ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

নদ-নদী দূষণ

ভাসে না কাগজের নৌকা 

ভাসে না কাগজের নৌকা 
×

বিভূতি ভূষণ মিত্র 

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ১৪:১৬

সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় নদের দখল ও দূষণ রোধে এবং পরিবেশ সুরক্ষার দাবিতে মানববন্ধন ও নদ-নদী দূষনের প্রতিবাদে দূষিত পানিতে নৌকা ভাসানোর কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন। তারা লবলং নদের পাড়ে এই কর্মসূচী পালন করে। লবলং নদটি ময়মনসিংহের ভালুকার খিরু নদী থেকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা হয়ে তুরাগ নদীতে এসে যুক্ত হয়েছে।
২০২৫ সালে লবলং নদ নিয়ে একটি সেমিনারে বলা হয়, গাজীপুরের লবলং নদের তীরবর্তী প্রায় ১৩৫টি বর্জ্য উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে প্রতিদিন নিয়মিত ১ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য নদীতে নির্গত হয়। এছাড়া সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় সমন্বিত ডাম্পিং স্টেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় শিল্প ও গৃহস্থালির বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে এক সময়ের লবলং নদটি বর্তমানে লবলং খালে পরিণত হয়েছে। সেই খালও এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা মতে, এতে ১৫টি পয়ঃনিস্কাশন লাইন এবং ১১টি ডাম্পিং স্টেশন গড়ে উঠেছে। সরকারি খালে তৈরি করা হয়েছে তিনটি কালভার্ট। যে বেআইনি। কালভার্টের কারণে জমিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। একটি তথ্য মতে এই জলাবদ্ধতার কারণে ৪০০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে পারেননি কৃষকেরা। এছাড়া তীরগুলোও দখল হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করার কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদ। 
শুধু এই নদ নয়, গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন ডাইং কারাখানার বর্জ্য শুধু নদী নয়, সেখানকার খাল ডোবা-নালাও বিষাক্ত হচ্ছে। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডাইং কারখানা। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যারা এই নদীতে গোসল করে তাদের নানা ধরনের চর্ম রোগ হচ্ছে। পানি তো ব্যবহারই করা যাচ্ছে না। নদীটিও এখন মৃতপ্রায়। একই দশা বুড়িগঙ্গা নদীরও। আর এর আশেপাশের খালগুলো অস্তিত্ব তো খুঁজেই পাওয়া যায় না। নদীটি এতটাই দূষিত যে এর পানি কালো রঙ ধারন করে আছে। নরসিংদীর ব্রহ্মপুত্র নদীর অবস্থাও তাই। প্রভাবশালীদের দখল তো আছেই সাথে এখানেও শিল্প কারখানার বর্জ্য পদার্থ এসে পড়ছে নদীতে। ফলে নদীর জীববৈচিত্র্য তো বটেই পানি দূষিত হয়ে লাল ও কারছে বর্ণ ধারণ করেছে। এই পানি আর ফসল ফলানোর কাজে ব্যবহার করা যায় না। যদিও এখানে নদী পাড় রক্সা, অবৈধ দখলমুক্ত করা, কলকারখানায় ইটিপি ব্যবহার করা ইত্যাদি প্রকল্পনেয়া হয়েছে। কিন্তু এতে লাভ হয় নি। যে দখল ছিল তা আরও বেড়েছে। যে দূষণ ছিল তা আরও বেড়েছে। একটি গবেষণা তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর গড়ে ১০টি নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে। বর্তমানে বিপন্ন নদীর সংখ্যা ১৭৪টি। একটি তথ্য মতে ঢাকার চারদিকের নদীগুলোতে প্রতিদিন বর্জ্র জমা হয় ৪ হাজার ৫শ টন।  আর দূষণের কারণে বিলীন হয়ে যাওয়া নদীর সংখ্যা ২৫টি। বিগত ৫০ বছরে নদীপথ বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার। 
এছাড়া বাংলাদেশের ঢাকা শহরের অশেপাশের নদীগুলোতে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ চিত্র এসেছে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে। গবেষণায় সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিকের কণা পাওয়া গেছে টঙ্গী খালের পানিতে। এরপর পরই রয়েছে বালু নদ, এরপর বুড়িগঙ্গা নদী। এখানকার জলাশয়গুলোতে প্রতি ঘনমিটার পানিতে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে ৩৬ হাজার। বিশ্বে অনেক দেশের নদীর চেয়ে এর সংখ্যা অনেক বেশি। গ্রামের নদীগুলোতেও প্লাস্টিকের দূষণ হচ্ছে। সেখানে প্রতি ঘন মিটারে ১০০ থেকে ১৫০টি প্লাস্টিক কণা। গ্রামের চেয়ে শহরের নদীতে শতগুণ বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো মাছ খাচ্ছে। মাছ থেকে এসব প্লাস্টিক কণা যাচ্ছে আমাদের রক্তে ও মায়ের দুধে। প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য মতে বাংলাদেশের নদী দখলদারের সংখ্যা ৪৬ হাজার ৭৪২ জন। জাতীয় নদী রক্ষা কমশিনের কাছে ঢাকার ৫টি নদীর ৯৫৯ জন দখলদারের নাম জমা পড়েছে। 
এক সময় লবলং নদের পানি কৃষি কাজে ব্যবহৃত হত। এই নদটির পানি প্রবাহ ফেরাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড খননও শুরু করেছিল। তবে আংশিক কাজের পরে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। আশা করি সরকার আবারও লবলংয়ের দিকে নজর দিবে। লবলংয়ের মত যে নদ-নদীগুলো শিল্প কারখানার দখল ও দূষণের বলি, তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে সরকার। স্বপ্ন দেখি, একটি দখলমুক্ত স্বচ্ছ সুন্দর নদীর জলে অনায়াসেই ভাসবে কাগজের নৌকা। 
 

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক

আরও পড়ুন

×