আন্তর্জাতিক
ইরান যুদ্ধ ইউরোপকে যে পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে
আঁলিয়া গ্যাবোঁ
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৩
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরেকটি দূরদৃষ্টিহীন ও বিপজ্জনক আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করেছে, যা শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই উল্টো ফল বয়ে আনতে বাধ্য। ইসরায়েলের মতো না হলেও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং তেহরানের মিত্রদের, বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে একটি উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্বল করে দেওয়ার মাধ্যমেই সন্তুষ্ট হতে পারে।
অন্যান্য পর্যবেক্ষক বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন। তাদের যুক্তি, এই যুদ্ধ দুটি ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চে সংঘটিত হচ্ছে। একটি আঞ্চলিক, যা ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান এবং অন্যটি বৈশ্বিক তথা চীন-মার্কিন আধিপত্যের সংঘাত। প্রতিটির নিজস্ব যুক্তি, সময়, উদ্দেশ্য ও অগ্রাধিকার রয়েছে। এই মতানুসারে ওয়াশিংটনের আসল লক্ষ্য ইরান নয়, বরং চীন। কারণ ভেনেজুয়েলার পতনের পর বেইজিংকে আরও একটি মিত্র এবং প্রধান কাঠামোগত সম্পদ থেকে বঞ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
ইউরোপের জন্য এটি আরেকটি অবমাননা, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোকে আরও বেশি দুর্বল ও প্রান্তিক করে তুলেছে। শুরু থেকেই তারা এই যৌথ হামলার কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল; যার মধ্যে রয়েছে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে ইরানের সরাসরি প্রতিশোধমূলক হামলা, জ্বালানির মূল্যস্ফীতি, তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হুমকি, সন্ত্রাসের ঝুঁকি এবং গণঅভিবাসনের আরেকটি নতুন ও অস্থিতিশীল ঢেউয়ের আশঙ্কা।
তারা খুব দ্রুতই তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অথচ এই আসন্ন হামলার বিষয়ে তাদের আগে থেকে জানানো পর্যন্ত হয়নি। স্পষ্টতই হতভম্ব এবং ট্রাম্পের শাস্তিমূলক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে তারা শুরুতে একটি বিব্রতকর ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। তারা সেই চেনা ও অর্থহীন বুলি আওড়াতে থাকে। যেমন ‘উত্তেজনা প্রশমন’, ‘বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা এবং একটি ‘কূটনৈতিক সমাধান’ খোঁজা। তারা ইরানের ওপর এই হামলার নিন্দা জানায়নি, আবার সমর্থনও করেনি।
ইউরোপীয় কমিশনের অনির্বাচিত অথচ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজা কালাস এবং জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের মুখে আন্তর্জাতিক আইন কিংবা এই যুদ্ধ শুরু করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অপরাধ নিয়ে কোনো কথাই শোনা যায়নি।
এর পরিবর্তে জর্জ অরওয়েলের উপন্যাসের মতো স্বৈরাচারী ঢঙে ইউরোপীয় নেতারা ইরানের ‘বেপরোয়া ও নির্বিচার হামলা’ এবং অঞ্চলের ‘অস্থিতিশীলতার’ জন্য তাদেরই দোষারোপ করেন। তারা তেহরানকে অবিলম্বে সব ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান যেন তারা বুঝতেই পারছেন না, এগুলো ছিল ইসরায়েলি-মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক জবাব।
এভাবে ইউরোপীয় নেতারা ইরানের আত্মরক্ষার অধিকারকে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। অবশ্য এই অবস্থান অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। কারণ ইইউ ও ন্যাটোর দীর্ঘদিনের লক্ষ্যই ছিল একটি ইরানি শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটানো কিংবা অন্তত তাদের অস্ত্রহীন ও প্রতিরক্ষাহীন করে দেওয়া, যাকে তারা সবসময় আঞ্চলিক শৃঙ্খলার জন্য একটি হুমকি এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সংকট হিসেবে দেখে এসেছে। এই দিক থেকে তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম ছিল, যাদের ওপর তারা নিজেদের ‘নোংরা কাজগুলো’ করিয়ে নেওয়ার জন্য ভরসা করে। প্রকৃতপক্ষে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর ফ্রান্স ও ব্রিটেন ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করার অনুমতি দেয়।
তা সত্ত্বেও অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও এই যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্টত অস্বীকৃতির; এখন পর্যন্ত সর্বসম্মত– ঘটনা স্বীকার করতেই হবে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার কাজে সাহায্য নিতে ট্রাম্পের যে চেষ্টা, সে ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো সুসমন্বিত ঘোষণার মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করছে এবং বলছে, এটি তাদের যুদ্ধ নয়। এসবই ইরানের নতুন সরকারের সঙ্গে একটি ভবিষ্যৎ চুক্তির দিকে ইঙ্গিত করে। তবে ইউরোপের এই দেরিতে আসা এবং স্বাগত জানানোর মতো অবস্থান আসলে এক ধরনের পরোক্ষ প্রতিরোধ মাত্র। এটি দৃঢ় কোনো বিরোধিতার চেয়ে বরং ক্ষতি কমিয়ে আনা এবং নিজেদের বাঁচানোর প্রাথমিক চেষ্টা।
ইউরোপ আবারও দেখাল, তারা তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম এমন একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে সক্রিয় হতে অক্ষম ও অনিচ্ছুক। ইইউ রাষ্ট্রগুলো এখন আর তাদের দুর্বলতা, অক্ষমতা, কাপুরুষতা ও ভন্ডামি লুকিয়ে রাখতে পারছে না; বিশেষ করে যখন নিজেদের প্রচারিত নৈতিক ও সভ্যতার মূল্যবোধ, যেমন সর্বজনীন মানবাধিকারের প্রসঙ্গ আসে।
এটি তাদের নৈতিক কর্তৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আর এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক যখন কেউ প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে নিজের সুবিধাজনক যুদ্ধগুলোতে আনন্দ প্রকাশ করে, নিজের ঘোষিত নীতিগুলোর সঙ্গে সহজেই বিশ্বাসঘাতকতা করে। আর বেসামরিক মানুষের হতাহতের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে কেবল তখনই, যখন আক্রান্তরা তাদের নিজেদের মানুষ বা মিত্র রাষ্ট্রের নাগরিক হয়। অথচ অসংখ্য ইরানি ভুক্তভোগীর বেলায় তারা নির্বিকার।
ড. আঁলিয়া গ্যাবোঁ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিচের ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটির ফ্রেঞ্চ স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক; মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক