ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

পুঞ্জীভূত সমস্যা যখন বন্যারূপে হাজির

পুঞ্জীভূত সমস্যা যখন বন্যারূপে হাজির
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ১০:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত হয়েছিল বলে আক্ষেপ ছিল অনেকের। আমরা জানতাম না, পরবর্তী মাসের শুরুতেই আকাশ ভেঙে পড়বে, বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ৪৩ বছরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রামে। ওই অঞ্চলজুড়ে অনেক বৃষ্টি হয়েছে গত কয় দিনে। তাতে বন্দরনগরীর অর্ধেক এলাকাসহ বিভাগের অন্যান্য জেলায় দুর্যোগময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অতিবৃষ্টিজনিত ঢল এর আরও অবনতি ঘটায়। পাহাড়ধসেও মৃত্যু হয়েছে অনেকের, যারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছিল। এদের মধ্যে আছে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও। এর পরপরই রাজধানীর অনেক এলাকা ডুবে যায় অতিবৃষ্টিতে। সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে রোববার সকালে কর্মক্ষেত্রে যেতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে মানুষ। মতিঝিল, গুলশানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রও হয়ে পড়ে জলমগ্ন। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদেরও মোকাবিলা করতে হয় এ পরিস্থিতি।

আরও কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি এবং নদনদীর পানি বৃদ্ধিতে বন্যা হতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। যথেষ্ট পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকার অভিযোগ উঠেছে, বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিপর্যয় সৃষ্টির পর। নতুন সরকারের প্রশাসন ঢিলেঢালা অবস্থায় থাকায় অভিযোগটি অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে। 

অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা অস্বাভাবিক নয়। মানুষ অভিযোগ করে তখনই, যখন পানি সহজে নামতে পারে না। নিবন্ধটি লেখার সময়ও সংবাদপত্রে খবর– ‘৩৩ ঘণ্টা পরও ঢাকার কিছু এলাকা জলাবদ্ধ’। চট্টগ্রাম নগরীর সব জায়গা থেকে পানি পুরোপুরি নেমেছে কিনা, কে জানে! বৃষ্টি আপাতত কমে এসেছে দুই নগরীতেই। তাতে আবার জলাবদ্ধতার ক্ষতগুলো বেরিয়ে আসছে। সড়ক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি ও এর মেরামত নিয়ে প্রতিবেদন হবে। নগরীর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ, ছোট ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীদের ক্ষতির দিকটি কমই আসবে আলোচনায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অবশ্য চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলার বন্যাকবলিতরা। পানি নেমে যাওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফেরা মানুষও পড়েছে নতুন দুর্বিপাকে।  

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর, ২০২৪-এর আগস্টের শেষদিকে ফেনী ও কুমিল্লা অঞ্চলে একই ধরনের দুর্যোগ নেমে এসেছিল। কারণ মোটামুটি অভিন্ন। এমন কিছু এলাকার মানুষও তখন বিপন্ন হয়ে পড়ে, যাদের বন্যা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা নেই। এবারও চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো কোনো এলাকায় মানুষ প্লাবন দেখে অবাক হয়েছে। এত দ্রুত তারা জলমগ্ন হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও সরাতে পারেনি। পাশাপাশি গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত। এর সরাসরি প্রভাব থাকবে স্থানীয় অর্থনীতিতে।  

অন্তর্বর্তী শাসনামলের দুর্যোগে এসব খাতে আরও বেশি ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছিল। তা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যাকে অস্বাভাবিক মুনাফা শিকারের সুযোগ হিসেবে নিতে লোকে পিছপা হবে না। নতুন অর্থবছর থেকে নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমিয়ে সরকার চেয়েছিল মানুষের জীবনে কিছুটা স্বস্তি জোগাতে। বৃষ্টি-বাদল, জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রকোপ বাড়লে সেটা সহজ হবে না। 

বন্দরনগরীর বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পুরোনো না হতেই সেখানকার একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনা বড় খবর হয়েছে। চাঁদাবাজরা ব্যবসায়ীসহ অনেকের জীবনকেই দুঃসহ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাদের চাপে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, এটা অবশ্য পুরোনো অভিযোগ। নতুন সরকারকে এটা যেভাবে হোক দমন করতে হবে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এমন কিছু পরিস্থিতিও সরকারকে সামলাতে হচ্ছে, যেগুলো তাদের দায় নয়। যেমন, হামে অব্যাহত শিশুমৃত্যু ও পরিবারগুলোর দুর্ভোগ। 

দেশের বাইরে থেকেও চ্যালেঞ্জ আসছে। যেমন ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়া। অতিবৃষ্টিতে জনভোগান্তি আর ক্ষয়ক্ষতির কারণও অজানা নয়। প্রধান কারণ পানি নিষ্কাশনের পথগুলো সংকুচিত কিংবা বন্ধ হওয়া। এটা দুই-তিন যুগের অব্যবস্থাপনার ফল। এর মূলে আবার রয়েছে প্রকৃতিবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডে আমাদের সম্মিলিত উৎসাহ। তবে এসবের বাইরে সরকার চাইলেই চাঁদাবাজদের উৎপাত বন্ধ করতে পারে। দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেও এরা থামছে না দেখে কেউ অবশ্য অবাক হবে না। 

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ ডুবে যাওয়াটা বড় খবর হয়েছে। পর্যটনে উৎসাহ জোগাতে প্রকল্পটি নেওয়ার সময় থেকেই কিন্তু আলোচনা চলছিল, এটি পানিপ্রবাহকে বিঘ্নিত করবে কিনা। বাস্তবে সেটা যে করছে, তা আগেও খবর হয়েছিল। এ ধরনের প্রকৃতিবিরুদ্ধ অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে যারাই যুক্ত ছিলেন, তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি মনে হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের বুক চিরে সড়কপথ বানানোর মতো কাজও এ দেশে করা হয়েছে। 

বেসরকারি খাতেও এমন সব কর্মকাণ্ড হতে দেওয়া হয়েছে, যেগুলো রোধ করাই ছিল ‘রেগুলেটরি অথরিটি’র কাজ। সে জন্যই জনগণের অর্থে এদের পোষা হয়। উল্টো তাদের অনেকে ওইসব কর্মকাণ্ডে সহায়তা জুগিয়ে সুফলভোগী হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এক পাহাড় নিধন রোধ করা গেলেও এতটা দুর্যোগময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। আর ঢাকায় জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ তো বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ করে অবকাঠামো নির্মাণ। চট্টগ্রাম নগরীতেও কম হয়নি এটা। এরপর ‘জলাবদ্ধতা’ দূরীকরণে নেওয়া হাজার কোটি টাকার প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নও হয়নি। 
ছোট এই দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে এবং মানুষের চাহিদা বেড়েছে অধিকতর দ্রুততার সঙ্গে। এ অবস্থায় সরকারের দিক থেকে বিশেষত অবকাঠামো নির্মাণ এবং সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিতে সুপরিকল্পনা ও সুশাসন নিশ্চিত করা ছিল অনেক বেশি জরুরি। সেখানে সরকার নিজেই উন্নয়নের নামে প্রকৃতিবিরুদ্ধ অবকাঠামো নির্মাণে ঝাঁপ দিলে তারা বেসরকারি খাতকে নিয়মনীতি মানতে বাধ্য করবে কীভাবে? এ অবস্থায় এমনও হয়েছে, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপে জনস্বার্থে প্রণীত নীতিমালা হয় বদলাতে হয়েছে; নয়তো বাস্তবায়ন করা যায়নি। 

জালের মতো বিছানো নদনদী ও খাল-বিলের দেশে যেভাবে জীবনধারা গড়ে তোলার কথা ছিল, তার বিপরীতে গিয়ে স্বভাবতই আমরা শিকার হচ্ছি ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাও কঠিন হচ্ছে আরও আমাদেরই অপরিণামদর্শী আচরণে। মুশকিল হলো, এর সুবিধা নিয়েছে অল্প কিছু মানুষ, আর দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সবাই। বিশেষত তারা, যাদের দুর্যোগের চাপ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো অর্থবিত্ত নেই। বিদ্যমান রাজস্ব পরিস্থিতিতে সরকারেরও সামর্থ্য নেই তাদের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়ানোর।

নতুন সরকারকে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে বর্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত, যাতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যেটুকু কাজ করত; গণঅভ্যুত্থানের পর সেটাও না হওয়ায় বিশেষত মহানগরীতে জলাবদ্ধতা বাড়ল কিনা, সেটাও দেখা দরকার। বন্দরনগরী ও রাজধানী একই সঙ্গে যেন বিপন্ন হয়ে না পড়ে! 
হালের দুর্যোগে চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবসায়ীদের রাখা পণ্যসামগ্রী নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা চাইছেন এর ক্ষতিপূরণ। এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও এই নগরীর দুর্নাম আরও বাড়বে। রাজধানীর এমন জলাবদ্ধতাও দেশের ভাবমূর্তির জন্য খারাপ। এটা তো একই সঙ্গে জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ ও বাণিজ্যের কেন্দ্র। অতিবৃষ্টি, বন্যায় ফসলের ক্ষতিও কম হয়নি; বিশেষত আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির। সামনে বড় বন্যার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে খাদ্যশস্য মজুতেও মনোযোগ বাড়াতে হবে সরকারকে।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
 

আরও পড়ুন

×