ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

সাম্প্রতিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

সাম্প্রতিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
×

খালেদ মিসবাহুজ্জামান

খালেদ মিসবাহুজ্জামান

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১২:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা যেন বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনের সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটেছে, কোথাও পাহাড়ি ঢলে জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরের সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ঢাকাতেও জলাবদ্ধতার কারণে দৈনন্দিন জীবন ক্ষতিগ্রস্ত।

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এই দুর্ভোগের একমাত্র কারণ অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। কিন্তু ভারী বৃষ্টি একটি উদ্দীপক হতে পারে; দুর্যোগের মাত্রা নির্ধারণ করে মূলত মানুষের পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামোর নকশা এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের প্রতি আচরণ। অর্থাৎ প্রকৃতি বৃষ্টি দেয়; কিন্তু সেই বৃষ্টি দুর্যোগে রূপ নেবে কিনা, তার বড় অংশ নির্ভর করে মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর।
শুধু নগরায়ণের দোষ?

দেশে জলাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই শোনা যায়– ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণই সব সমস্যার মূল’। এই বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও সম্পূর্ণ সত্য নয়। কারণ একই ধরনের দুর্ভোগ আজ শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম মহানগরেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামাঞ্চলেও দেখা যাচ্ছে, নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; অপর্যাপ্ত বা ছোট কালভার্টের কারণে পানি জমে থাকছে; রেললাইন ও বাঁধ অনেক ক্ষেত্রে পানির স্বাভাবিক গতিপথে বাধা সৃষ্টি করছে; পাহাড় কেটে বসতি ও রাস্তা নির্মাণে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে; খাল, বিল ও জলাভূমি ভরাট হওয়ায় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সংকট কেবল অপরিকল্পিত নগরায়ণের নয়; বরং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নেরও।

উন্নয়নের নতুন বৈপরীত্য
বাংলাদেশ গত দুই দশকে অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মহাসড়ক, সেতু, রেলপথ, শিল্পাঞ্চল, আবাসন প্রকল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়– যদি অবকাঠামো নির্মাণ স্থানীয় ভূ-প্রকৃতি, জলপ্রবাহ, নদী, জলাভূমি এবং পরিবেশগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে সেই অবকাঠামো নিজেই ভবিষ্যতের দুর্যোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এই কারণেই বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের একটি নতুন ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে– ‘জলবায়ুসহিষ্ণু অবকাঠামো এবং প্রকৃতিভিত্তিক অবকাঠামো। এখানে অবকাঠামোকে প্রকৃতির প্রতিপক্ষ নয়, বরং প্রকৃতির সহযোগী হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়।

চট্টগ্রাম উদাহরণ
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রাম। পাহাড়, খাল, নদী এবং সমুদ্রঘেরা এই শহরের ভূ-প্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। একসময় শহরজুড়ে অসংখ্য খাল ছিল, যেগুলো বর্ষার পানি দ্রুত কর্ণফুলী নদীতে পৌঁছে দিত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খাল দখল, সংকোচন, ভরাট এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের ফলে সেই স্বাভাবিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন, ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সমন্বিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও সমগ্র জলাধারাভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। ফলে অল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হলে শহরের বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকে, যদিও একই সঙ্গে এটিও সত্য, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ছিল কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। তাই দুর্ভোগ ব্যাখ্যা করতে হলে চরম আবহাওয়া এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা– উভয়কেই বিবেচনায় নিতে হবে।

পাহাড়ি অঞ্চলের ভিন্ন বাস্তবতা
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সমস্যার ধরন আবার আলাদা। এখানে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, ঢাল অস্থিতিশীল হওয়া, অপরিকল্পিত বসতি এবং রাস্তা নির্মাণের কারণে ভারী বর্ষণে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে খাড়া ও বনহীন ঢালে নির্মিত অস্থায়ী আশ্রয়গুলো ভারী বর্ষণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতে সেখানে প্রাণহানি হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনই কারণ?

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে অনেক অঞ্চলে স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা বাড়ছে– এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে পরিকল্পনার ব্যর্থতা আড়ালে থেকে যায়। একই পরিমাণ বৃষ্টি যদি একটি সুষ্ঠু পরিকল্পিত শহরে দ্রুত নিষ্কাশিত হয়, আর অন্য শহরে দিনের পর দিন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, তাহলে বোঝা যায়; সমস্যার একটি বড় অংশ প্রকৌশল, ভূমি ব্যবহার ও শাসনব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত।

উন্নয়নের দর্শন পুনর্বিবেচনা
বাংলাদেশে বহু বছর ধরে উন্নয়নের সাফল্য প্রধানত সড়কের দৈর্ঘ্য, সেতুর সংখ্যা, ভবনের উচ্চতা কিংবা নির্মাণ ব্যয়ের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা আমাদের নতুন প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে–  রাস্তা কি প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ অক্ষুণ্ন রেখেছে? রেললাইন কি পর্যাপ্ত জল নিকাশের ব্যবস্থা রেখেছে? আবাসন প্রকল্প কি জলাভূমি সংরক্ষণ করেছে? শহর কি অতিবৃষ্টির জন্য প্রস্তুত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ভবিষ্যতের উন্নয়নের মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।

সাম্প্রতিক দুর্যোগ আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে– সমস্যা শুধু বেশি বৃষ্টি নয়; এটি এমন অবকাঠামো, যা অনেক ক্ষেত্রে ভূ-প্রকৃতি, নদী, খাল, পাহাড় ও জলপ্রবাহকে যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই নির্মিত হয়েছে। অতএব, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর শুধু নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের নতুন দর্শন প্রতিষ্ঠা। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন রাস্তা, রেললাইন, সেতু, আবাসন ও শিল্পাঞ্চল– সবই নদী, পাহাড়, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিকল্পিত হবে। তাহলেই বৃষ্টি আশীর্বাদ হয়ে থাকবে; দুর্যোগে রূপ নেবে না।

 ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান: অধ্যাপক, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×