স্মরণ
মাটি ও মানুষের জন্য নিবেদিত ছিলেন মাহবুবল হক
মাহবুবল হক
আইনুন নাহার রেখা
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ২০:০০
১৯২৩ থেকে ১৯৭৪- ৫১ বছরের জীবনকাল। যার পুরোটাই ছিল মাটি ও মানুষের জন্য। ক্ষণজন্মা এমন একজন মানুষ ছিলেন মাহবুবল হক। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অনেক আগে থেকেই স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীনতার। রেলশ্রমিকের অধিকার আদায়ের বজ্রকণ্ঠ এভাবেই পৌঁছে গিয়েছিলেন জাতীয় রাজনীতির মহা অঙ্গনে।
পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বুকে দাঁড়িয়ে, ১৯৬৪ সালের ১৫ জুনেই অসীম সাহসে বলতে পেরেছিলেন ‘এদেশের মানুষকে কখনো দাবাইয়া রাখা যাইবেনা। অনন্যেপায় হইয়া জনগন বিদ্রোহের পথই বাছিয়া লইবে।’ সেই অনলবর্ষী বক্তা তাই পাকিস্তানের তৎকালীন স্বৈরশাসকের কাছে আতংক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, জনগন ভালবেসে ‘ব্ল্যাক টেরর’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
বাঙ্গালী জাতিসত্তার আন্দোলন- সংগ্রামে জনাব মাহবুবল হক ছিলেন অগ্রনায়ক। অকুতোভয় এই বীরপুরুষ কাছ থেকে সান্নিধ্য পেয়েছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানীসহ বরেণ্য দেশ নেতা প্রাজ্ঞজনদের। এই সান্নিধ্য তাঁর মেধাকে করেছিল অনেক বেশি শানিত। মাটি আর মানুয়ের জন্য কাজ করবার অদম্য তৃষ্ণা তাঁকে এদেশের সকল আন্দোলন সংগ্রামে বুক চিতিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছিল সন্দেহ নেই।
এভাবেই মাহবুবল হককে আমরা পেয়েছিলাম এদেশের শোষিত বঞ্চিত জনগনের পক্ষের কন্ঠ হিসেবে। বাবা-মায়ের ছোট্ট কনক তাঁর আলোয় উদ্ভাসিত করেছিলেন এদেশের রেলশ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল আন্দোলনকে। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব পন্থীরা হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা সংঘঠিত করে। সে সময় সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকার সকল বাংলা পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখার শিরোনাম হবে এক। সেই কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে মাহবুবল হক তাঁর দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় শিরোনাম লিখেন, ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও।’
রেল শ্রমিকের নেতা হিসেবে তিনি তাঁর পুরো সংগঠনিক শক্তিতে কাজে লাগিয়েছিলেন ১৯৫২ তে ভাষা- আন্দোলনে ঢাকার ছাত্র-মিছিলে গুলির প্রতিবাদে আন্দোলনমুখী হতে। ১৯৫২র ১১ জুলাই ২২ দফা দাবীর ভিত্তিতে তাঁর নেতৃত্বে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল রেলের চাকা।
১৯৫০ সাল থেকেই মূলত জাতীয় রাজনীতিতে মাহবুবল হকের অভিষেক ঘটে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি (কেএসপি) তে যোগ দিয়ে ১৯৫৪ তে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং পরাজিত হন। কিন্তু দমে যাননি। ১৯৬২ তে জাতীয় নির্বাচনে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে কুমিল্লা-নোয়াখালী এন-ই-৬৭ আসন থেকে জয়লাভ করেন।
এই সময়কালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসাবে অনলবর্ষী বক্তা হিসাবে খ্যাতিমান হয়ে উঠেন। ১৯৬৪ সালের ১৫ জুন বাজেট বক্তৃতার জবাবে দীর্ঘ সময় ধরে অগ্নিঝরা বক্তব্য দিয়েছিলেন। সত্য এই যে, এই অগ্নিপুরুষকে কোন দলীয় রাজনীতি ধারন করতে পারেনি। আজীবন একলা চলেছেন শুধু দেশের জনগনের জন্য অপার ভালোবাসা বুকে নিয়ে।
মাহবুবল হক এবং তাঁর মতো মানুষেরাই আমাদের সমাজ ও জাতীয় জীবনের ভিত্তিদলিল। ভিত্তিদলিল না থাকলে হাল দলের বা ইতিহাসের শুদ্ধতা ও সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাঁর মত ও পথের সহযোগী ছিলেন না যারা, তারাও এক বাক্যে স্বীকার করেছেন-বাংলাদেশের স্বাধিকারের প্রশ্নে আপোষহীন মাহবুবল হক ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক।
স্বার্থান্বেষী মানুষেরা তাকে কষ্ট তো কম দেয়নি। তাই তো তাঁর ইন্তেকালের পর সম্পাদকীয়তে এদেশের একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছিলেন ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তাঁকে দিতে এলে ফুল’।
সমাজে যখনই দুঃসময় আসে, সত্য-মিথ্যা, শুভ-অশুভর সংগ্রামে অন্যায় হয়ে উঠে পরাক্রমশালী, তখন দূর্জয় সাহস, অনন্য সততা, অটল দৃঢ়তা উঠে দাঁড়ান মাহবুবল হকের মতো সত্যনিষ্ঠ, ন্যায়নিষ্ঠ মানুষেরা। স্যার এডমন্ড বার্কের বাগ্মিতা, নেপোলিয়নের সাহস, উইস্টন চার্চিলের মনীষা, অলিভার ক্রমওয়েলের সংগঠনিক দক্ষতা, দ্যাগলের দৃঢ়তা, লিংকনের বিচক্ষণতা, গ্যারিবল্ডির দেশপ্রেম- নানামূখী সহজাত গুনাবলী নিয়ে অসামান্য কৃতিপুরুষ মাহবুবল হক এই উষর মাটিতে জন্মে ছিলেন বলেই প্রায় পুরোটা জীবনকালেই তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছে একের পর এক প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু সত্য যে কঠিন, কঠিনের ভালবাসিলাম, সে কখনো করেনা বঞ্চনা-এই নীতি থেকে তাঁকে কোন রক্ত চক্ষুই টলাতে পারেনি।
ঋণে আবদ্ধ করে গেছেন মাহবুবল হক এদেশকে, এদেশের মানুষকে। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। রেখে গেছেন সাংবাদিকতা, রাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলন, সংসদ চর্চায় অসংখ্য কর্মী, অনুরাগী, অনুসারী। এঁদের মধ্যে অনেকেই গৌরব, খ্যাতিতে স্বস্ব ক্ষেত্রে নেতৃত্বের শিখরে স্থান পেয়েছেন। এসবই তাঁর অসামান্য সাফল্য। নিজ নিজ অঙ্গনে এঁরাই একেকজন মাহবুবল হকের স্মৃতির মিনার হয়ে আছেন।
মাহবুবল হক স্মরণে পরিবার তাঁর জন্মস্থান ফেনী জেলার ফরহাদ নগর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছে মাহবুবল হক উচ্চ বিদ্যালয়। শিক্ষানুরাগী এই মানুষটির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে কৃতি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সাথে পরিবার তাঁর জীবন নিয়ে লেখা ‘মাহবুবল হক সময় ও জীবন’ গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে।
আজ ৫ জুন মৃত্যুবার্ষিকীতে বর্তমান প্রজন্মের কাছে আহবান থাকবে- মাহবুবল হককে পড়ুন। তাঁর মত অগ্নিশিখাকে জানতে হলে তাঁকে নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর মত ব্যক্তির সঠিক মূল্যায়ন হলে মানবিক মূল্যবোধে ঋদ্ধ গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা নিশ্চয়ই আরো সহজ হবে।
আইনুন নাহার রেখা: সাংবাদিক ও মাহবুবল হক এর কন্যা
