মানব সম্পদ
এইচএসসির আগেই হারিয়ে যাচ্ছে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী
মাহ্ফুজ সরকার
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিবছর এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হলে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় থাকে প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষার পরিবেশ, পাসের হার কিংবা জিপিএ ৫। কিন্তু এবারের পরীক্ষা আমাদের সামনে আরও গভীর এক সংকট উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া প্রায় ১৫ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে। অর্থাৎ প্রায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগেই শিক্ষাপ্রবাহ থেকে ছিটকে গেছে। গত বছরের তুলনায় এই হার আরও বেড়েছে। এটি কেবল একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়; বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নীরব সংকটের প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন হলো, এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কোথায় গেল?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনও এই অনুপস্থিতির সুনির্দিষ্ট কারণভিত্তিক কোনো জাতীয় বিশ্লেষণ প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন গবেষণা, শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পূর্ববর্তী অনুসন্ধান থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ স্পষ্ট হয়। দারিদ্র্য, জীবিকার প্রয়োজনে শ্রমবাজারে প্রবেশ, বাল্যবিবাহ, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ– সব মিলিয়ে এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
আমরা সাধারণত শিক্ষার্থী ঝরে পড়াকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখি। বাস্তবতা আরও গভীর। একসময় উচ্চ মাধ্যমিক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সিঁড়ি, আর বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সামাজিক উন্নয়নের প্রতীক। আজ সেই আস্থা দুর্বল হয়েছে। অনেক পরিবারের কাছে দুই বছর কলেজে পড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষা করার চেয়ে এখনই আয়ের পথে যাওয়া বেশি যুক্তিসংগত মনে হয়। কেউ হয়তো কারখানায় কাজ করছে; কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে; কেউ ছোট ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ শিক্ষা আর জীবনের মধ্যে যে সম্পর্ক একসময় ছিল, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই পরিবর্তনকে শুধু অর্থনৈতিক সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়োর ভাষায়, শিক্ষা একসময় ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি অর্জনের প্রধান পথ। কিন্তু যখন সেই শিক্ষা নিশ্চিত কর্মসংস্থান, দক্ষতা বা সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন পরিবার দ্রুত আয়কেই বেশি মূল্য দেয়। ফলে শিক্ষার সাংস্কৃতিক মূল্য ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক হিসাবের কাছে পরাজিত হয়।
এই সংকটের সবচেয়ে করুণ দিকটি মেয়েদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট। নারীশিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি সত্ত্বেও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে অনেক মেয়ের শিক্ষাজীবন থেমে যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। এই বয়সটিই মূলত একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সময়। ফলে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী সংসার, মাতৃত্ব ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে কলেজ শেষ করার আগেই শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। যদিও এই সংকটের জন্য এককভাবে কোনো একটি ঘটনাকে দায়ী করা যাবে না, তবুও সাম্প্রতিক অস্থিরতা আগে থেকেই চলমান ঝরে পড়ার প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আলোচনায় আরেকটি নীরব বাস্তবতা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। দ্রুত নগরায়ণ, খেলার মাঠের সংকোচন এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একসময় স্কুল-কলেজ ছিল সামাজিকীকরণেরও স্থান। আজ অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি কেবল একটি পরীক্ষাকেন্দ্র। ফলে যারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে, তাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আবেগি সম্পর্কও দুর্বল হয়ে যায়। এই বিচ্ছিন্নতাও ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, রাষ্ট্রও জানে না– এই শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী কখন শিক্ষা ছাড়ল, কেন ছাড়ল এবং এরপর তার জীবন কোন পথে এগোল– এমন কোনো কার্যকর জাতীয় শিক্ষার্থী-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা নেই। ফলে সমস্যার প্রকৃত চিত্রও নীতিনির্ধারকদের কাছে স্পষ্ট নয়।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই শিক্ষার্থী ধরে রাখাকে শিক্ষানীতির প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের আগেভাগে শনাক্ত করা, দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, উচ্চ মাধ্যমিকে কার্যকর ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং শিক্ষাকে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা ও শেখার অভিজ্ঞতাভিত্তিক করে তোলার বিকল্প নেই।
আজ যে সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিল না, তাদের অনেকেই হয়তো চিরতরে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে হারিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের শিক্ষক, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা কিংবা দক্ষ কারিগর থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই সংকট শিক্ষার পাশাপাশি দেশের মানবসম্পদ, সামাজিক গতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রশ্ন। এখন সময় এসেছে ভর্তি নয়; শিক্ষার্থীকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার সক্ষমতাকেই শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার।
মাহ্ফুজ সরকার: শিক্ষক ও লেখক
- বিষয় :
- মতামত