চারদিক
শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা
শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
শ্রাবণ মাসের প্রাক্কালে, আষাঢ়ের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভারতবর্ষের উড়িষ্যা রাজ্যের পুরীধামে যে মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়, তা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এক জীবন্ত ঐতিহ্য; হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের হৃদয়ে ভক্তি, প্রেম ও সাম্যের বার্তা বহন করে চলেছে। এই মহোৎসবের নাম শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা।
রথযাত্রা হলো ভগবান শ্রী জগন্নাথদেব, তাঁর অগ্রজ বলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রার তিনটি বিশাল, সুসজ্জিত রথে আরোহণ করে জগন্নাথ মন্দির থেকে গুণ্ডিচা মন্দির পর্যন্ত যাত্রা। পুরীতে এই তিনটি রথের নাম যথাক্রমে নন্দীঘোষ (জগন্নাথদেবের রথ), তালধ্বজ (বলরামের রথ) এবং দর্পদলন বা দেবদলন (সুভদ্রার রথ)। প্রতিবছর নতুন করে কাঠ দিয়ে এই রথ নির্মাণ করা হয় এবং হাজার হাজার ভক্ত রথের রশি টেনে এই যাত্রায় অংশগ্রহণ করে থাকেন।
পুরাণ ও বৈষ্ণব শাস্ত্র অনুসারে, রথযাত্রা ভগবানের এক বিশেষ কৃপার প্রকাশ। মন্দিরের গর্ভগৃহে সাধারণত কেবল দীক্ষিত ও নির্দিষ্ট বিধি পালনকারী ভক্তরাই প্রবেশাধিকার পান। কিন্তু রথযাত্রার সময় ভগবান নিজে মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথে অবতীর্ণ হন, যাতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সব মানুষ তাঁর দর্শন লাভ এবং সান্নিধ্য অনুভব করতে পারেন। এ কারণেই রথযাত্রাকে বলা হয় সর্বজনীন করুণার উৎসব। ভগবান এখানে ভক্তের কাছে নিজেই পদার্পণ করেন; ভক্তকে তাঁর কাছে যেতে হয় না।
চৈতন্য মহাপ্রভু নিজে পুরীর রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করে ভক্তিভরে নৃত্য-কীর্তন করেছিলেন বলে বৈষ্ণব ঐতিহ্যে উল্লেখ আছে, যা এ উৎসবের গুরুত্বকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
রথযাত্রার মূল উদ্দেশ্য ভগবানের করুণাকে সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা এবং ভক্তি, সেবা ও সংঘবদ্ধতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এটি কেবল দর্শনের উৎসব নয়, বরং সেবা ও ত্যাগের এক ব্যবহারিক শিক্ষা। রথের রশি টানার মাধ্যমে মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ভগবানের সেবায় অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করেন।
রথযাত্রা সমাজে যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা বহুমুখী। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একত্রে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে এটি সামাজিক ঐক্য, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত উদাহরণ তৈরি করে। রথ নির্মাণ, কাষ্ঠশিল্প, চিত্রাঙ্কন, সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে সনাতন বৈদিক সংস্কৃতির বহু প্রাচীন শাখা এই উৎসবের মাধ্যমে উজ্জীবিত থাকে। কীর্তন, নৃত্য ও সমবেত ভক্তি অনুশীলনের মধ্য দিয়ে মানুষ এক ধরনের আধ্যাত্মিক আনন্দ ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন, যা আধুনিক ব্যস্ত জীবনে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের মাটিতেও রথযাত্রার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ে প্রতিবছর যে বিশাল রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, তা শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে দেশ-বিদেশে সুপরিচিত, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হন। এর পাশাপাশি ইসকন বাংলাদেশের উদ্যোগে সারাদেশের ৬৪ জেলাতেই এখন যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে রথযাত্রা উদযাপিত হচ্ছে। প্রতিটি জেলায় ভক্তদের অংশগ্রহণে এই উৎসব দিন দিন ব্যাপকতা লাভ করছে, যা প্রমাণ করে– বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের মাঝে এই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ক্রমশ গভীর হচ্ছে।
শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং তা মানবজাতির প্রতি ভগবানের অপার করুণা, সাম্য ও প্রেমের এক চিরন্তন বার্তা। ইসকনের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে আজ এই মহোৎসব বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ভক্তি ও আনন্দের আলো জ্বালিয়ে চলেছে।
শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী: সাধারণ সম্পাদক, ইসকন, বাংলাদেশ
- বিষয় :
- চারদিক