ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

জাতীয় সম্পদ

কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল অন্তর্ভুক্ত হোক ত্রাণের তালিকায়

কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল অন্তর্ভুক্ত হোক ত্রাণের তালিকায়
×

গওহার নঈম ওয়ারা

গওহার নঈম ওয়ারা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের ত্রাণ প্রয়োজন বেঁচে থাকার জন্য। এমন এক সময়ে ত্রাণের তালিকায় পুষ্টিগুণসম্পন্ন কাঁঠালসহ অন্যান্য ফল অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ প্রহসন মনে হতে পারে। অনাহারী মানুষের জন্য ডায়েট চার্টের মতোও শোনাতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির নজির বলে– প্রহসন নয়, প্রয়োজন। এ জন্য মাত্র চার বছর আগের এক দুর্যোগের উদাহরণ দেওয়া যাক। 

২০২২ সালের জুনে সিলেট অঞ্চল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার মুখোমুখি হয়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, সেই দুর্যোগ ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালের বন্যাকেও অনেক ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেবার বন্যা শুরু হয়েছিল মে মাসে। মাসের মাঝামাঝি প্রথম দফায় সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আগেই জুনের মাঝামাঝি মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টিপাত এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে টানা বর্ষণের ফলে দ্বিতীয় দফায় আরও ভয়াবহ বন্যা শুরু হয়। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুনামগঞ্জের মানুষ। তা ছাড়া সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সিলেট শহরের কুমারগাঁওয়ে ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এই উপকেন্দ্র ডুবে গেলে শুধু সিলেট শহর নয়; সুনামগঞ্জসহ বৃহৎ অঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন তৎকালীন মেয়রের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, সিলেট সিটি করপোরেশন এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সমন্বিতভাবে জরুরি অভিযান পরিচালনা করে। তারা গ্রিড উপকেন্দ্রের চারপাশের পানি অপসারণ, অস্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং উপকেন্দ্র পুনরায় চালুর কাজ করে। এর ফলে একই দিন সন্ধ্যায় সিলেট শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।

বিস্তারিত আলাপের কারণ সেই সময়ের ভয়াবহতা পাঠককে আরেকবার মনে করিয়ে দেওয়া। এমন দুর্যোগের সময় মানুষের বড় সংকট শুরু হয় নিজের জীবন রক্ষা নিয়ে। এর পরই দরকার হয় খাবার। সিলেটে বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছিল। এসব মানুষের খাবারের কোনো সংস্থান ছিল না। অনেকেই এক কাপড়ে এসেছিলেন। সিলেট ও সুনামগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দেশের সঙ্গে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যাহত হওয়ায় সম্ভাব্য সাহায্যকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন না দুর্গতরা। 

বন্যার এমন ভয়াবহ চেহারা আগে কখনও দেখেনি সিলেটের মানুষ। আকস্মিকতা আর গতিপ্রকৃতি দেখে হতভম্ব সবাই। এক পর্যায়ে বাস্তুচ্যুত লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েও জায়গা পাচ্ছিল না। খাবার ও নিরাপদ পানির সংকট বাড়তে থাকে। বানভাসি মানুষ বিপাকে পড়ে তাদের গৃহপালিত প্রাণী নিয়ে। মানুষের পাশাপাশি শুরু হয় গবাদি প্রাণীর খাবারের চরম সংকট। বলে রাখা ভালো, অনেক ছোট ছোট খামারি এবং সাধারণ কৃষক ঈদুল আজহা (১০ জুলাই) সামনে রেখে ঋণ করে গরু পালন করছিল। তারাও মহাসংকটে পড়ে। সিলেট, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের ‘আতপ’ চাল পছন্দ। কিন্তু সরকারি গুদামে নানা কারণে সেদ্ধ চাল রাখার চল বেশি। ফলে ওইসব অঞ্চলে সংকটে ওখানকার পছন্দের চাল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আতপ চাল খেতে অভ্যস্ত মানুষ সংকটে পড়লে বাধ্য হয়ে অন্য চালের ভাত গ্রহণ করবে ঠিকই, কিন্তু খাবে কম। এ পরিস্থিতিতে শিশু আর প্রবীণদের জন্য আরও বেশি সংকট হয় খাবারের।

সংকটে উদ্ভাবন
এ রকম পরিস্থিতিতে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় দেখি ট্রলারে করে কাঁঠাল আসছে বিতরণের জন্য। কাপাসিয়া থেকে পাঠিয়েছেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার তখনকার এমপি তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি। সঙ্গে জনাপঞ্চাশেক স্বেচ্ছাসেবী। সেখানকার ১১টি ইউনিয়নের ৯৯ ওয়ার্ডের  নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সংগ্রহ করেছিলেন ১৫ হাজার কাঁঠাল। পরদিন সকাল থেকে ইঞ্জিন নৌকায় ধর্মপাশা উপজেলার সব ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তারা কাঁঠালগুলো বিতরণ করেন। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেটা ছিল এক সৃষ্টিশীল মাইলফলক। পানিবন্দি মানুষ সবাই খুশি হয়েছিল সেই ত্রাণে। সব বয়সের মানুষের প্রিয় খাবারের তালিকায় আছে আমাদের এই জাতীয় ফল। একটি কাঁঠাল কমপক্ষে পাঁচজনের এক বেলার খাবার। জনপ্রতি খরচ পড়ে ১০ টাকার কম। তারপর কাঁঠালের বিচি নানাভাবে খায় মানুষ। ক্ষুধার্ত গবাদি প্রাণীরও খাবার মিলেছিল কাঁঠাল থেকে। কাঁঠালের খোসা এবং ফেলে দেওয়া অংশ গবাদি প্রাণীর প্রিয় খাবার। বন্যার সময় পরিবহন জটিলতার কারণে উৎপাদকরা বাজারজাত করতে পারে না। ফলে বাগান পর্যায়ে দাম অনেক কমে যায়। ত্রাণসামগ্রী হিসেবে এটা অন্তর্ভুক্ত হলে বাগানিদের ক্ষতি কমে। এ ছাড়াও খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, কাঁঠাল শুধু খাবার নয়, বরং এটা নিদানকালের পথ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে, কাঁঠাল হজম শক্তি উন্নত করে। এতে প্রচুর ডায়েটারি আঁশ থাকে, যা হজম প্রক্রিয়া ঠিক রাখতে সাহায্য করে। পানিশূন্যতা বা মাথাব্যথা প্রতিরোধ করে; কাঁঠালের পাকা কোষে জলীয় উপাদান থাকে ৮৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা কাঁঠালের বিচির (৬০.০৭৫ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি। গরমে ঘামে শরীর থেকে যে পানি বেরিয়ে যায়, তা পূরণে কাঁঠাল ভালো কাজ করে। কাঁঠালে ইলেকট্রোলাইটও থাকে, যা শরীরের পানির ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে এবং পানিশূন্যতাজনিত ক্লান্তি বা মাথাব্যথা প্রতিরোধে সহায়ক।

কাঁঠাল রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এতে আছে প্রচুর ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বিশেষভাবে কার্যকর। গরমকালে অনেক সময় ঠান্ডা, সর্দি-কাশি বা ভাইরাল জ্বরের ঝুঁকি থাকে। এসবের বিরুদ্ধে শরীরকে লড়তে সাহায্য করে কাঁঠাল। এ ছাড়া এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, যা সুস্থ থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মিষ্টি স্বাদের হলেও কাঁঠালে ক্যালরি ও চর্বি খুবই কম। এতে থাকা আঁশ পেট ভরাট রাখে। ফলে ঘন ঘন খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায় এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এড়াতে সহায়তা করে। এসব কারণে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন মানুষকে বিপর্যস্ত করে; আমাদের ভাবতে হবে এমন ত্রাণের কথা, যা দুর্গত মানুষের কয়েকটি উপকার একসঙ্গে করতে পারে। এমনকি তার সঙ্গে আশ্রয় নেওয়া গবাদি প্রাণীটিও যেন অভুক্ত না থাকে। এসব বিবেচনায় সিলেটের বন্যায় কাপাসিয়া থেকে যাওয়া ১৫ হাজার কাঁঠাল ছিল অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। 

সংকট মোকাবিলায় তাজউদ্দীন আহমদ যেমন উদ্ভাবনী মেধা আর সাহসের সঙ্গে কাজ করতেন; কাঁঠাল বিতরণ ছিল সে রকম এক উদ্যোগ। সেদিন কাঁঠাল পেয়ে পানিবন্দি মানুষের চোখেমুখে যে খুশির ঝলক দেখেছিলাম, তা তখন হাজার টাকা দিয়েও মিলত না। মানবিক ত্রাণের এটাও এক  অত্যাবশ্যকীয় দিক। অন্যান্য দেশি ফল যেমন পেয়ারা, পাকা তাল মানে ওই সময়ের দেশি ফল যা-ই পাওয়া যাক, তা যুক্ত করতে হবে ত্রাণের তালিকায়। ত্রাণ নেওয়া শিশুদের মানসিক অবস্থা থাকে দুর্যোগকালে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভাতের সঙ্গে দুটো ফল পেলে দুর্গত শিশুটির মনে বিশ্বাস ফিরে আসে– পরিবারের বাইরেও অন্য মানুষ তাকে ভালোবাসে। তাই এমন আকালের সময়েও সে দুটো ফল খেতে পেয়েছে বলে মনে করে। শিশুমনের ক্ষতে এইটুকু উপশম দেওয়ার দায়িত্ব থেকেও আমাদের মানবিক ত্রাণ নিয়ে ভাবতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে ত্রাণের সময় কাঁঠাল এবং দেশি ফল অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত উপকারী।  

গওহার নঈম ওয়ারা: গবেষক এবং ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অর্জন’ গ্রন্থের লেখক   
 

আরও পড়ুন

×