ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবল

ফাইনালে আর্জেন্টিনার সমর্থনে ব্রাজিল!

ফাইনালে আর্জেন্টিনার সমর্থনে ব্রাজিল!
×

সাঈফ ইবনে রফিক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ২০:১৯

আটলান্টায় সেমিফাইনালের রাতটা ছিল নিঃশ্বাসরুদ্ধ নাটক। শেষ পাঁচ মিনিটে দুই গোল করে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা, প্রতিপক্ষ স্পেন। জয়সূচক গোলটির শেষ পাসটি এসেছিল মেসির পা থেকে। ম্যাচ শেষে খেলায় না নামা জিওভান্নি লো সেলসো মেলে ধরেন একটি সাদা ব্যানার– ‘লাস মালভিনাস সন আর্হেন্তিনাস’, অর্থাৎ মালভিনাস আর্জেন্টিনার। ব্যানারটি প্রথমে উঠেছিল গ্যালারির সমর্থকদের হাতেই। বিজয়ের উল্লাসের মধ্যে হঠাৎ যেন জেগে উঠল ইতিহাসের এক পুরোনো ক্ষত।

এর কয়েক দিন আগেই নরওয়ের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। তাই ফাইনালের রাতে নিউ জার্সির গ্যালারিতে কৌতূহলোদ্দীপক এক দৃশ্য দেখা যেতে পারে। হলুদ জার্সির ভিড়ে অনেক ব্রাজিলীয় দর্শকের হাতে উঠতে পারে আকাশি-সাদা পতাকা। কেউ মেসির জন্য, কেউ দক্ষিণ আমেরিকার মর্যাদার জন্য, কেউ আবার ইউরোপীয় ফুটবলের দীর্ঘ আধিপত্যের বিপরীতে নিজেদের মহাদেশের প্রতিনিধিকে সমর্থন জানাতে।

এটি অবশ্য ব্রাজিলের সর্বজনীন অবস্থান নয়। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আজও তীব্র। বহু ব্রাজিলীয় নিশ্চয়ই স্পেনকে সমর্থন করবেন। কিন্তু ব্রাজিলের একটি দৃশ্যমান অংশের আর্জেন্টিনা-প্রীতিকে নিছক মেসিপ্রেম বলে দেখলে দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাস, ভূগোল ও সামাজিক বাস্তবতার বড় একটি অংশ আড়ালে থেকে যায়।
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ফুটবলের দুই চিরপ্রতিপক্ষ, কিন্তু ভূগোলের দুই অপরিচিত রাষ্ট্র নয়। তাদের মধ্যে বারো শ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত। ইগুয়াসু নদী দুই দেশের সীমারেখা টেনেছে, আবার মানুষকেও যুক্ত করেছে। ফজ দো ইগুয়াসু, পুয়ের্তো ইগুয়াসু কিংবা মিসিওনেস অঞ্চলে সীমান্ত শুধু পাসপোর্টের রেখা নয়; তা বাজার, কর্মসংস্থান, পর্যটন, চিকিৎসা, আত্মীয়তা ও প্রেমের পথ।

দুই পাশে রাষ্ট্রভাষা আলাদা– ব্রাজিলে পর্তুগিজ, আর্জেন্টিনায় স্প্যানিশ। কিন্তু সীমান্তবাসীর মুখে জন্ম নিয়েছে মিশ্র ভাষা ‘পোর্তুনিয়ল’। এই ভাষা অভিধান থেকে তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছে বাজারে দরকষাকষি করতে গিয়ে, সীমান্ত পারাপারের বাসে গল্প জমাতে গিয়ে, মাঠে বন্ধুত্ব করতে গিয়ে, কখনও এক দেশের তরুণের সঙ্গে অন্য দেশের তরুণীর প্রেমে পড়ে।

ব্রাজিলীয়রা আর্জেন্টিনায় পড়তে যান, চিকিৎসা নেন, ব্যবসা করেন। আর্জেন্টাইনরা ব্রাজিলের সৈকত, নগর ও কর্মবাজারের দিকে ছুটে যান। হাজারো পরিবারে দুই দেশের নাগরিকত্ব, ভাষা ও স্মৃতি পাশাপাশি বাস করে। ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গভীর হলেও তা সব সময় শত্রুতা নয়। বরং অনেকটা একই পরিবারের দুই প্রতিভাবান ভাইয়ের মতো, যারা পরস্পরকে হারাতে চায়, কিন্তু বাইরের কেউ পরিবারের একজনের সামনে দাঁড়ালে অন্যজনের ভেতরে জেগে ওঠে অদৃশ্য আত্মীয়তা।
এই সম্পর্কের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিও শক্ত। সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ সন্দেহ পেছনে ফেলে দুই দেশ আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলে। পরে সেই আস্থা পথ তৈরি করে মেরকোসুরের। ১৯৯১ সালে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়েকে নিয়ে গঠিত এই জোটের লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য নয়; গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সংহতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও।

আজও দুই দেশের অর্থনীতি একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্রাজিলের অটোমোবাইল শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার গাড়ি ও যন্ত্রাংশের বাজার। আর্জেন্টিনার গম, জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের জন্য ব্রাজিল গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। আবার ব্রাজিলের শিল্পপণ্য ও বিনিয়োগ আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বদলায়, মতাদর্শ বদলায়, কিন্তু নদীর স্রোত কিংবা পণ্যবাহী ট্রাকের পুরোনো পথ সহজে বদলায় না।

মালভিনাস বা ফকল্যান্ড প্রশ্নে ব্রাজিলের অবস্থান এই মহাদেশীয় আত্মীয়তার গভীরতম প্রমাণ। ১৯৮২ সালের যুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার ভাষা ব্যবহার করলেও ব্রাজিলের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবির পক্ষে। ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমর্থনের ইতিহাস ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যখন লন্ডনে নিযুক্ত ব্রাজিলীয় রাষ্ট্রদূতকে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রতিবাদের পক্ষে অবস্থান নিতে বলা হয়েছিল।
ফকল্যান্ড যুদ্ধ দক্ষিণ আমেরিকার বহু মানুষের কাছে শুধু আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের সংঘর্ষ ছিল না। সেটি ছিল ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে এই মহাদেশের একটি দেশের ভূখণ্ডগত দাবির লড়াই। আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক জান্তার নিষ্ঠুরতা অবশ্যই সমালোচনার বিষয়। কিন্তু জান্তার অপরাধ আর দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এক নয়। ব্রাজিল কূটনৈতিকভাবে এই পার্থক্য ধরে রেখেছে।

তাই লো সেলসোর হাতে মালভিনাসের ব্যানার নিছক একটি বিতর্কিত ফুটবল-মুহূর্ত নয়। এর ভেতরে আছে ১৯৮২ সালের যুদ্ধ, ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের ইংল্যান্ডবধ এবং দক্ষিণ আমেরিকার দীর্ঘ স্মৃতি। ব্রাজিলীয়দের একাংশের আর্জেন্টিনা-সমর্থনের গভীরেও তাই ইউরোপের বিপরীতে মহাদেশীয় সংহতির একটি নীরব সুর কাজ করতে পারে।

ব্রাজিল ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ, আর্জেন্টিনা স্পেনের। দুই সমাজই গড়ে উঠেছে উপনিবেশবাদ, আফ্রিকীয় দাসত্ব, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ ও পরবর্তী অভিবাসনের মধ্য দিয়ে। তাদের জাতিগত বিন্যাস এক নয়, কিন্তু উভয়ের জাতীয় পরিচয়ই মিশ্র। তাদের ঐক্য একই জাতিগোষ্ঠীতে নয়, বরং মিশ্রণের অভিজ্ঞতায়।
সাম্বা ও ট্যাঙ্গোর তাল আলাদা, কিন্তু দুটিই উঠে এসেছে বন্দরনগর, শ্রমজীবী মানুষ, অভিবাসন, প্রেম ও বিচ্ছেদের বেদনা থেকে। ব্রাজিলের ‘জোগো বনিতো’ আর আর্জেন্টিনার ‘লা নুয়েস্ত্রা’ও এক নয়, কিন্তু দুই দর্শনই ফুটবলকে নিছক শক্তি ও কৌশলের বাইরে নিয়ে গেছে। ইউরোপ ফুটবলকে শৃঙ্খলা দিয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকা দিয়েছে ড্রিবল, কল্পনা, রাস্তার ফুটবল ও ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার সৌন্দর্য।

এই সমর্থনের সবচেয়ে মানবিক কারণ অবশ্য মেসি। পেলে ও ম্যারাডোনার পর দক্ষিণ আমেরিকা এমন একজন খেলোয়াড় পেয়েছে, যাকে জাতীয় সীমার মধ্যে আটকে রাখা যায় না। তিনি আর্জেন্টাইন, কিন্তু তাঁর প্রতিভার উত্তরাধিকার পুরো মহাদেশের। তাঁর সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল বহু ব্রাজিলীয়র কাছেও একটি যুগের বিদায়।
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা একে অন্যকে হারিয়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়। আবার বাইরের পৃথিবী দক্ষিণ আমেরিকাকে ছোট করে দেখলে তারা পরস্পরের সাফল্যের মধ্যেই নিজেদের মর্যাদা খুঁজে পায়। এ সম্পর্ক বন্ধুত্বের চেয়ে জটিল, শত্রুতার চেয়ে গভীর। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, ঈর্ষা আছে, ইতিহাসের ক্ষত আছে; আবার আছে সীমান্ত পেরোনো প্রেম, বাণিজ্য, একই নদীর জল এবং একই মহাদেশের স্মৃতি।

রোববার রাতে ব্রাজিলের যে দর্শক আকাশি-সাদা পতাকা হাতে তুলবেন, তিনি নিজের দেশকে ভুলে যাবেন না। তিনি শুধু স্বীকার করবেন, সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীটিই তাঁর সবচেয়ে কাছের আত্মীয়। হলুদ-সবুজ জার্সির নিচে হৃদয়টা তখনও থাকবে ব্রাজিলের, শুধু তার একটি অলিন্দে বাজতে থাকবে বুয়েনস এইরেসের ছন্দ।

সাঈফ ইবনে রফিক: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×