কিংবদন্তিদের কিংবদন্তি লিওনেল মেসি
সেকান্দার আলী
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১১:১৬
লিওনেল মেসি ফুটবলের শিল্পী, না জাদুকর– তা নিয়েই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। কখনও শিল্পী হন, কখনও জাদুকর। আর যেদিন এ দুইয়ে মিলে এক হয়ে যান, সে মুহূর্ত ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তখনই মনে হয়, বিমূর্ত ফুটবল-ঈশ্বর মর্ত্যে মেসিরূপে। এক বিশ্বকাপ থেকে আরেক বিশ্বকাপে তাঁর একই ছবি– প্রতি ম্যাচেই খেলেন ভিন গ্রহের খেলা। তাঁর আর বলের মিতালি দেখা ঐশ্বরিক আনন্দের। তাঁর কারিকুরি দেখে সমর্থকরা গগনবিদারী চিৎকারে-উল্লাসে ভালোবাসা প্রকাশ করেন আর ওপর থেকে ঈশ্বর চেয়ে থাকেন বিমোহিত নয়নে। বয়সকে বিবশ করে এই ঊনচল্লিশে উনিশের মতো খেলা মেসি তো কিংবদন্তিদের কিংবদন্তি।
মেসিকে সম্মান দেখাতে সর্বকালের সেরা উপাধি দিচ্ছেন অনেকেই। গ্যারি লিনেকার, হ্যারি কেইন, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ মুগ্ধতা ছড়িয়ে বলেছেন– মহাকালের সেরা মেসি। স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মার্কা তাঁকে সর্বকালের সেরার স্বীকৃতি দিয়েছে পরিসংখ্যান ও অর্জনের ভিত্তিতে। রোববারের ফাইনালে স্পেনকে হারালেই ফুটবলের রাজা পেলে আর ঈশ্বরখ্যাত ম্যারাডোনার আগে থাকবেন ফুটবলের ক্ষুদে জাদুকর। পরলোকের বাসিন্দা পেলে-ম্যারাডোনার তাতে খুশি হওয়ারই কথা।
কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরই আলোচনায় ছিল মেসির অবসর। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে খেলা-না খেলার দোলাচলে ছিলেন তিনি। মেসির সম্মতি পেতে দেরি হওয়ায় বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করতেও হচ্ছিল বিলম্ব। ঈশ্বরের ইচ্ছায় শেষে খেলতে রাজি হন। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকে বাজিমাত করতে থাকেন। একের পর এক রেকর্ড গড়ে অপূর্ণতা মুছে দেন রেকর্ডের খেরোখাতা থেকে। ২০০৬ থেকে ২০২২ সালে পর্যন্ত পাঁচ বিশ্বকাপে খেলা ২৬টি ম্যাচে কোনো হ্যাটট্রিক না পাওয়া মেসি ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ শুরু করেন গোলের হ্যাটট্রিকে।
আলজেরিয়াকে ৩-০ ব্যবধানে হারানোর ম্যাচে সব গোল তাঁর। মেসির জোড়া গোলে অস্ট্রিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারায় আর্জেন্টিনা। জর্ডান, কেপ ভার্দে, মিসরের বিপক্ষেও একটি করে গোল করেন তিনি। পাঁচ ম্যাচে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দাবিদার মেসি। সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা বোধ হয় বরাদ্দ রয়েছে তাঁর জন্যই। এবার জিতলে তিন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হবেন তিনি। রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় মেসি প্রথম আঘাত করেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে। তাঁর ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যান আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। বিশ্বকাপে ২১ গোলের একক কৃতিত্ব এখন তাঁর। কোয়ার্টার বা সেমিফাইনালে গোল না পেলেও জয়ের মূল কারিগর তো তিনিই। ইংলিশদের বিপক্ষে এনজো ফার্নান্দেজ আর লাউতারো মার্তিনেজের গোলের উৎস মেসি। তাই তো গোলদাতার চেয়ে অ্যাসিস্টকারীকে জড়িয়ে আবেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে আর্জেন্টিনার রিজার্ভ খেলোয়াড়দের।
কিংবন্তিদের কিংবদন্তি হওয়ার দৌড়ে মেসির প্রতিদ্বন্দ্বী মেসি। বিশ্বকাপের শেষটা রাঙাতে ফুটবলের মহানায়ককে স্পেনের বিপক্ষে ‘বাতাস’ হতে হবে বল পায়ে। গোল-গোল-গোল মহা-কলরোল তুলতে হলে আবেগের সঙ্গেও লড়াই করতে হবে তাঁকে। ১৮ বছর আগে ছোট্ট বাথটাবে যে শিশুর গায়ে আজলের জল ছিটিয়েছেন, কালের পরিক্রমায় সেই লামিনে ইয়ামাল এখন উনিশের তরুণ এবং ফাইনালে প্রতিপক্ষ। বার্সেলোনার মাঠ থেকে যে কিনা শৈশবে শিখেছেন গুরু মারার বিদ্যা; কৈশোরে যেমন শিখেছিলেন মেসি। সময়ের পার্থক্য ১৮ বছর হলেও উভয়ের ফুটবল স্কুল একই– বার্সেলোনা একাডেমি। তাই লড়াইটা তাদের অনেক দিক থেকেই।
মেসির মেসি হয়ে ওঠার নেপথ্যের গল্পের সবটা জুড়েই বার্সেলোনা। একাডেমি থেকে বার্সার মূল দলে খেলেছেন ১৭টি বছর। জীবনের কতশত স্মৃতি ক্লাবের প্রতিটি কোণে। ২০০৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বার্সার হয়ে ৭৭৮টি ম্যাচ খেলে ৬৭২টি গোল করেছেন। এফসি বার্সেলোনা আর লিওনেল মেসি একে অন্যের পরিপূরক। ১৩ বছর বয়সী মেসির চিকিৎসার ভার নিয়ে যে মহানুভবতা দেখিয়েছিলেন বার্সা একাডেমির কর্মকর্তারা, তার প্রতিদান শেষ দিন পর্যন্ত দিয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। আর্থিক সংকটে পড়ে ক্লাব যেদিন তাঁকে ছেড়ে দেয়, সেদিন চোখের জলে বুক ভেসেছিল তাঁর। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে কিংবদন্তি হওয়া মেসি ঠিকানা গড়েন ইন্টার মায়ামিতে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল লিগে খেলার পেছনেও দূরদৃষ্টি সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের কন্ডিশনে পরিচিত হতে খেলছেন ইন্টার মায়ামিতে। তার সুফলও পেলেন হাতেনাতে।
মেসির ছয় বিশ্বকাপের তিনটিতে ফাইনাল খেলছে আর্জেন্টিনা। ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে হেরে কী কষ্টটাই না পেয়েছিলেন আবেগী তরুণ। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে লিওনেল স্কালোনি ছক সাজান মেসিকে ঘিরে। ফ্রান্সকে হতাশায় ডুবিয়ে টাইব্রেকারে জেতেন বিশ্বকাপ। ফাইনালে জোড়া গোল করেছিলেন জাদুকর। এবার বিতর্কের আগুনে পুড়ে খাঁটি হলেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে জায়গা করে নিলেন। শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরকে হারিয়ে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলেন মেসি। ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে শেষের রোমাঞ্চে জিতে নেন ম্যাচ। ওই ম্যাচ শেষে কেঁদেছিল পুরো দল। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারাতেও শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এই বিশ্বকাপের নকআউটের চারটি ম্যাচই আর্জেন্টিনা জিতেছে নাটকীয়ভাবে। স্পেনের বিপক্ষেও ফাইনাল ম্যাচটি হতে পারে রোমাঞ্চকর। যেখানে মেসির পায়ের জাদুতে বিমোহিত হবে বিশ্ব। বিশ্বকাপ জিতলে বর্ষসেরার পুরস্কার ব্যালন ডি’অরের জন্যও মনোনীত হবেন। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা সমৃদ্ধ হবে ব্যালন ডি’অরের নবম পুরস্কারে। এবার বিশ্বকাপ জেতা মানেই গোল্ডেন বল ও বুট একসঙ্গে পাওয়ার সম্ভাবনা। তিনি কি কিংবদন্তিদের কিংবদন্তি হবেন, নাকি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনের মতো বলবেন– এসেছে নতুন শিশু, তাকে (লামিনে ইয়ামাল) ছেড়ে দিতে হবে স্থান।