ইসলাম ও সমাজ
সফর মাসের তাৎপর্য
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইসলামী হিজরি সনের দ্বিতীয় মাসের নাম সফর। মহররমের পরেই এর অবস্থান। আমাদের সমাজে এ মাস নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ও কুসংস্কার প্রচলিত। তাই কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সফর মাসের প্রকৃত গুরুত্ব, তাৎপর্য এবং করণীয়-বর্জনীয় জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি।
আরবি সফর শব্দের অর্থ– খালি হয়ে যাওয়া। জাহেলি যুগে আরবরা এ মাসে নিজের ঘরবাড়ি খালি করে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ব্যবসার জন্য বের হয়ে যেত। সে কারণেই এ মাসের নাম সফর রাখা হয়।
জাহেলি যুগে আরবরা সফর মাসকে চরম অশুভ মনে করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, সফর মাসে বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি হয়। নতুন ব্যবসা বা ঘরবাড়ি শুরু করলে ক্ষতি হয়। এ মাসে সফরে বের হলে দুর্ঘটনা ঘটে। সফরের বালা নামে একটি রোগ আছে, যা ব্যাপকভাবে ছড়ায়। এসব ধারণাই ছিল সম্পূর্ণ কুসংস্কার। ইসলাম এসে এসব ভিত্তিহীন কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন– ছোঁয়াচে রোগ নিজে থেকে হয় না; পাখি দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা নেই; প্যাঁচা অশুভ নয় এবং সফর মাসও অশুভ নয়।
হাদিসের এ বক্তব্য দিয়ে রাসুলে কারিম (সা.) জাহেলিয়াতের সব কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করেছেন।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের গণনা ১২টি’। এর মধ্যে সফরও একটি পূর্ণ মাস। তাই অন্য মাসকে যেভাবে সম্মান করা হয়, সফরকেও সেভাবে সম্মান করতে হবে। এটাকে ঘৃণা করা বা অশুভ বলা ইমানের দুর্বলতা। সুতরাং ইতিহাসের দিক থেকেও সফর মাস গুরুত্বহীন নয়। সফর মাসের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ নামাজ, রোজা বা ইবাদত কোরআন-হাদিসে বর্ণিত হয়নি। তাই আমাদের কাজ হবে সারাবছরের মতো নিয়মিত ইবাদত চালিয়ে যাওয়া।
বালা-মুসিবত থেকে বাঁচার জন্য সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও মহান আল্লাহর জিকির করা। বিশেষ করে এ দোয়াটি বেশি পড়া– আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফিয়া ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা চাই। বেশি বেশি ইস্তেগফার করা– ‘আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি’। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজে নিয়োজিত থাকা। যেমন গরিব-অসহায়কে সাহায্য করা। হাদিসে এসেছে সদকা বালা-মুসিবত দূর করে।
সফর মাসে বর্জনীয় বিষয়গুলোর মধ্য কিছু কুসংস্কার রয়েছে। যেমন: ‘সফরে বিয়ে হয় না’, ‘নতুন ব্যবসা শুরু করা যাবে না’, ‘সফরের ১৩ তারিখ খারাপ’– এসব কথা বিশ্বাস করা শিরক। রিজিক ও তকদিরের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
আমাদের দেশে ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ উপলক্ষে সফরের শেষ বুধবার গোসল, মিষ্টি বিতরণ, বিশেষ নামাজের প্রচলন আছে। এর কোনো সহিহ দলিল নেই। এগুলো বিদআত। জীবনে কোনো বিপদ এলে ‘এটা সফরের কারণে’– এমনটা ভাবা যাবে না। সবকিছু আল্লাহর তকদির ও হিকমতেই হয়।
সফর মাস আমাদের ৩টি বড় শিক্ষা দেয়। প্রথমত, যে কোনো মাস, দিন বা তারিখের অশুভত্বে বিশ্বাস না করে একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সুন্নাহর অনুসরণ
নতুন কোনো আমল আবিষ্কার না করে রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথেই চলতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি মাসই আমলের মাস। ‘এই মাসে আমল করব না’– এমন চিন্তা বাদ দিয়ে প্রতিটি দিনকে কাজে লাগাতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ভালো-মন্দ নির্ভর করে আমাদের আমল ও আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর; কোনো মাসের ওপর নয়। তাই আসুন, আমরা সফর মাসে বেশি বেশি নেক আমল করি এবং আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন এবং কুসংস্কার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার