ফুটবল বিশ্বকাপ
বিশ্ববিদ্যালয়ে এলইডি পর্দা এবং শহরের উচ্ছ্বাস
মো. মেহেদী হাসান
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৫৭
রাত বাড়ছে। কুষ্টিয়া শহরের দোকানপাট একে একে বন্ধ হচ্ছে। দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নীরবতায়। কিন্তু শহরের একটি সড়কে তখন ঠিক উল্টো দৃশ্য।
মানুষ ছুটছে। কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ রিকশায়, কেউ হেঁটে। কারও গায়ে পছন্দের দেশের জার্সি, কারও হাতে সেদেশের পতাকা। ছোট্ট শিশুটি বাবার কাঁধে বসে আছে। তরুণদের হাতে বাঁশি। প্রবীণদের গন্তব্য একই দিকে।
বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে কুষ্টিয়ার লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে বিশাল এলইডি পর্দা। সেটাই তাদের গন্তব্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচার-প্রচারণার জন্য স্থাপন করা হয়েছিল এই পর্দাটি। শহরের মানষের অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্বকাপ ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো বড় পর্দায় দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচ দিয়ে শুরু হওয়ার পর, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই এটি পরিণত হয় কুষ্টিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসবে।
খেলার ঘণ্টাখানেক আগে থেকেই মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। কেউ বন্ধুদের নিয়ে, কেউ পরিবারের সবাইকে নিয়ে। তারা প্রিয় খেলোয়াড় নিয়ে তর্ক করেন, কে জিতবে তা নিয়ে বাজি ধরেন। কেউ ছবি তুলেন, কেউ ভিডিও করেন। খেলা শুরু হতেই মনযোগ সেদিকে। রেফারির প্রথম বাঁশি বাজতেই হাজারো চোখ একসঙ্গে স্থির হয়ে যায় পর্দায়। একটি সুন্দর পাসে করতালি। একটি আক্রমণে উৎকণ্ঠা। একটি মিসে দীর্ঘশ্বাস। আর একটি গোলে মুহূর্তেই আকাশ কাঁপিয়ে ওঠে উল্লাস। সেই আনন্দে কেউ কাউকে চেনেন না, তবু সবাই যেন আপন হয়ে যান। পাশের অচেনা মানুষটিও তখন গোল উদ্যাপনে জড়িয়ে ধরেন আরেকজনকে। ফুটবল যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য সব দূরত্ব মুছে দেয়।
খেলা দেখতে আসা এক দর্শক বললেন, ‘বাড়িতে টেলিভিশন আছে। কিন্তু এত মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে হাঁসা, চিৎকার করা আর গোল উদ্যাপন করার আনন্দ ঘরে বসে পাওয়া যায় না। এখানে এলে মনে হয় পুরো শহরটাই আমার পরিবার।’
এই আয়োজনে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নন, আসছেন দোকানদার, চাকরিজীবী, রিকশাচালক, কৃষক, শিশু, নারী ও প্রবীণ। ফুটবল সবাইকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ যে শুধু শ্রেণিকক্ষের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না, মানুষের হৃদয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে—এই আয়োজন তারই প্রমাণ।
বিশ্বকাপ শেষ হবে। এই আয়োজনের পর্দার আলোও নিভে যাবে। কিন্তু মানুষের সেই জনস্রোত, গোলের মুহূর্তে একসঙ্গে গর্জে ওঠা হাজারো কণ্ঠ আর এক শহরের সম্মিলিত উল্লাস কুষ্টিয়ার মানুষের স্মৃতিতে আরও অনেক দিন বেঁচে থাকবে।
মো. মেহেদী হাসান: জনসংযোগ কর্মকর্তা, লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল