ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সাদা কালো

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার লাভক্ষতি

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার লাভক্ষতি
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সামনের ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন গত বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। তাঁর এ ঘোষণায় একদিকে রাজনীতির মাঠে প্রায় অনুপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধীরাও বসে নেই। বিশেষত বিভিন্ন মন্ত্রী, উপদেষ্টা, ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারা এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। উভয় পক্ষের বক্তব্যই জনপরিসরে কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। 

আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বলছেন, শেখ হাসিনা ফিরবেনই। কিন্তু কীভাবে– সেই উত্তর মিলছে না। শেখ হাসিনা তো লংমার্চ করে দেশে ফিরতে পারবেন না! ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইতোমধ্যে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধ। কিছু ঝটিকা মিছিল করলেও দলটির নেতাকর্মীরা এখনও প্রায় সর্বাংশে অসংগঠিত। ফলে শেখ হাসিনা কোনো এক সীমান্ত এলাকায় হাজির হলেই লাখ লাখ মানুষ সব বাধা ডিঙিয়ে তাঁকে বরণ করে নেবে– তা কল্পনাতীত।

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে, তার সারমর্ম হলো, শেখ হাসিনা ওই ঘোষণা বাস্তবায়নের সুযোগই পাবেন না। যেমন, গত রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছেন। তাহলে তো নিজে নিজে তাঁর আসার কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে তাঁকে ফেরাতে ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এখন হয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে, নতুবা অন্য প্রক্রিয়ায় ফিরলে তিনি পুলিশের হেফাজতে যাবেন। অথবা তাঁকে পুশব্যাক করবে (সমকাল)।’

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এ নিয়ে এক সাধারণ আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায় একই কথা বলেছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মতো বর্তমান সরকারও বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিরাজমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারকে একাধিক চিঠি বা অনুরোধপত্র পাঠিয়েছে। সেই দণ্ডিত আসামি নিজেই যখন দেশে এসে আদালতে নিজেকে সমর্পণ করতে চাচ্ছেন, তখন সরকার এসব অস্পষ্ট বক্তব্য দিচ্ছে কেন? তারা বলেছেন, শেখ হাসিনার আদালতে আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই। দেশে এলেই তাঁকে গ্রেপ্তার ও রায় কার্যকর করা হবে। শেখ হাসিনাও তো প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি সরকারকে এ কাজে সহযোগিতা করতে চান। আদালতের রায় কার্যকর করাই তো মূল কথা; তাই না? 

দল দুটোর মধ্যে অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিশেষত মনস্তাত্ত্বিক যে লড়াই দেখা গেছে, বর্তমান দৃশ্যপট তা-ই মনে করিয়ে দিচ্ছে। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে একটি ট্রাম্পকার্ড বা তুরুপের তাস খেলার হুমকি দিয়েছিলেন। আবদুল জলিল বলেছিলেন, ৩০ এপ্রিলের পর বিএনপি আর ক্ষমতায় থাকবে না; খালেদা জিয়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন। এ নিয়ে তখন রাজনীতিতে ধুন্ধুমার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। রাজনীতি সচেতন সব মহলেই ওই ট্রাম্পকার্ড নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল দেখা গিয়েছিল। দুপক্ষের বাগ্‌যুদ্ধ সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে রেখেছিল। সেই ট্রাম্পকার্ড শেষ পর্যন্ত দেখা না গেলেও আওয়ামী লীগ বহুদিন জনদৃষ্টি নিজের দিকে ধরে রাখতে পেরেছিল। 

বলছি না, শেখ হাসিনার আলোচ্য ঘোষণা নিছক ওই ট্রাম্পকার্ডের খেলা। বাস্তবে তার চেয়েও বেশি কিছু। ট্রাম্পকার্ডের ঘটনায় আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান কোনো লাভ না হলেও এবার যেটাই ঘটুক, তার অন্তত লোকসান নেই। শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থাকুন– সরকার সম্ভবত সেটাই চায়। কারণ শেখ হাসিনা দেশে আসার পর তাঁকে জেলেই রাখতে হবে; সঙ্গে সঙ্গেই দণ্ড কার্যকর করা যাবে না। এ অবস্থায় দলীয় নেতাকর্মী যেমন তৎপর হবে, তেমনি তার ওপর জনগণের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মনোযোগও নিবদ্ধ থাকবে। ফলে দেশে এলে তো বটেই, সরকারের অসহযোগিতার কারণে দেশে ফিরতে না পারলেও তা আখেরে শেখ হাসিনাকেই রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড দেবে। তখন কেউ তাঁর দণ্ড কার্যকরের সুযোগ হাতছাড়া করার অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে তুললে তা অমূলক হবে না।
মনে রাখতে হবে, দুবছর আগের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বিএনপি ও দলটির মিত্ররা বলে আসছে, দেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের আর প্রাসঙ্গিকতা নেই। বাস্তবে শেখ হাসিনার সামাজিক মাধ্যম বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া কোনো বক্তব্য বা ঘোষণাই উপেক্ষার চাদরে ঢেকে দেওয়া যাচ্ছে না। 

বর্তমানে যতই সমালোচিত হোক; বাংলাদেশের জন্ম এবং তার পরবর্তী প্রতিটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নিবিড় সম্পর্ক অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এটাও সত্য, ১৯৭৮ সালে বিএনপির জন্মের পর থেকে দেশের রাজনীতি এ দু-দল ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। দেশের অন্তত ৮০ ভাগ মানুষ এখনও এ দুই দলের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব মানুষের মধ্যে দলীয় রাজনীতির প্রভাব প্রকট। সে কারণে নিজ দলের শীর্ষ নেতার এমনকি দিনশেষে অগুরুত্বপূর্ণ কথাকে যেমন এরা বেদবাক্য জ্ঞান করে, তেমনি প্রতিপক্ষের সামান্য নড়াচড়াও তাদের বিচলিত করে। ফলে দুই বিবদমান দলের নেতারা এক পক্ষ আরেক পক্ষকে যতই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করুন; সমর্থকদের মধ্যে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে তাদের হিসাবে নিতে হয়।

এটাও মনে রাখা দরকার, বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলজুড়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন। তাঁর বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল। পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি কখনোই উল্লেখযোগ্য আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। তাই আওয়ামী লীগ নেতারা দলটিকে হেয় করে প্রায়ই মন্তব্য করতেন। দিনশেষে এটাই সত্য, নীরবতার অস্ত্র দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপিকে ঘায়েল করতে পারেননি, বরং অহোরাত্র বিএনপিই ছিল তাদের জপমালা।
মোদ্দা কথা, ঢের চেষ্টা করে আওয়ামী লীগ যেমন বিএনপিকে নিঃশেষ করতে পারেনি, তেমনি বিএনপিও পারবে না আওয়ামী লীগকে চিরতরে নির্মূল করতে। এ বাস্তবতার পাঠ আওয়ামী লীগ যে নিচ্ছে, তা বোঝা যায় শেখ হাসিনার জনতার আদালতে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসার মনোভাব থেকে। বাস্তবে কী ঘটবে, সেটা দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। 

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×