সিদ্দিকুল্লার ডাকে কলকাতা বিমানবন্দর চত্বরে জমায়েত পণ্ড, ১৬৩ ধারা
মসজিদে নামাজ বন্ধে প্রতিবাদের ডাক
পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিরাপত্তা চাদরে মুড়ে ফেলেছে মসজিদে প্রবেশপথের সামনে বাঁকড়া এলাকা
শুভজিৎ পুততুন্ড, কলকাতা
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১৪:৫৬ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৪৪
কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য রানওয়ের পাশে থাকা গৌরীপুর জামে মসজিদ বা বাঁকড়া মসজিদে নামাজ বন্ধের প্রতিবাদে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের আজ পথে নামার ডাক দিয়েছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। শুক্রবার দুপুরে বিমানবন্দর চত্বরে দেখা গেছে সিদ্দিকুল্লাকে।
তবে আজ সকাল থেকে সেখানে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গেছে। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিরাপত্তা চাদরে মুড়ে ফেলেছে মসজিদে প্রবেশপথের সামনে বাঁকড়া এলাকা। অবাঞ্ছিত কাউকে জমায়েত করতে দেয়নি পুলিশ। ভারতীয় ন্যায় সংহীতার ১৬৩ ধারা (পূর্বের ১৪৪ ধারা) সেখানে কার্যকর করা হয়। এর ফলে পণ্ড হয়ে গেছে জমায়েত।
আগের দিন বৃহস্পতিবার তিনি মুসলমানদের এয়ারপোর্ট লাগোয়া বাঁকড়া এলাকার ৭ নম্বর গেটের সামনে আসার অনুরোধ করেন। পশ্চিমবঙ্গের এক কোটি মুসলমানকে কালোব্যাজ পরে প্রতিবাদ জানিয়ে নামাজে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করেন সিদ্দিকুল্লা। আজ শুক্রবার বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেটে জমায়েতের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ১৩৬ বছরের পুরানো মসজিদে অন্যায় ও অবৈধভাবে নামাজ বন্ধের বিরুদ্ধে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করব।

তবে আজ শুক্রবার সেখানে দেখা গেছে, সকাল থেকে বিধাননগর পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে চলছে প্রচার। মাইকে বলা হয়, ভারতীয় ন্যায় সংহীতার ১৬৩ ধারা (পূর্বের ১৪৪ ধারা) এই এলাকায় কার্যকর করা হয়েছে। তাই একসঙ্গে চারজনের জমায়েত করা যাবে না।
এ বিষয়ে দমদম উত্তরের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ সিকদার বলেন, এর পেছনে কোনো বিদেশি শক্তি কাজ করছে না তো, সেটা দেখা দরকার। সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলেছেন, এক কোটি মুসলিম কালোব্যাজ পরে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করবেন। ধর্মের দোকান চালানোর জন্য এই ধরনের কথা বলছেন। প্রশাসন যেটা ভালো মনে করেছে, করেছে। সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী হয়তো ভুলে গেছেন সরকার বদলে গেছে, আর এই সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর নাম শুভেন্দু অধিকারী।
এয়ারপোর্ট ইস্যু তিনি আরও বলেন, এটা নিয়ে ৯৯ সাল থেকে আলোচনা হচ্ছে। তপন শিকদার সংসদে তুলেছিলেন। ২০০২ সালে শাহানাজ মন্ত্রণালয় জানান মসজিদ সরানোর কথা। ২০০৩ সালে বামফ্রন্ট সরকার না বলে দেয়। লাগাতার বিধানসভায় রাজ্যসভায় লোকসভায় উঠেছে। তখন থেকে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী গোঁ ধরে বসে আছেন। শুধু আধার কার্ড দেখিয়ে ঢুকে যাচ্ছে মসজিদে। সেখান থেকে কোনো ছবি ইমেজ বাইরে গেলে সুরক্ষা বিঘ্নিত হতে পারে।
তিনি বলেন, জিরো ভিজিবিলিটি হলে ল্যান্ডিং করা যায় না এই মসজিদের জন্য। খালি একটা ধর্মীয় আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হবে? আন্তর্জাতিক বিমানের সংখ্যা বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগ ও থাকবে। ধর্মের ব্যবসায়ী উনি। আজ ও সেখানে চলে গেছেন সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। কোনো ঝামেলা লাগাতে চাইছেন? ওনার উদ্দেশ্যই তাই। আইন ভাঙলে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে রাজ্য সরকার।

শুক্রবার বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেটে জমায়েতের আহ্বান জানিয়ে সিদ্দিকুল্লা বলেন, ১৩৬ বছরের পুরানো মসজিদে অন্যায় ও অবৈধভাবে নামাজ বন্ধের বিরুদ্ধে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করব। সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ এলাকার লোকজন ওখানে নামাজ পড়তে যাবে। আমি অনুরোধ করব, আমাদের যেন নামাজ আদায় করতে দেওয়া হয়। যদি ঢুকতে না দেয় তাহলে ধস্তাধস্তি করব না। আমরা শান্তিপ্রিয়। আর বাংলার এক কোটি মুসলমানদের কাছে অনুরোধ, কালোব্যাজ পরে নামাজ পড়তে আসবেন। আল্লাহ কাছে দোয়া করে চলে আসুন। কোনো বিক্ষোভ প্রদর্শনের দরকার নেই। কোনো মাইকিং, ক্যানভাস কিছু থাকবে না।
সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী অভিযোগ করেন, যদি সত্যিই উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে অন্তত একটি নোটিশ দেওয়া যেত। গত ২৪ বছর ধরে এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সরকারি যোগাযোগ রয়েছে। একটি চিঠি দেওয়া বা আলোচনায় বসতে তাদের অসুবিধা কোথায় ছিল? তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা ঠিক হয়নি। এলাকায় হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেমিশে থাকেন। আমরা বারবার পুনর্বাসন বা স্থানান্তরের কথা বলছি না। এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিষয় নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত- দারুল উলুম দেওবন্দ, জমিয়তে উলেমা-এ-হিন্দ এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনা করা। প্রয়োজন হলে আমরাও তাদের সঙ্গে থাকব, যাতে আইন মেনে এবং আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে স্থানান্তরের সমাধান করা যায়, তা নির্ধারণ করা যায়।
এ বিষয়ে বুধবার রাতে সংশ্লিষ্ট থানায় গেলেও তাদের অভিযোগ নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন সিদ্দিকুল্লা। তার দাবি, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সহযোগিতা মেলেনি। সিদ্দিকুল্লাহর বক্তব্য, ‘আমরা ১১ তারিখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তিনবার ফোন করেছি। এয়ারপোর্ট থানায় এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থানায় দু’ঘণ্টা ধরে ঘুরেছি। কিন্তু কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনও মনে করেননি। তবুও আমরা বলতে চাই, আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। গোটা বাংলায় এমন একটি ঘটনাও দেখানো যাবে না, যেখানে আমরা আইন ভেঙেছি। আমরা সব সময় আইন মেনেই চলেছি। মুসলিমরা শুধু নামাজ পড়তে যাবেন। কোনো অশান্তি হবে না। কেউ রাস্তায় নামবেন না, কোনো জোরজবরদস্তি হবে না, মাইকিংও হবে না। আমরা শুধু এই ব্যাজ পরে শান্তিপূর্ণভাবে নমাজ আদায় করতে যাব। এতে আপত্তির কী আছে?’
এ বিষয়ে দমদম উত্তরের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ সিকদার বলেন, ‘এই বাংলায় কোনো জামায়তি, শরিয়তি আইন চলবে না। এখানকার শান্তিপূর্ণ মুসলমান ভাইদের কাছে অনুরোধ, কারও উসকানিতে আইন ভাঙার কাজ করবেন না। এখানে দেশ সবার আগে। নিরাপত্তা সবার আগে। নিরাপত্তা, দেশের প্রশ্নে কখনও ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
সিদিকুল্লার বিরুদ্ধে তিনি বলেন, ‘ওনার মতো লোকেরা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। ওরা যা খুশি বলতে পারে। আপনারা কোনো উসকানিতে পা দেবেন না।’
মসজিদ সংক্রান্ত বিষয়ে মুখ খুলেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। তিনি বলেছেন, ওই এলাকায় যদি মসজিদ না হয়ে হনুমানজির মন্দিরও থাকত, সেটিকেও সরানো হতো।
প্রসঙ্গত, এয়ারপোর্টের দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য গৌরীপুর জামে মসজিদ বা বাঁকড়া মসজিদকে সরানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই মধ্যেই ওই মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ রয়েছে। এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া সূত্রে জানানো হয়েছে, এয়ারপোর্টের সম্প্রসারণ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ওই মসজিদ অন্যত্র সরানো দরকার। মসজিদটির জন্য প্রবলভাবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। লাখ লাখ যাত্রীর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। মসজিদটি রানওয়ে সংলগ্ন হওয়ায় সেকেন্ডারি রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। সেকেন্ডারি রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে রয়েছে এই মসজিদ। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সুরক্ষাবিধি স্পষ্ট বলছে, রানওয়ে থেকে যেকোনো কাঠামোর ন্যূনতম দূরত্ব অন্তত ২৪০ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া যারা বিমানবন্দরের ভেতরে নামাজ পড়তে ঢুকছেন, তাদের জন্য কোনো বৈধ পাস ইস্যু হয় না। শুধুমাত্র আধার কার্ডের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে পৌঁছে তারা নামাজ পড়েন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য এই বিষয়টিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
- বিষয় :
- কলকাতা
- পশ্চিমবঙ্গ