জাতীয় সংলাপে বক্তারা
প্রস্তাবিত ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ অবিলম্বে প্রণয়নের দাবি
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ২০:৩১ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ | ২০:৪৬
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সংবিধান অনুযায়ী অবিলম্বে একটি সমন্বিত প্রস্তাবিত ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে। বুধবার রাজধানীর বনানীর এক হোটেলে আয়োজিত জাতীয় সংলাপে এই দাবি করা হয়।
নাগরিক উদ্যোগ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম) যৌথ উদ্যোগে এই বৈষম্য বিলোপ আইন বিষয়ক সংলাপের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক উদ্যোগের চেয়ারপারসন ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৈষম্যের শিকার মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো প্রস্তাবিত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমাদের সমাজটাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও শ্রদ্ধাশীল করতে চাইলে দ্রুত এই আইনটি প্রণয়ন করা দরকার।
সংলাপে সূচনা বক্তব্য প্রদান ও সঞ্চালনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী।
জাতীয় সংলাপে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্যের শিকার প্রায় ৭৫ লাখ দলিত জনগোষ্ঠী। এ ছাড়া লৈঙ্গিক বৈচিত্র্য, প্রতিবন্ধিতা, ধর্মীয়, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থানগত কারণেও একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনগোষ্ঠী সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। আমাদের সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মগত কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা যাবে না।
বৈষম্য বিলোপ আইনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের যে প্রত্যয় নিয়ে জুলাই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তা বাস্তবায়ন এবং দেশে প্রতিনয়ত বৈষম্যের শিকার প্রায় ১ কোটির অধিক বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য লাঘবে এই আইন প্রণয়ন জরুরি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ। সংবিধানে বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন করা আবশ্যক।
ব্লাস্টের পরিচালক বরকত আলী বলেন, সমাজের সব জায়গাতেই বৈষম্য রয়ে গেছে। ভালো ভালো আইন তৈরি করা আছে, বইয়ের পাতায় বলাও আছে; কিন্তু বাস্তবায়নে অনেক অনীহা রয়েছে।
সংলাপের বক্তারা বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে অবিলম্বে এই শক্তিশালী, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈষম্যবিরোধী আইন দ্রুত প্রণয়ন করা দরকার; যাতে দেশের সব নাগরিক সমান সুরক্ষা, ন্যায়বিচার এবং সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারেন এবং একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
জাতীয় সংলাপের মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা আরও বলেন, টেকসই উন্নয়নের মূলনীতি ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’। অর্থাৎ রাষ্ট্রে বসবাসকারী সব মানুষ সমমর্যাদাসম্পন্ন হবে এবং সমান সুযোগ লাভ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেশে বর্তমানে বসবাসরত ১ কোটি ৫০ লাখের অধিক দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষ কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার।
তারা বলেন, ২০১২ সাল থেকে আমরা বৈষম্য বিলোপ আইনটি প্রণয়নের কথা বলে আসছি। ওই সময়কার আইনমন্ত্রী তিন মাসের মধ্যে আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা আজও করা হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যেকটি দেশে প্রোটেকশন আইন রয়েছে, শুধুমাত্র আমাদের দেশ ছাড়া। আমাদের দেশে বৈষম্যের শিকার ব্যক্তিরা প্রতিকার পেতে কোথায় যাবেন?
আলোচনায় আরও অংশ নেন আইন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব নয়ন বড়াল, সিএসআইডির নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহিরুল আলম, ইফতেখার মাহমুদ, অ্যাডভোকেট উৎপল বিশ্বাস, মশিউর রহমান, লাবনী রানী প্রমুখ।
