ফুটবল দিচ্ছে অন্য এক ‘লড়াইয়ের’ ফাইনাল
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১৯:২৭ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ২০:১১
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা যখন মাঠে নামবেন, তখন স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে ভিন্ন এক কূটনৈতিক আবহ তৈরি হতে পারে। যেখানে উপস্থিত থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
সানচেজ বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের একজন জোরালো সমালোচক। বিপরীতমুখী রাজনৈতিক আদর্শের এই দুই নেতার সম্পর্কের উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরে খবরের শিরোনাম হয়েছে। ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড, ন্যাটো ও ইরান ইস্যুতে ইউরোপের নেতারা যখন ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নমনীয়তা বজায় রেখেছেন, তখন সানচেজই একমাত্র নেতা যিনি সরাসরি ‘না’ বলার সাহস দেখিয়েছেন।
সবশেষ তুরস্কে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনকে ন্যাটোর ভয়াবহ অংশীদার বলে অভিহিত করেন। পাশাপাশি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আর স্পেনের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য করতে চায় না।’ সানচেজের ভাষ্য, ওই সম্মেলনের পর দুই দেশের সম্পর্ক বেশ ইতিবাচক। তিনি জানান, সম্মেলন চলাকালে ফুটবল নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছিলেন। সেখানে কোনো ধরনের উত্তেজনা ছিল না।
সমাজতান্ত্রিক নেতা সানচেজ এর আগে ইরান যুদ্ধের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে স্পেনের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার মার্কিন অভিযানেরও নিন্দা জানান।
ট্রাম্পের সঙ্গে সানচেজের সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক সামনে আসে গত মার্চ মাসে। ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলার এক পর্যায়ে ইউরোপের মিত্রদের ঘাঁটি ব্যবহারের প্রস্তাব দেয় ওয়াশিংটন। সে অনুরোধ সরাসরি নাকচ করে দেয় স্পেনের সরকার।
সানচেজের অন্যতম সহযোগী ও অর্থমন্ত্রী কার্লোস কুয়ের্পো তখন বলেছিলেন, তাঁর দেশ একতরফাভাবে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে শুরু করা যুদ্ধকে সমর্থন করে না। অন্যদিকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় মাদ্রিদের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দেন ট্রাম্প। যেটির পাল্টা জবাবে সানচেজ যুক্তরাষ্ট্রের হামলাগুলোকে বেপরোয়া ও অবৈধ বলে উল্লেখ করেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত বছরের এপ্রিলে বিশ্বজুড়ে শুল্ক দিয়ে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। সানচেজ সেটিরও অন্যতম সমালোচক ছিলেন। ইরান যুদ্ধের সময় আবারও যখন সেই শুল্কের হুমকি আসে তখন তিনি বলেন, ‘শুধু প্রতিশোধের ভয়ে মাদ্রিদ এমন কোনো কর্মকাণ্ডে সহায়তা করবে না, যা বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর এবং মূল্যবোধের পরিপন্থি।’
ইউরোপীয় অঙ্গনে স্পেন খুব কম সময়ই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি দাঁড়াতে মহাদেশটির নেতাদের যে ভীতি, সেখানে অসন্তুষ্ট ইউরোপীয়দের কাছে স্পেন যেন পথপ্রদর্শক হয়ে উঠছে। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘পোলিং ইউরোপ’-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ ইউরোপীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রকে বন্ধুভাবাপন্ন শক্তি হিসেবে দেখে। দুই বছর আগে যা ছিল ৬১ শতাংশ।
গত ডিসেম্বরে স্পেনে চালানো ইউগভ (জরিপ সংস্থা) এর একটি জরিপে ৭৭ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ অবস্থায় ট্রাম্পবিরোধীতাকে সানচেজের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখা যায়। কারণ, প্রায় ৮ বছর ক্ষমতায় থাকার পর স্পেনে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতির বিরোধীতার মাধ্যমে যা পরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়।
মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সানচেজের এই জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের তথ্য প্রকাশ করেছিল গত মার্চ মাসের শেষ দিকে। তবে শুক্রবার ইউগভের ওয়েবসাইটে থাকা ২৯ জুনের একটি জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, সানচেজের পক্ষে সমর্থন ৩৩ শতাংশ। বিপরীতে ৬৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী তাঁর বিরোধীতা করেছেন। যা থেকে বোঝা যায়, ন্যাটো, গ্রিনল্যান্ড, ইরান ও ফিলিস্তিন নিয়ে সানচেজের স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব বিশ্বের অন্য দেশে জনপ্রিয়তা এনে দিলেও তিনি নিজ দেশের ভোটারদের খুব একটা মন জয় করতে পারছেন না।
এ ক্ষেত্রেই সানচেজের জন্য বড় রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল। স্পেন শিরোপা জিতলে সেটি নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী সানচেজের জন্য একটি প্রতীকী রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে। ক্রীড়া ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্য ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির একাধিক উদাহরণ আছে ইতিহাসে।
স্পেন প্রথমবারের মতো ২০১০ সালে যখন শিরোপ জেতে তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হোসে লুইস রদ্রিগেস সাপাতেরো। অর্থনৈতিক সংকটে থাকলেও সাপাতেরোর সরকার এই বিজয়কে জাতীয় উদযাপনের অংশ বানায়। ২০০৬ সালে একই কাজ করেছিল ইতালির তৎকালীন সরকার। আরও পেছনে গেলে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও এমন উদাহরণ পাওয়া যায়।
নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ওই বছর যখন তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে, তখন ক্ষমতায় ছিল জর্জ রাফায়েল বিদেলার জান্তা সরকার। সামরিক সরকার বিশ্বকাপকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নয়ন ও দেশীয় জাতীয়তাবাদ জোরদারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
আগামী রোববার রাতে (বাংলাদেশ সময়) ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে সম্ভবত ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ীদের হাতে শিরোপা তুলে দেবেন। মঞ্চে থাকতে পারেন সানচেজও। স্পেন শিরোপা জিতলে পুরস্কার বিতরণীর ওই মঞ্চটা সানচেজের জন্য কতটা অর্থবহ হবে; তা হয়তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।