকটি এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের মতো পরাশক্তির পাশাপাশি তারেক রহমান প্রথম সফরে এমন একটি দেশকে গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স এবং মানবসম্পদ সহযোগিতার বাস্তব স্বার্থ জড়িত। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর আলোচনা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা এবং হালাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের উষ্ণ কূটনৈতিক বার্তাও উপেক্ষা করার মতো নয়। এটি দেখায়, নতুন সরকার মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতিও আগ্রহী। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতির পরিসর শুধু পূর্ব এশিয়া নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই সফরকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেকাংশে প্রতিক্রিয়াশীল ছিল—অর্থাৎ বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানের আলোকে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণের প্রবণতা দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের পথে থাকা একটি দেশের জন্য প্রয়োজন আরও আত্মবিশ্বাসী ও স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি। তারেক রহমানের চীন সফরকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যেতে পারে। কারণ বিশ্বব্যবস্থা এখন আর একক শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় রূপান্তর করা।
চীনের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বেইজিং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যে নতুন অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ফলে চীনের আগ্রহ শুধু বাজার বা অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আঞ্চলিক সংযোগ, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ। বিদেশি বিনিয়োগ তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়াবে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করবে এবং রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণ করবে। অতীতে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সেগুলোর কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন চুক্তি ও সমঝোতাগুলোর ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে এই অধ্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে সফরের সময় স্বাক্ষরিত চুক্তির সংখ্যার ওপর নয়, বরং সেগুলোর বাস্তব ফলাফলের ওপর। চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন গতি যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে অবদান রাখে, তাহলে এই সফর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়, তবে এটি আর দশটি আলোচিত বিদেশ সফরের মতোই সময়ের সঙ্গে গুরুত্ব হারাবে। তাই এখন নজর থাকা উচিত সফরের কূটনৈতিক আড়ম্বরের দিকে নয়, বরং এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ফলাফলের দিকে। বাংলাদেশের জনগণের কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—এই কূটনীতি কি দেশের উন্নয়নকে আরও দ্রুত ও টেকসই করতে পারবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এই সফরের প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্য।
রাজু আলীম: কবি ও সাংবাদিক
